Qazi Akash Logo
কাজী আকাশ

কিছুই ফেলনা নয়

কাজী আকাশ৩ আগস্ট, ২০২৬৮ মিনিট

কিছুই ফেলনা নয়।

বাবার গলার স্বরটা আমার মাথার ভেতর সবসময় বাজতে থাকে। এটা করো না, ওটা করো না, এটা অন্যভাবে করো; বাবার যেন আদেশের শেষ নেই। বাবাকে পুরোপুরি খুশি করা হয়তো আমার পক্ষে সম্ভব হবে না। কিন্তু তবুও আমি চেষ্টা করতাম।

বাবা একটা ছেলে চেয়েছিলেন। এটা কোনো গোপন কথা নয়। আমি নিজেও কথাটা বানাইনি। বাবা আমাকে সবসময় এ কথা মনে করিয়ে দিতেন, বিশেষ করে আমার কোনো ভুল ধরার পরপরই।

জন্ম থেকেই আমি ছিলাম ছোটখাটো। বড় হওয়ার পরও তেমনি রয়ে গেলাম। ডাক্তার বললেন, আমার নাকি কোনো একটা গ্রন্থিতে সমস্যা। কিন্তু বাবা ভাবতেন, আমি মেয়ে বলেই হয়তো এমন দুর্বল। আমার নিজেরও একটা থিওরি ছিল—আত্মরক্ষা! আমার শরীর হয়তো শুরুতেই বুঝে গিয়েছিল, এই দুনিয়ায় টিকে থাকতে হলে নিজেকে ছোট করে রাখতে হবে; যাতে কেউ সহজে আঘাত করতে না পারে। জানি, এটা একটা বোকা থিওরি। কিন্তু এই ভাবনাটা আমাকে সান্ত্বনা দিত।

ছোটখাটো বলে সারাজীবন খোঁটা শুনতে শুনতে একসময় তুমি বুঝবে, ছোট হওয়ার কোনো সুবিধা নেই। লম্বা ছেলেরা গ্যালাক্সি বল খেলে। কেউ কেউ কোটিপতি হয়ে যায়। মোটা ছেলেরা গ্র্যাভিটি ম্যাটে কুস্তি লড়ে, দেশের জন্য পদক জেতে। কিন্তু আমার মতো ছোটদের কী হয়? বড়রা আমাদের টিফিনের টাকা কেড়ে নেয়। শুধু বকাঝকাই জোটে কপালে।

চৌদ্দ বছর বয়সে আমি একটা পথ খুঁজে পেলাম। বুঝতে পারলাম, ছোট মানুষদেরও একটা দাম আছে। তারা থেরিল চালাতে পারে। থেরিল হলো বারোটা গ্রহের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতির চারপেয়ে প্রাণী।

থেরিলের রেস থেকে জকিদের খুব বেশি আয় হতো না। তবে মালিকেরা বস্তা বস্তা টাকা কামাত। কিন্তু জকিদের নাম কেউ মনেও রাখত না। বেআইনি জুয়ার আসরে এক রেসেই হয়তো কারও সারাবছরের আয় বাজি ধরা হতো। কিন্তু কোনো থেরিল জকির নাম কেউ বলতে পারত না।

তবে এই পেশায় অন্তত টিকে থাকার মতো টাকা পাওয়া যেত। আর এই কাজটা আমি ভালোই পারতাম। ছেলেদের মতোই ভালো পারতাম। হয়তো বাবাকে খুশি করার মতোই ভালো!

আমি স্কুল ছেড়ে দিলাম। কাজ নিলাম আস্তাবলে। ধীরে ধীরে ওপরে উঠতে লাগলাম। জুইনকো নামে এক ট্রেনার আমাকে সাহায্য করলেন। তিনি আমাকে থেরিলের যত্ন নেওয়া শেখালেন। ধীরে ধীরে আমি রেসে নামার সুযোগ পেলাম। প্রথমে ছোটখাটো রেস। তারপর বড় মঞ্চে, আরও বড় মঞ্চে। এবার আর আমার ছোটখাটো শরীরটা কোনো বাধা হলো না। বাধা হলো আমার লিঙ্গ। কারণ আমি মেয়ে।

তবুও আমি কঠোর পরিশ্রম করলাম। বাবার সেই তাগিদ দেওয়া গলাটা সবসময় আমার কানে বাজত। একসময় মালিকেরা বুঝল, আমি অন্য জকিদের মতো নেশা করি না, জুয়া খেলে টাকা উড়াই না। অবশেষে আমি আমার জীবনের সেরা সুযোগটা পেয়ে গেলাম।

জুইনকো আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি সত্যিই প্রফেশনাল হতে চাও? এই পথ থেকে কিন্তু ফেরা যায় না।’

