স্কুলের বিজ্ঞান বই পড়ে আপনি হয়তো নিশ্চিত হয়ে বসে আছেন, আমাদের সৌরজগতে গ্রহের সংখ্যা ৮টি। একটা সময় অবশ্য ৯টি ছিল, পরে প্লুটোকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়। কিন্তু আপনি কি জানেন, সৌরজগতের গ্রহের এই সংখ্যা গত ২০৫ বছরে যেন এক রকম রোলারকোস্টারে চড়েছে? কখনো ৬টি, কখনো ৯টি, আবার একটা নির্দিষ্ট সময়ে এই সংখ্যা ১১-তেও গিয়ে ঠেকেছিল!

১৭৭৬ সাল। আটলান্টিকের ওপারে আমেরিকা যখন স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র তৈরি করছে, তখন জ্যোতির্বিদদের খাতায় আমাদের সৌরজগতের গ্রহ ছিল মাত্র ৬টি। তখন বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনিকে গ্রহের স্বকৃতি দেওয়া হয়েছিল। তবে এই হিসাবটা বেশিদিন টেকেনি। ঠিক পাঁচ বছর পর, ১৭৮১ সালে উইলিয়াম হার্শেল যখন তাঁর টেলিস্কোপে ইউরেনাসকে খুঁজে পেলেন, তখন গ্রহের তালিকায় যুক্ত হলো ৭ নম্বর নামটি।
আসল গোলমালটা বাঁধল ১৯ শতকের শুরুতে। ১৮০১ সালে মঙ্গল ও বৃহস্পতির মাঝখানে সেরেস নামে একটি নতুন জ্যোতিষ্ক আবিষ্কৃত হলো। কিছুদিন পর এর আশপাশে পাওয়া গেল আরও তিনটি ঠিক একই রকম বস্তু। বিজ্ঞানীরা তো মহাখুশি! তারা এগুলোকেও গ্রহের মর্যাদা দিয়ে বসলেন। ফলে সৌরজগতে গ্রহের সংখ্যা রাতারাতি লাফ দিয়ে বেড়ে হয়ে গেল ১১টি।
কিন্তু জ্যোতির্বিদদের এই উচ্ছ্বাস বেশিদিন স্থায়ী হলো না। টেলিস্কোপের কাচ যত পরিষ্কার হতে লাগল, বিজ্ঞানীরা বুঝলেন, এই বস্তুগুলো আসলে গ্রহ হওয়ার যোগ্য নয়। এগুলো সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের ছোট পাথুরে বস্তু। ফলে এদের নতুন নাম দেওয়া হলো গ্রহাণু। আমাদের সৌরজগতের গ্রহের সংখ্যা এক ধাক্কায় ১১ থেকে আবার নেমে এল ৭টিতে।

যুক্তরাষ্ট্রের লোয়েল মানমন্দিরের ইতিহাসবিদ কেভিন শিন্ডলারের মতে, জ্যোতির্বিজ্ঞানের এই বারবার মত পাল্টানোর বিষয়টা আসলে বিজ্ঞানেরই এক সুন্দর বৈশিষ্ট্য। বিজ্ঞানীরা যখন নতুন কিছু আবিষ্কার করেন—হোক সেটা গ্রহ, ডাইনোসরের জীবাশ্ম কিংবা নতুন কোনো পোকা—তাঁরা প্রথমে সেটাকে একটি দলে ফেলার চেষ্টা করেন। কিন্তু পরে যখন আরও তথ্য হাতে আসে, তখন দরকার হলে আগের ভুল শুধরে নেন।
যাই হোক, ১৮৪৬ সালে নেপচুন আবিষ্কৃত হওয়ার পর গ্রহ হলো ৮টি। এরপর ১৯৩০ সালে লোয়েল মানমন্দির থেকেই জ্যোতির্বিদ ক্লাইড টমবো আবিষ্কার করলেন প্লুটোকে। সৌরজগত পেয়ে গেল তার বহু পরিচিত ৯ নম্বর গ্রহটিকে। বিংশ শতাব্দীর প্রায় পুরোটা সময় আমরা এই ৯টি গ্রহের গল্প পড়েই কাটিয়েছি।
কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শুরুতে মহাকাশযান ও টেলিস্কোপ প্রযুক্তি যখন আরও উন্নত হলো, বিজ্ঞানীরা নেপচুনের ওপারে বরফে ঢাকা এক বিশাল অন্ধকার অঞ্চলের খোঁজ পেলেন। এর নাম দেওয়া হলো কুইপার বেল্ট। বিজ্ঞানীরা অবাক হয়ে দেখলেন, প্লুটো সেখানে একা নয়! প্লুটোর মতোই হাজার হাজার বরফের টুকরো ও ছোট ছোট গ্রহাণু ওই অঞ্চলে সূর্যের চারদিকে ঘুরছে। সেগুলোকে বলা হয় ট্রান্স-নেপচুনিয়ান অবজেক্ট।
লোয়েল মানমন্দিরের বিজ্ঞান বিভাগের পরিচালক কাইলার কুয়েন বলেন, ‘যখন দেখা গেল সৌরজগতের একেবারে প্রান্তে প্লুটোর মতো আরও লাখ লাখ বস্তু থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন উঠল—প্লুটোকে কেন আমরা আলাদাভাবে বিশেষ সম্মান দেব?’
এই প্রশ্নের সূত্র ধরেই ২০০৬ সালে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিয়ন গ্রহের একটি কড়া সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিল। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, গ্রহ হতে হলে তিনটি শর্ত মানতে হবে। এক, বস্তুটিকে অবশ্যই সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে হবে। দুই, নিজের মহাকর্ষ বলের কারণে তাকে প্রায় গোলাকার হতে হবে। তিন, নিজের কক্ষপথের আশপাশটা অন্য ছোটখাটো বস্তু থেকে পরিষ্কার রাখতে হবে। অর্থাৎ, ওই এলাকার অবিসংবাদিত রাজা হতে হবে ওই বস্তুটিকে।

