
ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়ায় ঢুকলেই একটা বিষয় বারবার চোখে পড়ছে। অনেকেই লিখছেন, ‘স্পটিফাই থেকে সাবস্ক্রিপশন বাতিল করলাম’, ‘অ্যাপল মিউজিকে চলে যাচ্ছি’ কিংবা ‘স্পটিফাই শিল্পীদের পাত্তা দেয় না’। এমন স্ট্যাটাস বা পোস্ট হরহামেশাই ঘুরছে নিউজফিডে। ইন্টারনেটের এই ধরনের হুজুগ আমি সাধারণত এড়িয়েই চলি, কারণ এগুলো এক সপ্তাহ পরই আবার হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। কিন্তু এবারের ব্যাপারটা একটু অন্যরকম।
যখন চারদিকে এত সমালোচনা চলছে, ঠিক তখনই স্পটিফাই হঠাৎ করেই বেশ কিছু নতুন ফিচার নিয়ে হাজির হলো। বিনা মূল্যের ব্যবহারকারীদের জন্য ভালো অডিও কোয়ালিটি কিংবা গান খোঁজার নতুন টুলের মতো ফিচারগুলো তারা এমন সময়ে আনল, যা দেখে মনে হচ্ছে কোথাও একটা ভয় কাজ করছে। কোম্পানির সিইও ড্যানিয়েল একের পদত্যাগের গুঞ্জনও ঠিক যেন খাপ খেয়ে যাচ্ছে এই ডামাডোলের সাথে। বড় কোম্পানিগুলো সাধারণত ততক্ষণ পর্যন্ত সমস্যা সমাধানে দৌড়ায় না, যতক্ষণ না মানুষ সত্যি সত্যি তাদের প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে যেতে শুরু করে। সত্যি বলতে কী, স্পটিফাইয়ের বর্তমান এই সমস্যার বীজ বোনা হয়েছিল তাদের প্ল্যাটফর্ম তৈরির একেবারে শুরুতেই।
স্পটিফাই পাইরেসি বা বেআইনিভাবে গান ডাউনলোড করা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল, এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আমরা অনেকেই ভুলে গেছি স্পটিফাই আসার আগে মিউজিক স্ট্রিমিংয়ের অবস্থা কতটা করুণ ছিল। আগে মানুষ হয় ভাইরাসে ভরা ওয়েবসাইট থেকে গান চুরি করে ডাউনলোড করত, নয়তো চড়া দামে একটা-দুটো সিডি কিনত। বৈধ স্ট্রিমিং সাইট যেগুলো ছিল, সেগুলোর অবস্থা ছিল জঘন্য। বাফারিং হতে হতে জীবন শেষ, গানের লাইব্রেরি একেবারেই ছোট, আর সাবস্ক্রিপশন ফি ছিল আকাশছোঁয়া।
ঠিক সেই সময়ে জাদুর কাঠির মতো হাজির হলো স্পটিফাই। মাসে মাত্র ১০ ডলারের বিনিময়ে দুনিয়ার প্রায় সব গান আপনার হাতের মুঠোয়! এটা আক্ষরিক অর্থেই ছিল একটা বিপ্লব। স্পটিফাই পাইরেসিকে এত বেশি ঝামেলার আর অপ্রয়োজনীয় বানিয়ে ফেলল যে, পুরো মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির চেহারাই চিরতরে বদলে গেল।
সমস্যা হলো, স্পটিফাইয়ের এই দারুণ ব্যবসা মডেলটা তখনই কাজ করে, যখন অন্য কেউ এর ক্ষতিটা নিজের কাঁধে তুলে নেয়। আর সেই অন্য কেউটা হলেন স্বয়ং শিল্পীরা।
স্পটিফাই প্রতিটি স্ট্রিম বা গান শোনার জন্য সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট টাকা দেয় না। তাদের নিয়মটা হলো, সব আয় এক জায়গায় জমা হবে; সেখান থেকে স্পটিফাই নিজেদের ভাগটা কেটে নিয়ে বাকিটা মোট স্ট্রিমের ওপর ভিত্তি করে ভাগ করে দেবে। শুনতে খুব একটা খারাপ লাগছে না, তাই তো? কিন্তু হিসাব কষতে গেলে আপনার চোখ কপালে উঠবে।
