Qazi Akash Logo
কাজী আকাশ

ওর্প রিঅ্যাকশন

কাজী আকাশ১৮ আগস্ট, ২০২৬৬ মিনিট

অ্যালডাস ওর্প নামে ছেলেটির কথা মনে আছে? শারীরিকভাবে সে আর দশটা শিশুর মতোই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু পড়শি, খেলার সাথি, এমনকি নিজের পরিবারের কাছেও সে ছিল এক্কেবারে গাধা! সে খুব চুপচাপ থাকত। এক জায়গায় বসে থাকতেই সাচ্ছন্দবোধ করত। তার মুখ থেকে সারা জীবনে শুধু একটা শব্দই শোনা গেছে— হুইল! হয়তো খাবার সময় হলে সে এটা বলত। অদ্ভুত কোনো নুড়ি পাথর বা নিজের হাতের আঙুল দেখে উত্তেজিত হলেও উচ্চারণ করত এই শব্দটা।

হঠাৎ একদিন এই চুপচাপ ছেলেটা পাল্টে গেল। তখন তার বয়স সম্ভবত ছয় বছর। অ্যালডাসদের বাড়ির পেছনে ছিল শহরের বিশাল ময়লার ভাগাড়। সে ওই ভাগাড়ে নিয়মিত ঢুঁ মারতে শুরু করল। কয়েক দিন খোঁজাখুঁজির পর একটা বড়সড় দাঁতওয়ালা চাকা নিয়ে ফিরল। অনেকক্ষণ ভেবেচিন্তে সে চাকাটা একটা অব্যবহৃত মুরগির খোঁয়াড়ে লুকিয়ে রাখল।

এভাবেই শুরু হলো এক অদ্ভুত প্রজেক্ট। এই প্রজেক্ট চলল টানা ২০ বছর! অ্যালডাসের শৈশব, কৈশোর আর যৌবন কেটে গেল এই ময়লার ভাগাড় ও মুরগির খোঁয়াড়ের মাঝখানে। সে ভাগাড় থেকে হাজার হাজার ছোট-বড় ধাতব টুকরো কুড়িয়ে আনত। প্রথাগত পড়াশোনা তার মাথায় ঢুকত না। তাই ছেলে অন্তত একটা কাজে ব্যস্ত আছে দেখে তার বাবা-মাও বেশ খুশিই ছিলেন। তাঁরা হয়তো জিনিসগুলোর সৌন্দর্য বা কাজের দিকটা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাননি।

কাজটা সে যেমন হুট করে শুরু করেছিল, তেমনি হুট করেই থামিয়ে দিল। প্রায় এক বছর সে বাড়ির বাইরে পা রাখল না। খাওয়া ও ঘুমানোর মতো দরকারি কাজ ছাড়া সে ওই ময়লার স্তূপের চারপাশে ধীরেসুস্থে ঘুরে বেড়াত। তার মাথায় যে কী ঘুরছিল, কে জানে!

একদিন সকালে তার বাবা ল্যাম্বার্ট সিমনেন ওর্প একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখলেন। অ্যালডাস ওই স্তূপ থেকে বেছে বেছে কিছু জিনিস নিচ্ছে। সেগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা জোড়া লাগাচ্ছে।

ওর্প রিঅ্যাকশনের কথা বলতে গেলে অ্যালডাসের বাবার কিছু কথা বলতেই হয়। ওই জোড়াতালির কাঠামোটা নিয়ে তার বাবা বলেছিলেন, ‘সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সে যে টুকরোটাই তুলত, সেটা অন্যটার সঙ্গে একদম খাপে খাপে বসে যেত! হোক সেটা ভাঙা বিছানার স্প্রিং বা নষ্ট ডিম ফেটানোর যন্ত্র। ছেলেটা সেটা যেখানেই বসাত, ওটা সেখানেই আটকে থাকত।’

অ্যালডাস কি এ কাজে কোনো যন্ত্রপাতি বা টুলস ব্যবহার করেছিল? তার বাবার সোজা উত্তর, ‘কোনো টুলস না।’

ডক্টর পামার নামে একজন বিজ্ঞানী জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘সে কীভাবে আলাদা অংশগুলোকে যুক্ত করে আস্ত একটা জিনিস বানাল?’ উত্তরে অ্যালডাসের বাবা বলেছিলেন, ‘জিনিসগুলো এত শক্তভাবে জোড়া লেগেছিল যে, দুনিয়ার কারও সাধ্য ছিল না ওগুলো আলাদা করে!’

