
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শারীরতত্ত্বে এ বছর নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কার্ল ডাইসারোথ, পিটার হেগেম্যান এবং গেওর্গ নাগেল। আলোর সাহায্যে নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল এবং অপটোজেনেটিকস সম্পর্কিত আবিষ্কারের জন্য চলতি বছর তাঁদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
মানুষের মস্তিষ্ক এক বিশাল রহস্যময় যন্ত্র। এর ওজন মাত্র প্রায় ১ দশমিক ৩ কেজি। অথচ এই ছোট্ট অঙ্গটির ভেতরেই জমা থাকে শৈশবের স্মৃতি, তৈরি হয় স্বপ্ন ও সৃজনশীলতা, জন্ম নেয় আনন্দ, ভালোবাসা, ঈর্ষার মতো অনুভূতি। মস্তিষ্কই আবার নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের হৃদস্পন্দন, শ্বাস-প্রশ্বাস ও ঘুমের ছন্দ। এত কিছু কীভাবে সম্ভব, সেটাই বহুদিন ধরে বিজ্ঞানীদের কাছে এক বিরাট রহস্য।
এই রহস্যের সমাধান করেই চলতি বছর এই তিন বিজ্ঞানী চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেলেন। মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষকে আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার পথ তৈরি করেছেন তাঁরা। তাঁদের আবিষ্কারের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে অপটোজেনেটিকস। এটি এমন এক শক্তিশালী পদ্ধতি, যার সাহায্যে জীবন্ত মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে আলো দিয়ে সক্রিয় করা যায়, আবার চাইলে নিষ্ক্রিয়ও করা যায়।
এই প্রযুক্তি মস্তিষ্ক গবেষণায় এক নতুন দরজা খুলে দিয়েছে। কোন স্নায়ুকোষ আমাদের ভয় পাইয়ে দেয়, কোনগুলো ক্ষুধা বাড়ায়, কোনগুলো সামাজিক আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে, এমনকি কোনো নির্দিষ্ট স্মৃতির সঙ্গে কোন স্নায়ুকোষ জড়িত, তা অনেক বেশি নির্ভুলভাবে জানা সম্ভব হয়েছে এই আবিষ্কারের ফলে।
মস্তিষ্কের রহস্য
গল্পের শুরু নব্বইয়ের দশকে। ১৯৩২ সালে লেখক ভার্জিনিয়া উলফ এক বন্ধুকে চিঠিতে নিজের মস্তিষ্ক সম্পর্কে লিখেছিলেন, মস্তিষ্ক যেন তাঁর কাছে এক অদ্ভুত যন্ত্র। সব সময় গুনগুন করছে, ছুটছে, গর্জন করছে। তাঁর প্রশ্ন ছিল, কেন এমন হয়? এই অদ্ভুত মস্তিষ্কের ভেতর আসলে কী চলছে?
বিজ্ঞানীরাও একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন বহুদিন ধরে। বিশ শতকে তাঁরা জানতে পেরেছিলেন, মস্তিষ্কের কোন কোন অংশ শরীরের কোন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে। এটি ছিল বিশাল অগ্রগতি। কিন্তু সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। তখনকার গবেষণার পদ্ধতিগুলো ছিল বেশ মোটা দাগের। কোনো একটি মস্তিষ্কের অঞ্চল সক্রিয় করলে হয়তো একটি নির্দিষ্ট আচরণ দেখা যেত। কিন্তু সেই অঞ্চলের ঠিক কোন ধরনের স্নায়ুকোষ কাজটি করছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন ছিল। ফলে মস্তিষ্ক সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের যে ছবি তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটা ঝাপসা ছবির মতো। বড় কাঠামোগুলো দেখা যায়, কিন্তু সূক্ষ্ম বিবরণগুলো অস্পষ্ট।
তখন প্রশ্ন উঠল, যদি মস্তিষ্কের একেকটি স্নায়ুকোষকে আলাদা করে নিয়ন্ত্রণ করা যেত? ১৯৬২ সালে ডিএনএর গঠন আবিষ্কারের জন্য নোবেল পাওয়া ফ্রান্সিস ক্রিকও এমন একটি সম্ভাবনার কথা ভেবেছিলেন। পরে তিনি মানুষের চেতনা কীভাবে তৈরি হয়, তা নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। তাঁর ধারণা ছিল, জীবন্ত মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে যদি ইচ্ছামতো সক্রিয় করা যেত, তাহলে মস্তিষ্কের কাজ বোঝা অনেক সহজ হতো।