ধরুন, আপনার একটা গান কেউ হাজারবার শুনল। এর বিনিময়ে আপনি হয়তো বড়জোর এক ডলার পাবেন! সুপারস্টারের কথা বাদ দিন, একজন সাধারণ শিল্পীর শুধু খেয়েপরে বেঁচে থাকার জন্যই স্পটিফাইয়ে অবিশ্বাস্য পরিমাণ স্ট্রিম দরকার। আগে শিল্পীরা অ্যালবাম বিক্রি করে টাকা কামাতেন, কনসার্ট করতেন সেই অ্যালবামের প্রচারণার জন্য। এখন পুরো ব্যাপারটা উল্টো হয়ে গেছে। এখনকার কনসার্টের টিকিটের দাম এত আকাশছোঁয়া হওয়ার অন্যতম কারণ, শিল্পীরা জানেন শুধু স্ট্রিমিংয়ের টাকা দিয়ে তাদের পেট চলবে না।
এই বিষয়টা নিয়ে আমরা খুব একটা কথা বলি না। কিন্তু স্পটিফাই শুধু মিউজিক শোনার উপায় বদলায়নি, মিউজিক কীভাবে তৈরি হবে সেটাও বদলে দিয়েছে।
আপনি শেষ কবে আস্ত একটা অ্যালবাম একটানা শুনেছেন? স্পটিফাইয়ের বিশাল শ্রোতা এখন গান শোনে প্লেলিস্ট থেকে। আর একবার যখন প্লেলিস্টই গান হিট করার মূল চাবিকাঠি হয়ে গেল, তখন শিল্পীরাও বাধ্য হলেন প্লেলিস্টে টিকে থাকার মতো গান বানাতে। গানের ইন্ট্রো বা শুরুর মিউজিক ছোট হয়ে গেল, দ্রুত কোরাস চলে এল, পরীক্ষামূলক কোনো সুর বা লয় বাদ পড়ে গেল।
গান এখন এমনভাবে তৈরি হচ্ছে যেন আপনি পড়াশোনা করার সময়, গাড়ি চালানোর সময় বা ঘর মোছার সময় সেটা ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতে পারে। পিংক ফ্লয়েডের ‘শাইন অন ইউ ক্রেজি ডায়মন্ড’-এর মতো সাত মিনিট ধরে ধীরে ধীরে শুরু হওয়া কোনো গান এখন রিলিজ হলে স্পটিফাইয়ের অ্যালগরিদম সেটাকে বোধহয় ছুড়েই ফেলে দিত! স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো এমন একঘেয়ে আর সাদামাটা গানকে এত বেশি পুরস্কৃত করছে যে, মিউজিক এখন একটা ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজে পরিণত হয়েছে।
এরপর আসে স্পটিফাইয়ের সবচেয়ে অদ্ভুত দিক, ভুয়া শিল্পী! বছরের পর বছর ধরে স্পটিফাইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তারা বড় বড় প্লেলিস্টগুলো এমন সব বেনামি শিল্পীদের দিয়ে ভরিয়ে রাখছে, যাদের বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই।
খুব সাধারণ পিয়ানো ট্র্যাক, ঘুমের মিউজিক বা লো-ফাই ইন্সট্রুমেন্টাল দিয়ে প্লেলিস্ট ভরা। অভিযোগ হলো, জনপ্রিয় শিল্পীদের আসল রয়্যালটি দেওয়ার বদলে স্পটিফাই বা তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু সস্তা সেশন-মিউজিশিয়ানদের দিয়ে ভুয়া নামে হাজার হাজার গান বানাচ্ছে। এদের কোনো আসল ছবি নেই, সাক্ষাৎকার নেই, কনসার্ট নেই; এমনকি সোশ্যাল মিডিয়াতেও অস্তিত্ব নেই।
আর এই আগুনে ঘি ঢেলেছে এআই। এখন তো আর সেশন-মিউজিশিয়ানও লাগে না। আপনি ঘরে বসেই এআই দিয়ে হাজার হাজার গান, কাভার ও ভুয়া শিল্পীর ছবি বানিয়ে স্পটিফাইয়ে আপলোড করে দিতে পারেন। ব্যবহারকারীরা যখন ঘুমের ঘোরে বা কাজের ফাঁকে ব্যাকগ্রাউন্ডে এগুলো শুনছে, তারা বুঝতেই পারছে না যে এটা কোনো মানুষের গাওয়া নয়। আর স্পটিফাইও এসব আটকাতে খুব একটা আগ্রহী নয়। কারণ ভুয়া হলেও এগুলো তো কন্টেন্ট, আর কন্টেন্ট মানেই তো ব্যবসা!
