পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো ও শক্তিশালী গল্পগুলো সবসময় ফিরে আসার কথা বলে। শেকড় ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়া এক বীরের ঘরে ফেরার তীব্র আকুতিই কি হোমারের দ্য ওডিসি মহাকাব্যের প্রাণভোমরা নয়? হাজার বছর ধরে এই গল্প মানুষের মুখে মুখে ঘুরেছে, যুগে যুগে রূপ বদলেছে। এবার সেই পুরোনো গল্পের ধুলোমাখা পাতায় জাদুর কাঠি ছুঁইয়েছেন হলিউডের মাস্টারমাইন্ড ক্রিস্টোফার নোলান। তাঁর আধুনিক দ্য ওডিসি যেন সেই চিরচেনা গল্পের এক নতুন, রোমাঞ্চকর পুনর্জন্ম, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় শেকড়ের কাছে ফেরাটা কখনোই সহজ নয়।

নোলান মানেই বিতর্কের ঝড়, আর এই মুভিটাও তার ব্যতিক্রম নয়। লুপিতা নিয়োংও বা এলিয়ট পেজকে কাস্টিং করা নিয়ে অনলাইনে কম জলঘোলা হয়নি। কিন্তু সবচেয়ে বড় চমকটা ছিল র্যাপার ট্রাভিস স্কটকে একজন চারণকবির ভূমিকায় দেখা! ট্রোজান যুদ্ধের গল্পটা তিনি যেভাবে শুরু করেন, তা দেখলেই বোঝা যায় নোলান এখানে কোনো ইতিহাস বইয়ের পাতা মেলাতে আসেননি। তিনি গল্পটা বলতে চেয়েছেন সেই আদিম মুখে মুখে ফেরা ঐতিহ্যের ঢঙে। তাই মুভির পরতে পরতে উঠে এসেছে ফ্ল্যাশব্যাক ও স্মৃতির টুকরো। ইতিহাস কতটা নিখুঁত, সেটা নিয়ে তর্কে না গিয়ে নোলান বরং গল্পের আত্মাটাকে বাঁচিয়ে রাখার দিকেই বেশি নজর দিয়েছেন।
ওডিসিকে আক্ষরিক অর্থে একটা পারফেক্ট অ্যাডাপটেশন বলা যাবে কি না, তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু একটা ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই, এটি একটি সিনেম্যাটিক মাস্টারপিস। আইম্যাক্সের বিশাল পর্দায় এই মুভি দেখার অভিজ্ঞতা রীতিমতো গায়ের লোম খাড়া করে দেওয়ার মতো! সাইক্লপস বা একচোখা দৈত্যকে বোঝাতে কোনো সস্তা সিজিআই ব্যবহার করেননি নোলান, বরং বানিয়েছেন ৬০ ফুট উঁচু এক বিশাল পাপেট! সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ ও ভাসমান জাহাজের দৃশ্যগুলো দেখলে মনে হবে, আপনিও হয়তো পাড় থেকে সেই জাহাজ দেখছেন। পুরনো দিনের সেই খাঁটি মুভি ম্যাজিক ফিরিয়ে আনতে নোলানের এই ডেডিকেশন সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
তবে নোলান শুধু হোমার বা ভার্জিলের মহাকাব্য থেকেই রসদ নেননি, নিজের আগের কাজগুলো; বিশেষ করে দ্য ডার্ক নাইট ট্রিলজি ও ওপেনহাইমার থেকেও দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। জাদুর একটা অদ্ভুত দুনিয়া তৈরি করেও তিনি সেটাকে বাস্তবতার মাটিতে শক্ত করে দাঁড় করিয়েছেন। যেমন, ট্রয় নগরী যে শুধু হেলেনের রূপের জন্যই ধ্বংস হয়েছিল, তা নয়। এর পেছনে বাণিজ্য পথ দখলের নোংরা রাজনীতিও যে ছিল, তা বেশ স্পষ্টভাবেই উঠে এসেছে। তবে বাস্তবতার এই শক্ত জমিনে যখন হঠাৎ করে দৈত্য বা অতিকায় দানব এসে হাজির হয়, তখন মাঝেমধ্যে একটু খটকা লাগতে পারে।