কাঠামোটা সত্যিই খুব মজবুত ছিল। কারণ অ্যালডাস প্রায়ই নতুন কোনো অংশ জোড়া লাগানোর জন্য ওই জঞ্জালের পাহাড়ের ওপর উঠে যেত। কিন্তু একটুও নড়বড় করত না ওটা!

এই সামান্য তথ্যটুকুই আমরা জানি। কিন্তু আসল চমকটা অন্য জায়গায়! ওর্প রিঅ্যাকশনের একমাত্র নিয়ন্ত্রিত প্রদর্শনীর সময় উপস্থিত ছিলেন ইউএস আর্মি ইঞ্জিনিয়ার্সের মেজর হার্বার্ট আর্মস্ট্রং এবং এইসির ডক্টর ফিলিপ এইচ. ইউসটেস ক্রস। তাঁদের প্রতিবেদন থেকেই আমরা আসল ঘটনা জানতে পারি।

সকাল ১০টা ৪৬ মিনিট। অ্যালডাস খুব পুরোনো ও মরিচা ধরা একটা কগহুইল হাতে তুলে নিল। ছয় বছর বয়সে ভাগাড় থেকে কুড়িয়ে আনা সেই জিনিস এটি! একমুহূর্ত ইতস্তত করে সে তার ওই অদ্ভুত কাঠামোর ওপর উঠল। ধীরে ধীরে এর ভেতরে ঢুকে পড়ল। কয়েক মিনিটের জন্য সে বিজ্ঞানীদের চোখের আড়ালে চলে গেল। ডক্টর ক্রসের মতে ৪ মিনিট ৫৯ সেকেন্ড। তবে মেজর আর্মস্ট্রংয়ের মতে ৫ মিনিট ২ সেকেন্ড। শেষে অ্যালডাস বেরিয়ে এল। নিচে নেমে সে তার সৃষ্টির দিকে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টে।

‘কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে থাকার পর ওর্প তার মেশিনের খুব কাছে গেল। সেখানে একটা রড বেরিয়ে ছিল। রডের মাথায় বিছানার পায়ার একটা পিতলের বল লাগানো। অ্যালডাস ওটায় হালকা একটা টান দিল। তারপর যা হলো, তা আক্ষরিক অর্থেই অবিশ্বাস্য! প্রথমে আমরা একটা প্রবল শব্দ শুনলাম, অনেকটা জলপ্রপাতের মতো। শব্দটা ধীরে ধীরে আরও জোরালো হলো। প্রায় পনেরো সেকেন্ড পর আমরা দেখলাম, ওই জঞ্জালের স্তূপের নিচ থেকে একটা বেগুনি আভা বেরিয়ে আসছে। পুরো মেশিনটা মাটি থেকে প্রায় তিন মিটার ওপরে উঠে শূন্যে ভাসতে লাগল! ছেলেটা খুশিতে লাফাতে শুরু করেছে। আমরা স্পষ্ট শুনলাম, সে তিনবার হুইল শব্দটা উচ্চারণ করল। তারপর সে মেশিনের একপাশে গেল। নিচু হয়ে একটা পুরোনো কফি মিলের মরিচা ধরা চাকা ঘোরাল। ধীরে ধীরে মাটিতে নেমে এল তার মেশিন।’

এই ঘটনার পর রীতিমতো হুলুস্থুল পড়ে গেল! সেনাবাহিনী, সাংবাদিক, বিজ্ঞানী সবাই পঙ্গপালের মতো ছুটে এলেন। কিন্তু অ্যালডাসের সঙ্গে কথা বলার কোনো উপায় ছিল না। কারণ সে তো কথা বলতেই শেখেনি! তার বাবা ল্যাম্বার্ট ভদ্রলোক বেশ আন্তরিক ছিলেন। দেশকে সাহায্য করতেও চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর কথা থেকে সমস্যার কোনো সমাধানই পাওয়া গেল না।