প্লুটো প্রথম দুটি শর্ত খুব ভালোভাবে মানলেও, তৃতীয় শর্তে গিয়ে ফেল করে বসল। কারণ তার কক্ষপথের আশপাশে কুইপার বেল্টের অসংখ্য ছোট ছোট বস্তু ভিড় করে থাকে। ব্যস, প্লুটো হারিয়ে ফেলল গ্রহের মর্যাদা। প্লুটোকে নামিয়ে দেওয়া হলো বামন গ্রহের কাতারে। আমাদের সৌরজগতের গ্রহের সংখ্যা আবার ৯ থেকে নেমে এল ৮টিতে।
তবে আপনি ভাববেন না যে এখানেই সব বিতর্কের অবসান হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখনো এই বিষয় নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত। একদল জোর দেন জ্যোতিষ্কের গতিশীলতার ওপর—মানে এটি কক্ষপথে কেমন আচরণ করে, তার ওপর। আরেক দল, যারা প্লুটোকে আবারও গ্রহ বানাতে চান, তারা জোর দেন বস্তুটির ভৌত বৈশিষ্ট্যের ওপর। ২০১৫ সালে নাসার মহাকাশযান নিউ হরাইজনস যখন প্লুটোর খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায়, তখন এর বরফে ঢাকা সুবিশাল পাহাড়, হিমবাহ আর জটিল ভূপ্রকৃতি দেখে অনেক বিজ্ঞানীই নতুন করে নড়েচড়ে বসেছেন। খোদ নাসার অ্যাডমিনিস্ট্রেটর জ্যারেড আইজ্যাকম্যান কিছুদিন আগে বলেছেন, তাঁর মতে প্লুটোকে আবারও গ্রহের মর্যাদা দেওয়া উচিত।
বিজ্ঞান সব সময়ই নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়ে। যেমনটা হয়েছিল ব্রন্টোসরাস নামে ডাইনোসরের ক্ষেত্রে। একসময় এর নাম পাল্টে অ্যাপাটোসরাস রাখা হলেও পরে গবেষণায় প্রমাণ মেলে, ব্রন্টোসরাস আসলে আলাদা একটি প্রজাতিই ছিল। সৌরজগতের ক্ষেত্রেও এমন কিছু ঘটা অসম্ভব নয়।
১৭৭৬ সালে মানুষ মাত্র ৬টি গ্রহের কথা জানত। আজ আড়াই শ বছর পর আমরা ৮টি গ্রহের কথা জানি। কিন্তু মহাকাশের বিশালতার তুলনায় আমাদের এই জানাটা একেবারেই সামান্য। হয়তো অদূর ভবিষ্যতেই সৌরজগতের অন্ধকার প্রান্ত থেকে এমন নতুন কিছু আবিষ্কৃত হবে, যা আমাদের গ্রহের সংজ্ঞাটাই আবারও পাল্টে দেবে। মহাকাশের খাতায় শেষ কথা বলে তো কিছু নেই!
সূত্র: স্পেস ডটকম
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।