কিন্তু স্নায়ুকোষের সংকেত খুব দ্রুত তৈরি হয় এবং ছড়িয়ে পড়ে। তাই ক্রিক মনে করলেন, সংকেতগুলো নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আলো হয়তো সবচেয়ে ভালো মাধ্যম হতে পারে। কোনোভাবে যদি স্নায়ুকোষকে আলোর প্রতি সংবেদনশীল করা যায়, তাহলে আলো দিয়েই হয়তো তাদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
কয়েক দশক পর সেই কল্পনাই বাস্তব হলো।
রহস্যের শুরু সবুজ শৈবাল থেকে
গল্পের শুরু মস্তিষ্কে নয়, একটি ক্ষুদ্র সবুজ শৈবালে। নাম Chlamydomonas। এটি এককোষী জীব। পানিতে সাঁতার কাটতে পারে এবং আলো দেখলে আলোর দিকে এগিয়ে যায়।
একটি পেট্রি ডিশে এই শৈবালগুলো রাখলে পানি হালকা সবুজ দেখায়। এবার ডিশের এক পাশ থেকে আলো ফেলুন। কিছুক্ষণ পর দেখা যাবে, সবুজ রং ধীরে ধীরে আলোর দিকে সরে যাচ্ছে। কারণ অণুবীক্ষণ যন্ত্রে দেখা যায়, ক্ষুদ্র শৈবালগুলোও আলোর দিকে সাঁতরে যাচ্ছে। কিন্তু তারা আলো বুঝতে পারে কীভাবে?
শৈবালের শরীরে আছে ছোট্ট একটি গঠন, যাকে বলা হয় আইস্পট। এটি দেখতে কমলা রঙের বিন্দুর মতো। সেখানে রেটিনাল নামে এমন একটি অনু আছে, যেটি আলো ধরতে পারে। ১৯৯০-এর দশকের গোড়ায় জার্মানির মার্টিন্সরিডে ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োকেমিস্ট্রিতে কাজ করছিলেন পিটার হেগেম্যান। তিনি বুঝতে চাইলেন, Chlamydomonas এত দ্রুত আলো বুঝতে পারে কীভাবে।

**
হেগেম্যান শৈবালের আইস্পট নিয়ে পরীক্ষা শুরু করলেন। ক্ষুদ্র ইলেকট্রোড ব্যবহার করে তিনি মাপলেন, সেখানে আলো পড়লে শৈবালের কোষে কী ধরনের বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়। ফলাফল ছিল অবাক করার মতো।
আলো আইস্পটে পড়ার মাত্র আধা মিলিসেকেন্ডের মধ্যেই বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হচ্ছিল। অর্থাৎ এক মিলিসেকেন্ডের অর্ধেক সময়ের মধ্যেই শৈবাল আলো শনাক্ত করে তার প্রতিক্রিয়া শুরু করছে। মানুষের চোখের ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেক ধীর। আমাদের চোখে আলো পড়লে প্রথমে একাধিক ধাপে রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। সবশেষে একটি আয়ন চ্যানেল কোষের পৃষ্ঠে একটি পথ খুলে দেয়। তখন চার্জযুক্ত আয়ন সেই পথ দিয়ে প্রবেশ বা বের হতে পারে। এরপর তৈরি হয় বৈদ্যুতিক সংকেত। পুরো প্রক্রিয়াটিতে অন্তত ১০ মিলিসেকেন্ড সময় লাগে।
তাহলে Chlamydomonas এত দ্রুত কীভাবে আলোতে সাড়া দিচ্ছে? হেগেম্যানের মাথায় একটি সম্ভাবনা এল। হয়তো শৈবালের ক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ। হয়তো আলো ধরা এবং আয়ন চ্যানেল খোলার কাজ একই প্রোটিন করছে। কিন্তু তখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা এমন কোনো আয়ন চ্যানেলের কথা জানতেন না, যেটি নিজেই আলোতে সাড়া দিতে পারে। তাই হেগেম্যানের ধারণাটি খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি অনেকের কাছে। তবু তিনি হাল ছাড়লেন না।
খুঁজে পাওয়া গেল অদ্ভুত দুই জিন
হেগেম্যান চেষ্টা করলেন Chlamydomonas-এর আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন আলাদা করে বের করতে। কিন্তু কাজটি সহজ ছিল না। শৈবালের চোখের দাগ থেকে প্রোটিনগুলো আলাদা করলেই সেগুলো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ত। নষ্ট হয়ে যেত সহজেই। এরপর এল গুরুত্বপূর্ণ একটি সুযোগ।
জাপানি গবেষকেরা Chlamydomonas-এর ডিএনএর মানচিত্র তৈরি করেছিলেন। ফলে শৈবালটির হাজার হাজার জিনের জেনেটিক কোড বিজ্ঞানীদের হাতে চলে এল। এই বিপুল তথ্যের মধ্যে হেগেম্যানের দল দুটি জিন খুঁজে পেল, যেগুলোর সঙ্গে আলো ধরতে পারে এমন কিছু পরিচিত প্রোটিনের জিনের মিল ছিল। হয়তো এই দুটির কোনো একটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে সেই রহস্যময় প্রোটিনের নকশা!