শিল্পীদের নায্য টাকা না দেওয়া, ভুয়া অ্যালগরিদম, এআইয়ের দৌরাত্ম্য—এসব নিয়ে ভেতরে ভেতরে বারুদ জমছিলই। বিস্ফোরণটা ঘটল যখন স্পটিফাইয়ের সিইও ড্যানিয়েল হেলসিং নামে একটি এআই মিলিটারি টেকনোলজি কোম্পানিতে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করলেন।
মিলিটারি বা সামরিক খাতে এই বিনিয়োগ অনেক শ্রোতা ও শিল্পীই ভালোভাবে নেননি। ম্যাসিভ অ্যাটাকের মতো ব্যান্ড স্পটিফাই থেকে তাদের গান সরিয়ে নিতে শুরু করল। একজন সিইও আইন মেনে যেখানে খুশি বিনিয়োগ করতেই পারেন, কিন্তু ব্যবহারকারীরাও তো চাইতে পারেন যে তাঁদের সাবস্ক্রিপশনের টাকা কোনো সামরিক খাতে না যাক। এই ঘটনাটাই যেন সব ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়াল।
প্রতি বছর ডিসেম্বরে স্পটিফাই র্যাপড (Spotify Wrapped) নিয়ে মানুষের যে উন্মাদনা দেখা যায়, তা যেকোনো টেক কোম্পানির জন্য স্বপ্নের মতো। ব্যবহারকারীরা বিনা পয়সায় নিজেদের সোশ্যাল মিডিয়ায় স্পটিফাইয়ের বিজ্ঞাপন দিয়ে বেড়ান।
কিন্তু এটাই আসলে স্পটিফাইয়ের আসল চেহারাটা তুলে ধরে। তারা মিউজিক, শিল্পী, শ্রোতা, প্রবণতা এবং আপনার আচরণ থেকে প্রতিটি ফোঁটা মূল্য নিংড়ে নিতে ওস্তাদ। আপনার ব্যক্তিত্ব আর আবেগ বছরে একবার একটা সুন্দর গ্রাফিক্স কার্ডে পরিণত হয়ে যায়, আর আপনি খুশিমনে সেটা শেয়ার করেন। কারণ? কারণ এটা সুবিধাজনক। আর সুবিধাজনক জিনিস আমাদের অনেক বড় বড় সমস্যাও ভুলিয়ে রাখে।
সবচেয়ে বড় সত্যিটা হলো, স্পটিফাই এখন আর অপ্রতিদ্বন্দ্বী নয়। একটা সময় অ্যাপল মিউজিক বেশ ধীরগতির ছিল, ইউটিউব মিউজিকও গোছানো ছিল না। কিন্তু এখন অ্যাপল মিউজিকের সাউন্ড কোয়ালিটি স্পটিফাইকে টেক্কা দিচ্ছে। অন্যদিকে ইউটিউব মিউজিকের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো খোদ ইউটিউব, যেখানে আপনি অফিশিয়াল গানের পাশাপাশি লাইভ পারফরম্যান্স, রিমিক্সসহ সব একসঙ্গে পেয়ে যাচ্ছেন।
এত কিছুর পরও আমরা স্পটিফাই ছাড়তে পারি না কেন? কারণ এটা এখন আমাদের অবকাঠামো হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনার বছরের পর বছর ধরে বানানো প্লেলিস্ট, আপনার অ্যালগরিদম, আপনার বন্ধু-বান্ধব সব এখানে। একটা নতুন প্ল্যাটফর্মে গিয়ে আবার শূন্য থেকে শুরু করাটা বেশ ঝামেলার। স্পটিফাই এই সাইকোলজিটা খুব ভালো করেই জানে।
তবে স্ট্রিমিংয়ের যুগ শেষ হচ্ছে না। সিডি বা ক্যাসেটে হয়তো আমরা আর ফিরে যাব না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিশাল স্ট্রিমিং সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে স্পটিফাই কি আর নিজের রাজত্ব ধরে রাখতে পারবে? পাঁচ বছর আগেও স্পটিফাই মানেই ছিল মিউজিক স্ট্রিমিং। আর আজ? আজ এটা কেবল অনেকগুলো অপশনের একটি। হয়তো তারা নিজেদের বদলে ফেলবে, নতুন ফিচারে মানুষের মন ভোলাবে। নয়তো অন্যান্য বড় টেক প্ল্যাটফর্মের মতো স্পটিফাইও একসময় তার আসল উদ্দেশ্য ভুলে নিছক একটা অ্যালগরিদমিক কন্টেন্ট মেশিনে পরিণত হবে।
যেখানে গান আর গান থাকবে না, হয়ে যাবে শুধুই কিছু ডেটা।
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।