জুইনকো সব জানতেন। তিনি নিজেও একসময় জকি ছিলেন। রেসে জেতার জন্য কী কী আত্মত্যাগ করতে হয়, তা তাঁর জানা। এখানে প্রতি আউন্স ওজনের দাম আছে। আমি মনে মনে হিসাব কষতে পারতাম। ওজনের এক আউন্সের দশ ভাগের এক ভাগ কমালে রেসের সময় বাঁচে এক সেকেন্ডের চার ভাগের তিন ভাগ! এই সামান্য সময়ের জন্যই কেউ প্রথম হয়, কেউ পঞ্চম।

খিদের সঙ্গে আমি যুদ্ধ করতে শিখে গিয়েছিলাম। রেসের আগে দিনের আগের দিনও আমি না খেয়ে থাকতাম। কৌশলটা হলো, যতটা খাবার না খেলে অজ্ঞান হবো না, ঠিক ততটা খাবার খাওয়া। এতে আমার ওজন কম থাকবে। রেসের ট্র্যাকে ছোটার সময় তোমার চোখের সামনে যদি অন্ধকার ঘনিয়ে আসে, বুঝবে তোমার ওজন একদম ঠিক আছে! আমি এটা পারতাম। বাবা আমাকে নিখুঁত হতে শিখিয়েছিলেন।

আমার নতুন স্পন্সর কিছু বৈধ সার্জারির খরচ দিল। যেমন, আমার উরুর পেশিগুলো কেটে ফেলা হলো। থেরিল চালানোর জন্য ওগুলোর কোনো দরকার নেই। এর জন্য নিতম্বের পেশিই যথেষ্ট। আমার হাত দুটো আগে থেকেই কাঠির মতো ছিল। না খেয়ে খেয়ে আমি এমন অবস্থায় পৌঁছেছিলাম যে আমার শরীর নিজের হাড়ের মজ্জা শুষে নিচ্ছিল। এক আউন্স ওজন কমানোর মানে হলো সাড়ে তিন সেকেন্ড সময় বাঁচানো। আমার শরীরের আরও অনেক কিছুই বাদ দেওয়ার মতো ছিল।

একজন থেরিল জকির সঙ্গে হাত মেলালেই তুমি তার সম্পর্কে অনেক কিছু বুঝে যাবে। যদি দেখো তার হাতের সব কটি আঙুল আস্ত আছে, বুঝবে সে একজন আনাড়ি। সে শুধু ছোটখাটো রেসেই অংশ নেয়। তার ওজন কম ঠিকই, কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মতো কম নয়!

দুর্ভাগ্যবশত, এই আঙুল কাটার ব্যাপারটা আনুষ্ঠানিকভাবে করা যেত না। রেস কমিটি এটা মানত না। জকিরা এটাকে নিজেদের একটা প্রথা হিসেবেই নিয়েছিল। প্রত্যেক রাইডারকে এটা নিজের হাতেই করতে হতো।

থেরিলের পিঠে বসে থাকার জন্য শুধু বুড়ো আঙুল এবং তর্জনীই যথেষ্ট। বাকি আঙুলগুলো কেটে ফেলে আমি ওজন কমাতে পারি। এতে যদি বছরে দু-একবার আমি থেরিলের পিঠ থেকে পড়েও যাই, তবুও আমার জয়ের হার তার চেয়ে দ্বিগুণ বেড়ে যাবে। হিসাবটা খুব সোজা।

প্রফেশনাল হওয়ার আগে জুইনকো আমাকে এই শেষ শিক্ষাটাই দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কাটার পর রক্ত বন্ধ করার জন্য ওয়েল্ডিং আয়রনের চেয়ে গরম পাত বেশি কাজের। এতে ক্ষতটা দ্রুত পুড়ে গিয়ে রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর কথা মতো আমি মুখে একটা চামড়ার টুকরো কামড়ে ধরলাম। তারপর একটা ধারালো ক্লিপার আমার কড়ে আঙুলের গোড়ায় বসালাম। ক্লিপারের একটা লম্বা হাতল রাখলাম কাঁধের ওপর। অন্যটা ধরলাম আরেক হাত দিয়ে। আমার এই আস্ত হাতটার এটাই হয়তো শেষ বড় কোনো কাজ।