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হেগেম্যান যোগাযোগ করলেন আরেক বিজ্ঞানীর সঙ্গে, নাম জর্জ নাগেল। তিনি তখন ফ্রাঙ্কফুর্টের ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োফিজিক্সে কাজ করছিলেন। নাগেলের কাছে ছিল প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি। তিনি ব্যাঙের ডিম্বাণু ব্যবহার করে পরীক্ষা শুরু করলেন। হেগেম্যানের পাঠানো দুটি জিন আলাদা আলাদাভাবে ব্যাঙের ডিম্বাণুতে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। ডিম্বাণুগুলো এরপর ওই জিনের নির্দেশনা অনুযায়ী অজানা দুটি প্রোটিন তৈরি করতে শুরু করল। প্রোটিনগুলো গিয়ে বসলো কোষের বাইরের ঝিল্লিতে।
এবার নাগেল দেখতে চাইলেন, এগুলো আসলে কী করে। ফলাফল হেগেম্যানের বহু বছরের পুরোনো ধারণাকেই সত্যি প্রমাণ করল। এই প্রোটিনগুলো ছিল আয়ন চ্যানেল। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, আলো পড়লেই চ্যানেলগুলো খুলে যাচ্ছিল। নতুন প্রোটিন দুটির নাম দেওয়া হলো চ্যানেলরোডপসিন-১ এবং চ্যানেলরোডপসিন-২। দুটির মধ্যে দ্বিতীয়টি, অর্থাৎ চ্যানেলরোডপসিন-২ পরে মস্তিষ্কবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটানোর পথ খুলে দেয়।

চ্যানেলরোডপসিন-২ যে শুধু আলোতে সাড়া দেয়, তা নয়। এটি অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে কাজ করে। আলো পড়ার মাত্র ০ দশমিক ২ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে ব্যাঙের ডিম্বাণুর কোষঝিল্লিতে থাকা চ্যানেলটি খুলে যায়। তখন ধনাত্মক চার্জযুক্ত আয়ন চ্যানেল দিয়ে প্রবেশ করে এবং কোষে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি হয়।
হেগেম্যান ও নাগেল বুঝতে পারলেন, তাঁরা এমন একটি প্রোটিন খুঁজে পেয়েছেন, যা আলোকে সরাসরি বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করতে পারে। তাঁরা আরও পরীক্ষা করলেন। চ্যানেলরোডপসিন-২ তৈরির জিনটি তাঁরা মানুষের ভ্রূণীয় কিডনি কোষ এবং হ্যামস্টারের কিডনি কোষে প্রবেশ করালেন। অবাক করার মতো বিষয় হলো, কোষগুলো আলো-সংবেদনশীল হয়ে গেল। আলো ফেললেই সেগুলো বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করতে শুরু করল।
২০০৩ সালে হেগেম্যান ও নাগেল তাঁদের ফলাফল প্রকাশ করেন। তাঁরা প্রস্তাব দেন, আলো ব্যবহার করে কোষে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরির জন্য চ্যানেলরোডপসিন-২ একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। এবার এই আবিষ্কার পৌঁছে গেল আরেক বিজ্ঞানীর হাতে। তাঁর নাম কার্ল ডেইসেরথ।
রোগীদের দেখে যে প্রশ্ন জেগেছিল