মেশিনের ভেতরে উঁকিঝুঁকি দিয়েও কোনো লাভ হলো না। ডক্টর পামারের মতো বড় বিজ্ঞানীরাও বললেন, এটা শুধু একগাদা জঞ্জাল ছাড়া আর কিছুই না! উল্টো এসব তদন্ত দেখে অ্যালডাস বেশ বিরক্তই হলো।

তবে সে তার মেশিন চালাতে খুব পছন্দ করত। সে বারবার দর্শনার্থীদের তার এই বিক্রিয়া দেখাত। বিজ্ঞানীরা মেশিনের ওপর গাইগার কাউন্টার, ইলেকট্রনিক সেন্সর, লিটমাসসহ দুনিয়ার সব পরীক্ষা চালালেন। কিন্তু কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাই পাওয়া গেল না!

শেষে সাংবাদিকদের অত্যাচারে টেকা দায় হয়ে গেল। দ্বিতীয় দিন দুপুরে টেলিভিশন থেকে দলে দলে সাংবাদিকেরা এসে হাজির হলো।

অ্যালডাস কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাটিতে নামিয়ে আনল নিজের আবিষ্কার। চোখেমুখে একটা দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে সে মেশিনের ওপরে উঠল। ভেতরে ঢুকল। একটু পর সেই পুরোনো কগহুইলটা নিয়ে বেরিয়ে এল। খুব সাবধানে সে চাকাটা আবার আগের জায়গায় মুরগির খোঁয়াড়ে রেখে দিল।

এরপর একদম উল্টো নিয়মে মেশিনের প্রতিটি অংশ খুলতে শুরু করল সে। ঠিক যেখান থেকে যে জিনিসটা নিয়েছিল, সেটা আবার সেখানেই রেখে দিলে!

আজ ওর্প রিঅ্যাকশনের সেই জাদুকরী মেশিনের আর কোনো অস্তিত্ব নেই। বিজ্ঞানী ও সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সব অনুরোধ এবং কাকুতি-মিনতি উপেক্ষা করে অ্যালডাস তার মেশিন পুরোপুরি ভেঙে ফেলেছিল। তারপর এক এক করে সেই হাজার হাজার ধাতব টুকরো আবার সেই শহরের ময়লার ভাগাড়েই ফেলে দিয়ে আসে!

এখন অ্যালডাস ওয়ার্পের কী অবস্থা? বাবার বকাঝকা কিংবা সরকারি কর্মকর্তাদের মাঝেমধ্যে আসা—কোনো কিছুই তাকে টলাতে পারে না। সে এখন তার পৈতৃক বাড়ির পেছনের উঠানে একটা বাক্সের ওপর চুপচাপ বসে থাকে। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সেই ময়লার ভাগাড়ের দিকে। মাঝেমধ্যে, খুব কদাচিৎ তার চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। খুব শান্ত গলায় সে বলে ওঠে, ‘হুইল!’

অনুবাদকের কথা

লায়ন মিলারের ‘দ্য অ্যাভেইলেবল ডেটা অন দ্য ওর্প রিঅ্যাকশন’ গল্পে অ্যালডাস ওর্প নামের এক অদ্ভুত ছেলের কাহিনি বলা হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই সবাই তাকে বোকা ও অযোগ্য মনে করত। কিন্তু ফেলে দেওয়া যন্ত্রাংশ কুড়িয়ে কুড়িয়ে সে একদিন এমন একটি যন্ত্র বানিয়ে ফেলে, যা মাধ্যাকর্ষণের প্রভাব কাটিয়ে উড়তে পারে। বিজ্ঞানীরা যন্ত্রটি পরীক্ষা করেও বুঝতে পারেন না এটা কীভাবে কাজ করে। আবার অ্যালডাস নিজেও জানে না সে কীভাবে এটি বানিয়েছে! শেষ পর্যন্ত সে যন্ত্রটি খুলে আবার জঞ্জালের স্তূপে ফেলে দেয়। এটি মূলত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও মানুষের অজ্ঞতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে লেখা একটি ব্যঙ্গধর্মী গল্প।

আপনার মতামত জানান

সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা

মন্তব্যসমূহ

লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।

লোড হচ্ছে
এখনও কোনো মন্তব্য নেই।