যে অঙ্কে হার মেনেছিলেন গণিতবিদেরা, সেটাই হোমওয়ার্ক ভেবে সমাধান করেছিলেন এক ছাত্র
ক্লাসরুমের ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে লেখা খটমটে দুটো গাণিতিক সমীকরণ। দুনিয়ার বাঘা বাঘা গণিতবিদ বছরের পর বছর মাথা খুঁড়েও যেগুলোর কোনো কূলকিনারা করতে পারেননি। কিন্তু সেই ক্লাসে দেরিতে ঢোকা এক ছাত্র ঘাম মুছতে মুছতে ভাবল, ‘ইশ! স্যার আজ আবার কঠিন দুটো হোমওয়ার্ক দিয়ে দিলেন!’ এরপর সে খাতায় টুকল সেই সমীকরণ আর কয়েক দিনের চেষ্টায় দিব্যি মিলিয়েও ফেলল! কেমন হতো, যদি কেউ তাকে আগেই বলে দিত যে এই অঙ্ক মেলানো অসম্ভব?
হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। কেউ যদি তাকে বলে দিত যে ওগুলো সমাধানের অযোগ্য, তাহলে হয়তো ছেলেটি খাতা-কলম নিয়ে বসারই সাহস পেত না। ইতিহাসটাও হতো অন্যরকম। চলুন, আজ আপনাকে শোনাই গণ্ডি ভাঙার সেই অবিশ্বাস্য সত্যি গল্পটি।
১৯৩৯ সালের কথা। পরিসংখ্যানের অধ্যাপক জের্জি নেইম্যানের ক্লাস চলছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলি ক্যাম্পাসে জর্জ ড্যান্টজিগ নামে এক তরুণ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন।তাঁর একটা বদভ্যাস ছিল, তিনি প্রায়ই ক্লাসে দেরি করে আসতেন। সেদিনও তার ব্যতিক্রম হলো না।

হাঁপাতে হাঁপাতে ক্লাসরুমে ঢুকে তিনি দেখলেন, ক্লাস প্রায় শেষের দিকে। ব্ল্যাকবোর্ডে দুটি পরিসংখ্যানের সমীকরণ লেখা। তিনি দ্রুত খাতা বের করে সমীকরণ দুটি টুকে নিলেন। তাঁর বদ্ধমূল ধারণা ছিল, এগুলো বোধহয় স্যারের দেওয়া আজকের সাধারণ কোনো হোমওয়ার্ক।
বাসায় ফিরে ড্যান্টজিগ তাঁর সেই হোমওয়ার্ক নিয়ে বসলেন। কিন্তু খাতা-কলম নিয়ে এগোতে গিয়ে দেখেন, অঙ্ক দুটি কিছুতেই মিলছে না। সাধারণ হোমওয়ার্কের চেয়ে এগুলো যেন একটু বেশিই কঠিন এবং প্যাঁচানো। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্র তিনি নন। তিনি ভাবলেন, ক্লাসে দেরি করে গিয়ে এমনিতেই স্যারের নজরে খারাপ হয়ে আছেন, এই হোমওয়ার্কটা অন্তত ঠিকঠাক জমা দিতে হবে।
টানা কয়েক দিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, খাতার পর খাতা কেটেকুটে তিনি অবশেষে সমীকরণ দুটির সমাধান বের করে ফেললেন!
কয়েক দিন পর ড্যান্টজিগ তাঁর সমাধান করা সেই হোমওয়ার্ক নিয়ে অধ্যাপক নেইম্যানের কাছে গেলেন। দেরি করে জমা দেওয়ার জন্য তিনি স্যারের কাছে বেশ লজ্জিত ভঙ্গিতে ক্ষমাও চাইলেন। নেইম্যান তখন অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তিনি ড্যান্টজিগকে বললেন খাতাটা তাঁর টেবিলের এক কোণে রেখে যেতে।
টেবিলের ওপর তখন কাগজপত্রের বিশাল স্তূপ। ড্যান্টজিগ ভয়ে ভয়ে খাতাটা সেখানে রেখে এলেন। মনে মনে ভাবলেন, এই কাগজের পাহাড়ে তাঁর কষ্ট করে করা হোমওয়ার্কটা হয়তো চিরতরে হারিয়েই যাবে। স্যার হয়তো কোনো দিন ওটা খুলেও দেখবেন না।
এর প্রায় ছয় সপ্তাহ পরের কথা। ছুটির দিনে ড্যান্টজিগ তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎ দরজায় প্রচণ্ড ধাক্কা। ধড়ফড় করে উঠে দরজা খুলতেই তিনি চমকে উঠলেন। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং অধ্যাপক জের্জি নেইম্যান! তাঁর হাতে একতাড়া কাগজ, আর চোখেমুখে অদ্ভুত এক উত্তেজনা।
ড্যান্টজিগ কিছু বুঝে ওঠার আগেই নেইম্যান বলে উঠলেন, ‘আমি তোমার প্রথম সমাধানটার একটা ভূমিকা লিখে ফেলেছি। এটা এখনই জার্নালে প্রকাশের জন্য পাঠাতে হবে। তুমি দ্রুত তৈরি হয়ে নাও!’
ড্যান্টজিগ তখনো বোকার মতো তাকিয়ে আছেন। জার্নাল? প্রকাশ? একটা সাধারণ হোমওয়ার্ক নিয়ে এত মাতামাতি কেন?
তখনই আসল সত্যটা জানতে পারলেন তিনি। ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা ওই সমীকরণ দুটি কোনো সাধারণ হোমওয়ার্ক ছিল না। ওগুলো ছিল পরিসংখ্যানের ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত দুটি অমীমাংসিত সমস্যা! দুনিয়ার তাবৎ পণ্ডিতেরা বছরের পর বছর চেষ্টা করে যেগুলোর সমাধান বের করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন, অধ্যাপক নেইম্যান ক্লাসের শুরুতে শুধু উদাহরণ হিসেবে সেগুলো বোর্ডে লিখেছিলেন। আর ড্যান্টজিগ কিনা সেটাকে হোমওয়ার্ক ভেবে একাই সমাধান করে ফেলেছেন!
পরবর্তী সময়ে এই দুটি সমাধানের একটিকে তিনি তাঁর পিএইচডি থিসিস হিসেবে জমা দিয়েছিলেন, যা তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
জর্জ ড্যান্টজিগ কি সেদিন নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিভাবান বা অসাধারণ কেউ ভেবে ওই সমীকরণ দুটি সমাধান করেছিলেন? একেবারেই না। তিনি সফল হয়েছিলেন শুধু একটি কারণে; তিনি জানতেন না যে ওই কাজটা করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব।
আমাদের জীবনেও এমন অনেক লক্ষ্য বা স্বপ্ন থাকে, যেগুলোকে আমরা শুরুতেই খুব কঠিন বা অসম্ভব ট্যাগ দিয়ে দিই। সমাজ, চারপাশের মানুষ বা আমাদের নিজেদের মনের ভয় সেই অদৃশ্য সীমানাগুলো তৈরি করে দেয়। আমরা কোনো দিন চেষ্টাই করে দেখি না। জর্জ ড্যান্টজিগের এই গল্পটা আমাদের কী শেখায়? শেখায়, অসম্ভব শব্দটা আসলে বাস্তব কোনো বাধা নয়, এটি শুধুই আমাদের মনের একটা ভুল ধারণা। আপনি যেদিন বিশ্বাস করবেন যে কোনো কিছুই আগে থেকে অসম্ভব নয়, সেদিন থেকে আপনার জন্য সব দরজা খুলে যাবে।
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।