১৯৯০-এর দশকে কার্ল ডেইসেরথ যখন চিকিৎসাবিজ্ঞান পড়া শুরু করেন, তখন তাঁর ইচ্ছা ছিল নিউরোসার্জন হওয়ার। কিন্তু প্রশিক্ষণের একটি অংশ তাঁকে করতে হয়েছিল একটি মানসিক রোগের ক্লিনিকে। সেখানে রোগীদের কষ্ট তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। একই সঙ্গে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগতে থাকে, একজন মানুষের মস্তিষ্ক আরেকজনের মস্তিষ্কের মতোই দেখতে হলেও তারা এত আলাদা আচরণ করে কেন? বিষণ্নতায় আক্রান্ত মানুষ আনন্দ অনুভব করতে এত কষ্ট পান কেন? অটিজমের পেছনে কী ঘটে? সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত মানুষের বিভ্রমের কারণই বা কী?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি তিনি নিউরোসায়েন্সে পিএইচডিও করেন। গবেষণাগারে তিনি মস্তিষ্কের টুকরা নিয়ে পরীক্ষা করতেন। এসব গবেষণা থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু ডেইসেরথ বুঝতে পারছিলেন, জীবন্ত মস্তিষ্কে স্নায়ুকোষ কীভাবে কাজ করে, তা না জানলে তিনি ক্লিনিকে দেখা রোগগুলোর প্রকৃত কারণ বুঝতে পারবেন না।
সমস্যা হলো, জীবন্ত মস্তিষ্কে নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করার মতো কোনো নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি তখনো ছিল না। অনেকে ফ্রান্সিস ক্রিকের স্বপ্ন বাস্তবায়নের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু এমন কাজের পেছনে সময় ও অর্থ ব্যয় করাকে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করতেন। কারণ স্বপ্নটি তখনো অনেকটা অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছিল।
ডেইসেরথ অবশ্য ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিলেন। তাঁর কাছে থাকা চিকিৎসাগুলো অনেক সময় রোগীদের খুব একটা সাহায্য করতে পারত না, আবার সেগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও ছিল মারাত্মক। রোগীদের জন্য আরও ভালো চিকিৎসা খুঁজতে হলে মস্তিষ্ককে আরও গভীরভাবে বুঝতে হবে, এটাই ছিল তাঁর উপলব্ধি।
শৈবালের প্রোটিনে স্নায়ুকোষে
নিজের গবেষণাগার শুরু করার পর ডেইসেরথ ও তাঁর সহকর্মীরা এমন একটি প্রোটিন খুঁজতে থাকলেন, যেটি ব্যবহার করে স্নায়ুকোষে বৈদ্যুতিক সংকেত তৈরি করা যাবে। অনেক প্রোটিন পরীক্ষা করার পর ডেইসেরথ জানতে পারলেন হেগেম্যান ও নাগেলের চ্যানেলরোডপসিন-২ আবিষ্কারের কথা। তিনি নাগেলের কাছে চ্যানেলরোডপসিন-২ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ডিএনএ চাইলেন। ডিএনএটি যখন তাঁর গবেষণাগারে পৌঁছাল, ডেইসেরথ সেটি পেট্রি ডিশে রাখা ইঁদুরের স্নায়ুকোষে প্রবেশ করালেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, এত সংবেদনশীল স্নায়ুকোষ হয়তো বাইরের কোনো জিন গ্রহণ করতে পারবে না, কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু তেমন কিছুই হলো না। স্নায়ুকোষগুলো চ্যানেলরোডপসিন-২ তৈরি করতে শুরু করল।
এবার গবেষকেরা কোষগুলোর ওপর নীল আলো ফেললেন। সঙ্গে সঙ্গে স্নায়ুকোষগুলো সক্রিয় হয়ে গেল। আলো একটি স্নায়ুসংকেত তৈরি করল, যা অন্য স্নায়ুকোষেও ছড়িয়ে গেল। ২০০৫ সালে ডেইসেরথের দল এই ফলাফল প্রকাশ করে। এটি ছিল একটি বিশাল মাইলফলক। তবে ডেইসেরথ জানতেন, আসল কাজ এখনো বাকি। পেট্রি ডিশের স্নায়ুকোষকে আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা গেছে। কিন্তু জীবন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কে কি একই কাজ করা সম্ভব?