আমি নিশ্চিত হয়ে নিলাম, পাতটা পুরোপুরি গরম হয়েছে। চোখ বন্ধ করলাম। তারপর ক্লিপারের হাতল দুটোতে সজোরে চাপ দিলাম। হাড় ভাঙার মট করে একটা বিকট শব্দ হলো। তীব্র ব্যথায় আমার মাথাটা ভোঁ ভোঁ করে উঠল। শরীর চাইছিল অজ্ঞান হয়ে যেতে। কিন্তু আমি এই অনুভূতিটা নিয়ন্ত্রণ করতে শিখে গিয়েছিলাম। আমি আমার রক্ত ঝরা আঙুলের গোড়াটা সেই ফুটন্ত প্লেটের ওপর চেপে ধরলাম। ছ্যাঁত করে একটা শব্দ হলো। পোড়া মাংসের গন্ধে ঘরটা ভরে গেল।

পোড়া মাংসের গন্ধটা নাকে আসতেই আমার একটা কথা মনে পড়ে গেল। জুইনকো আমাকে বারবার একটা কাজ করতে বলেছিলেন, যেটা আমি ভুলে গিয়েছিলাম।

তিনি বলেছিলেন, ‘শুরু করার আগে কিছু খেয়ে নিয়ো।’ আমি তখন ভাবিনি এটা এতটা জরুরি। কিন্তু এখন বুঝতে পারলাম, কেন তিনি এ কথা বলেছিলেন। আমার জিভে জল চলে এল। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা নিজের কাটা আঙুলটার দিকে তাকালাম। শেষ কবে আমি কিছু খেয়েছিলাম মনে নেই।

হট প্লেটে পোড়া মাংসের ছ্যাঁত ছ্যাঁত শব্দের মতোই বাবার গলাটা কানে স্পষ্ট বেজে উঠল। ‘কিছুই ফেলনা নয়!’

**** 

**** 

লেখকের কথা (হিউ হাওয়ি)

এটি হয়তো আমার লেখা সবচেয়ে ভয়ংকর গল্প। একজন জকি তার ওজন কমানোর জন্য এতটাই মরিয়া হয়ে ওঠে যে, সে তার নিজের হাত-পায়ের অংশ কেটে ফেলতে দ্বিধা করে না! সায়েন্স ফিকশন ও স্যাটায়ার এভাবেই আমাদের বাস্তব জীবনের অদ্ভুত ও ভয়ংকর দিকগুলো তুলে ধরে। আমরা অনেক সময় কোনো একটা অদ্ভুত আদর্শের পেছনে ছুটে নিজেদেরই ক্ষতি করে বসি।

আমি সারা জীবন ইটিং ডিসঅর্ডারে ভুগেছি। হয়তো এর পেছনে কোনো জিনগত কারণ আছে। কারণ আমার বাবারও এই সমস্যা ছিল। অনেকের মতো আমার অবস্থা হয়তো ততটা খারাপ নয়। কিন্তু সবসময় মনে হতো, আমার ওজন বেশি। এমনকি যখন আমার বুকের পাঁজর গোনা যেত, তখনো! নিজেকে চিকন রাখার জন্য আমি খাবার এড়িয়ে যেতাম। মানুষের মস্তিষ্ক নিয়েও আমি যথেষ্ট পড়াশোনা করেছি। আমি জানি এটা একটা রোগ। এর বিরুদ্ধে লড়াই করা উচিত এবং সুস্থ থাকা দরকার। কিন্তু সমস্যাটা এখনো আমার ভেতরে রয়ে গেছে।

যখন কলেজে পড়তাম, আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটি একটা ব্যালে নাচের দলে ছিল। আমার অনেক বন্ধুই ছিল নৃত্যশিল্পী। আমি দেখেছি, নির্দিষ্ট ওজন ও শারীরিক গঠন ধরে রাখার জন্য ওই মেয়েদের ওপর কী ভয়ংকর মানসিক চাপ দেওয়া হতো। তাদের পায়ের ওপরও অনেক অত্যাচার চলত। সৌন্দর্য ও ভারসাম্যের নামে তাদের শরীরে যেসব ক্ষত তৈরি হতো, তা ছিল একদম অযৌক্তিক। দর্শক তাদের পারফরম্যান্স দেখে মুগ্ধ হয়ে কাঁদত, কিন্তু তারা জানত না এর পেছনের কান্নাটা কতটা মর্মান্তিক।

কিছুই ফেলনা নয় (Nothing Goes to Waste) গল্পটা আমি আমার বন্ধু স্কট, শ্যানন ও সারার কথা ভেবেই হয়তো লিখেছিলাম। গল্পের নামটার মধ্যেই একটা বড় আক্ষেপ লুকিয়ে আছে। খেলাধুলা, শিল্প ও লজ্জার ভয়ে বাস্তবে অনেক কিছুরই অপচয় হয়। অনেক অমূল্য জিনিসই আমরা হেলায় হারিয়ে ফেলি।

আপনার মতামত জানান

মন্তব্যসমূহ

লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।

লোড হচ্ছে
এখনও কোনো মন্তব্য নেই।