নোলানের ক্যানভাস এতই বিশাল যে, প্রতিটি চরিত্রকে হয়তো সমানভাবে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব হয়নি। তবে অ্যান হ্যাথাওয়ের মতো কিছু অভিনয়শিল্পী নিজেদের ঠিকই চিনিয়েছেন। মুভির গল্পটা একটু খণ্ড খণ্ড। প্রথমে জাহাজে চড়া, দ্বীপে থামা, দৈত্যের মুখোমুখি হওয়া, সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচা। কিন্তু এত কিছুর পরও গল্পটা যে খেই হারিয়ে ফেলেনি, তার কারণ মুভির ভেতরের মূল থিম। প্রতিটি বিপত্তিই আসলে ওডিসিউসকে শুধু ঘরের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে না, বরং তাকে ভেতর থেকেও একটু একটু করে বদলে দিচ্ছে।
মুভির একটা দৃশ্যে ওডিসিউসের ছেলে বলে ওঠে, ‘তুমি আমাকে বলোনি সে কোথায় আছে। তুমি আমাকে বলেছ সে কে।’ নোলানের পুরো ভিশনটাই আসলে এই ছোট্ট ডায়লগের মধ্যে লুকিয়ে আছে। আধুনিক মোড়কে সাজানো হলেও, এটা দিন শেষে একজন স্বামী ও বাবার গল্প। তাঁর ঘরে ফেরা যতটা না ভৌগোলিক, তার চেয়েও অনেক বেশি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক।
তবে এই মুভি নিয়ে কিছুটা বিতর্কও আছে। হেলেন চরিত্রে লুপিতা নিয়োংওকে নেওয়া নিয়ে যে বিতর্ক ছিল, মুভি দেখার পর তা অর্থহীন মনে হতে পারে। চরিত্রের ব্যাপ্তি ছোট হলেও, লুপিতা তার জায়গায় দুর্দান্তই ছিলেন। এটা অবশ্য আমার ব্যক্তিগত মতামত। অন্যদিকে এলিয়ট পেজের কাস্টিং নিয়ে যে গুঞ্জন ছিল, মুভিতে তাকে সেভাবে কোনো অতি পুরুষালি হিরো হিসেবে দেখানো হয়নি। সে বরং এমন এক সাধারণ মানুষ, যাকে জোর করে যুদ্ধে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। নোলানের এই কাস্টিং চয়েসগুলো হয়তো আধুনিক প্রগতিশীলতার একটা ছাপ রাখে, কিন্তু গল্পের মূল ফ্লো নষ্ট করে না।
আরেকটা কথা বলা প্রয়োজন। ওডিসির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে জিউসের আইন বা আতিথেয়তার নিয়ম। অচেনা মানুষকে সম্মান করার এই নীতিই ছিল প্রাচীন সমাজের ভিত্তি। আর এই নিয়ম ভাঙার মধ্য দিয়েই শুরু হয় সভ্যতার পতন।
গ্রিক দেবতারা স্বভাবতই বেশ নিষ্ঠুর ও প্রতিহিংসাপরায়ণ। ওডিসিউস যখন চিৎকার করে বলে, ‘তাহলে আমি দেবতাদের অবজ্ঞা করি!’, তখন সেটা তার অহংকারকেই তুলে ধরে। আর এই অহংকারের জন্যই তাকে পদে পদে বিপদে পড়তে হয়। শেষ পর্যন্ত যখন সে নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করে নিজের ভুলের দায় নেয়, তখনই আসলে তার পুনর্জন্ম হয়।
মুভির একটি দৃশ্যে ডাইনি যখন ওডিসিউসের নাবিকদের শূকরে পরিণত করে বলে যে এটাই তাদের আসল রূপ, তখন মানুষের ভেতরের পাশবিক দিকটাই কি নগ্ন হয়ে ফুটে ওঠে না? নোলান হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন, আমাদের ভেতরের এই অন্ধকার প্রবৃত্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সভ্যতার পতন অবশ্যম্ভাবী।
দিন শেষে, দ্য ওডিসি হয়তো সবাইকে খুশি করতে পারবে না। কিন্তু একটা ব্যাপার নিশ্চিত, এটি হলিউডের সেই গুটিকয়েক সিনেমার একটি, যা দর্শকদের শুধু চমকে দিতে চায় না, বরং ভাবাতেও চায়!
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।