এবার পরীক্ষা জীবন্ত মস্তিষ্কে
ডেইসেরথ বিভিন্ন বিজ্ঞানীর সঙ্গে সহযোগিতায় কাজ শুরু করলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন হেগেম্যান ও নাগেলও। আরও গবেষকেরা নতুন নতুন এমন প্রোটিন খুঁজে পেলেন, যেগুলো আলো দিয়ে স্নায়ুকোষকে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করতে পারে। বিভিন্ন প্রোটিন আবার আলোর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে সাড়া দেয়।
২০০৬ সালে এই নতুন পদ্ধতির নাম দেওয়া হলো অপটোজেনেটিকস। এক বছর পর, ২০০৭ সালে ডেইসেরথের দল জীবন্ত ইঁদুরের মস্তিষ্কে প্রথমবারের মতো নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে আলো দিয়ে সক্রিয় করতে সক্ষম হলো। গবেষকেরা ইঁদুরের মস্তিষ্কের মোটর কর্টেক্সের একটি নির্দিষ্ট ধরনের স্নায়ুকোষে চ্যানেলরোডপসিন-২ তৈরির জিন প্রবেশ করিয়েছিলেন। এরপর ইঁদুরের মাথার খুলিতে ছোট একটি ছিদ্র করে একটি সরু অপটিক্যাল ফাইবার ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। সেই ফাইবার দিয়ে স্নায়ুকোষের ওপর ফেলা হলো আলো। ফলাফল?
ইঁদুরের গোঁফ নড়তে শুরু করল। অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা আলো জ্বালিয়ে জীবন্ত মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষ সক্রিয় করে প্রাণীর শরীর নড়াচড়া করাতে পারলেন। ফ্রান্সিস ক্রিকের বহু বছর আগের স্বপ্ন এবার সত্যি হলো।

একই বছর আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো। গবেষকেরা এমন একটি ধরনের স্নায়ুকোষ নিয়ে কাজ করছিলেন, যেগুলো প্রাণীর জেগে থাকা বা ঘুমিয়ে থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে তাঁরা ধারণা করেছিলেন। ইঁদুরের ওই স্নায়ুকোষে চ্যানেলরোডপসিন-২ প্রবেশ করানো হলো। এরপর ঘুমন্ত ইঁদুরের মস্তিষ্কে ফেলা হলো আলো। ইঁদুর জেগে উঠল। এতে গবেষকদের ধারণাটি নিশ্চিত হলো, ওই স্নায়ুকোষগুলো সত্যিই জেগে থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত।
কিন্তু অপটোজেনেটিকসের সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যবহারগুলোর একটি সামনে এল আরও কয়েক বছর পর।
আলো দিয়ে স্মৃতি জাগানো
২০১২ সালে ডেইসেরথ ও নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী সুসুমু টোনেগাওয়ার সঙ্গে মিলে একটি অসাধারণ পরীক্ষা চালান। তাঁরা জানতে চেয়েছিলেন, কোনো নির্দিষ্ট স্মৃতি তৈরি হওয়ার সময় মস্তিষ্কের কোন স্নায়ুকোষগুলো জড়িত থাকে। ইঁদুরকে এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি করা হলো, যেখানে তারা ভয় পেয়েছিল। গবেষকেরা লক্ষ্য করলেন, সেই অভিজ্ঞতার সময় কোন স্নায়ুকোষগুলো সক্রিয় হচ্ছে। ধারণা করা হলো, এই স্নায়ুকোষগুলোর একটি নির্দিষ্ট বিন্যাস ওই স্মৃতি ধরে রাখার সঙ্গে জড়িত। এই ধরনের স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত স্নায়ুপথের বিন্যাসকে বলা হয় এনগ্রাম।
এরপর ইঁদুরটি আর বিপদের মধ্যে না থাকা অবস্থায় গবেষকেরা সেই নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষগুলো আবার আলো দিয়ে সক্রিয় করলেন। ইঁদুর ভয় পাওয়ার মতো আচরণ করল। অর্থাৎ কোনো বাস্তব বিপদ না থাকলেও, কেবল স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত স্নায়ুকোষগুলো সক্রিয় করে ভয় পাওয়ার প্রতিক্রিয়া তৈরি করা গেল। এটি ছিল প্রথমবারের মতো এমন একটি পরীক্ষা, যেখানে বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট একটি স্মৃতির জন্য ঠিক কোন স্নায়ুকোষগুলো প্রয়োজন, তা শনাক্ত করে সেগুলোকে আবার সক্রিয় করতে পেরেছিলেন।
মস্তিষ্কের ভেতরের জটিল রহস্য
মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ৯ হাজার কোটি স্নায়ুকোষ রয়েছে। প্রতিটি স্নায়ুকোষ আবার হাজার হাজার অন্য স্নায়ুকোষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতে পারে। কখনো একটি স্নায়ুকোষ থেকে বের হওয়া পথ মস্তিষ্কের একেবারে অন্য প্রান্তে চলে যায়। আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করা স্নায়ুকোষগুলো পাশাপাশি অবস্থান করতে পারে।
এ কারণে শুধু মস্তিষ্কের একটি অঞ্চল দেখে বোঝা কঠিন, সেখানে ঠিক কোন স্নায়ুকোষ কোন কাজ করছে। অপটোজেনেটিকস এই সমস্যার একটি নতুন সমাধান দিয়েছে। এখন বিজ্ঞানীরা জটিল স্নায়ুজালের ভেতর থেকে নির্দিষ্ট ধরনের স্নায়ুকোষ আলাদা করে সক্রিয় করতে পারেন। ফলে তাঁরা দেখতে পারেন, কোন স্নায়ুকোষ কোন কাজের সঙ্গে জড়িত।
এর মাধ্যমে ব্যথা অনুভব করা, সামাজিক আচরণ, তৃষ্ণা, খাবার গ্রহণ, পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতি এবং মনোযোগের মতো বিভিন্ন কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত স্নায়ুপথ শনাক্ত করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, শরীরের দৈনিক ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করা স্নায়ুকোষ এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা সক্রিয় হলে জ্বর তৈরিতে ভূমিকা রাখা স্নায়ুকোষও শনাক্ত করা হয়েছে। আচরণ আরও জটিল হলে বিষয়টি আরও চমকপ্রদ হয়ে ওঠে। যেমন, ইঁদুর যখন বাচ্চাদের যত্ন নেয়, তখন সেই পুরো আচরণটি কোনো একটি স্নায়ুপথ নিয়ন্ত্রণ করে না। বাচ্চাদের বাসায় জড়ো করার জন্য এক ধরনের স্নায়ুপথ কাজ করে, আবার শরীর পরিষ্কার করার জন্য কাজ করে অন্য একটি স্নায়ুপথ। অর্থাৎ আমরা যাকে একটি মাত্র আচরণ বলে দেখি, তার ভেতরেও আলাদা আলাদা স্নায়ুপথের সমন্বয় থাকতে পারে।
অপটোজেনেটিকসের কাজ শুধু মস্তিষ্কে সীমাবদ্ধ নেই। স্নায়ুতন্ত্র কীভাবে শরীরের অন্য অঙ্গের সঙ্গে যোগাযোগ করে, সেটিও বোঝার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। কার্ল ডেইসেরথের গবেষণায় দেখা গেছে, হৃদস্পন্দনের সঙ্গে আমাদের অনুভূতির সম্পর্ক রয়েছে। হৃদযন্ত্রকে জোরে কাজ করতে বাধ্য করা হলে উদ্বেগের অনুভূতি আরও শক্তিশালী হতে পারে। আবার অন্য গবেষকেরা অন্ত্রে এমন কিছু কোষের সন্ধান পেয়েছেন, যেগুলো ব্যাখ্যা করে কেন কিছু মানুষ কৃত্রিম মিষ্টির চেয়ে চিনি খেতে বেশি পছন্দ করে।
এসব গবেষণা দেখাচ্ছে, মস্তিষ্ককে আলাদা একটি অঙ্গ হিসেবে দেখলেই পুরো গল্প বোঝা যায় না। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের সঙ্গে স্নায়ুতন্ত্রের যোগাযোগও আমাদের অনুভূতি ও আচরণকে প্রভাবিত করে।
এবার চিকিৎসার পালা
অপটোজেনেটিকস প্রথমে ছিল মূলত গবেষণার পদ্ধতি। বিজ্ঞানীরা এর সাহায্যে মস্তিষ্কের রহস্য বোঝার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে এর চিকিৎসাগত সম্ভাবনাও সামনে এসেছে।
এই পদ্ধতির সাহায্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, সিজোফ্রেনিয়া, আলঝেইমার রোগ ও পারকিনসন রোগের মতো বিভিন্ন মানসিক ও স্নায়বিক সমস্যার বৈশিষ্ট্য বোঝার ক্ষেত্রে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। এর পরের ধাপ আরও বড়। সেটি হলো অপটোজেনেটিকসকে সরাসরি চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহার করা। বর্তমানে এমন কিছু ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে, যেখানে দৃষ্টিশক্তি হারানো মানুষের চোখে আবার কিছুটা দৃষ্টি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসা এমন একটি রোগ, যাতে চোখের রড ও কোন কোষ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারাতে পারেন রোগী। গবেষকেরা এমন একজন অন্ধ মানুষের রেটিনায় চ্যানেলরোডপসিনের মতো একটি প্রোটিন প্রবেশ করিয়েছেন। এতে ওই ব্যক্তি কিছুটা দৃষ্টি ফিরে পেয়েছেন। বিশেষ ধরনের আলো-নির্গত চশমা ব্যবহার করে তিনি টেবিলের ওপর থাকা কিছু বস্তু আলাদা করে দেখতে এবং সেগুলো ধরতে পেরেছেন।
এটি এখনো সম্পূর্ণ স্বাভাবিক দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনার মতো নয়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা যে আলো ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত দৃষ্টিপথে আবার তথ্য পাঠানোর চেষ্টা করতে পারছেন, সেটিই বড় অগ্রগতি। অপটোজেনেটিকসের আরেকটি সম্ভাব্য ব্যবহার ককলিয়ার ইমপ্লান্টে।
বর্তমানে ককলিয়ার ইমপ্লান্ট বৈদ্যুতিক সংকেত ব্যবহার করে শ্রবণ স্নায়ুকে সক্রিয় করে। ভবিষ্যতে যদি আলো ব্যবহার করে এই স্নায়ুকে আরও নির্দিষ্টভাবে সক্রিয় করা যায়, তাহলে শব্দের তথ্য আরও নিখুঁতভাবে মস্তিষ্কে পাঠানো সম্ভব হতে পারে।
একটি শৈবাল থেকে মস্তিষ্কের সুইচ
গল্পটা শুরু হয়েছিল খুব ছোট একটি প্রশ্ন দিয়ে। একটি এককোষী সবুজ শৈবাল এত দ্রুত আলো বুঝতে পারে কীভাবে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পিটার হেগেম্যান আবিষ্কার করলেন আলো-সংবেদনশীল একটি বিশেষ প্রোটিনের সম্ভাবনা। জর্জ নাগেলের সঙ্গে কাজ করে তিনি ও নাগেল আবিষ্কার করলেন চ্যানেলরোডপসিন নামের আলো-নিয়ন্ত্রিত আয়ন চ্যানেল। তারপর কার্ল ডেইসেরথ সেই প্রোটিনকে স্নায়ুকোষে ব্যবহার করে দেখালেন, আলো দিয়ে স্নায়ুকোষকে দ্রুত সক্রিয় করা যায়। সেখান থেকেই জন্ম নিল অপটোজেনেটিকস।
আজ এই পদ্ধতির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা জীবন্ত মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। তাঁরা দেখতে পারেন কোন স্নায়ুকোষ ব্যথার সঙ্গে জড়িত, কোনটি ক্ষুধা বা তৃষ্ণার সঙ্গে, কোনটি সামাজিক আচরণের সঙ্গে। এমনকি একটি নির্দিষ্ট স্মৃতির সঙ্গে জড়িত স্নায়ুকোষগুলোও শনাক্ত করে সেগুলোকে আবার সক্রিয় করা সম্ভব হয়েছে।
মানুষের মস্তিষ্কের রহস্য অবশ্য এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি। কিন্তু কয়েক দশক আগে যে প্রশ্নটি অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল, তার উত্তর এখন আমাদের হাতে আছে। প্রশ্নটি হলো, জীবন্ত মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে কি আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়?
এর উত্তর হলো—হ্যাঁ, যায়।
একটি ক্ষুদ্র শৈবালের আলো অনুভবের রহস্য থেকে শুরু হওয়া সেই যাত্রা আজ পৌঁছে গেছে মানুষের স্মৃতি, অনুভূতি, আচরণ ও রোগের গভীরে। সে কারণেই ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে কার্ল ডেইসেরথ, পিটার হেগেম্যান ও জর্জ নাগেলকে।
সূত্র: নোবেল প্রাইজ ডটঅর্গ
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।


