
১৮ জানুয়ারি ১৭৭৮ সাল। হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের কাওয়াই দ্বীপ। সমুদ্র থেকে যেন দুটি বিশাল বস্তু ভেসে আসছে। অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে দ্বীপের আদিবাসীরা। চোখেমুখে ভয় ও আতঙ্ক। এ রকম বিশালাকার বস্তু তারা আগে দেখেনি। হয়তো কোনো দানব সমুদ্র থেকে উঠে এসেছে, এমনটাই ভাবছে আদিবাসীরা। ধীরে ধীরে তীরের দিকে এগিয়ে আসছে দুটি দানব। আসলে এগুলো জাহাজ। ক্যাপ্টেন কুকের জাহাজ।
কুকের দুটি জাহাজ কাওয়াই দ্বীপে ভিড়ল। জাহাজ থেকে নেমে এলেন সুন্দর পোশাক পরা কিছু সাদা চামড়ার মানুষ। আগে কোনো দিন আদিবাসীরা এমন মানুষ দেখেনি। দেখবে কী করে, ওদের পৃথিবীটা তো ওই কাওয়াই দ্বীপেই বন্দী। বিদেশিদের দেখে তারা অভিভূত হলো। আমন্ত্রণ জানাল দ্বীপে।
ক্যাপ্টেন কুক ধূর্ত নাবিক। আদিবাসীদের সঙ্গে ভাব জমাতে শুরু করলেন। লোহার বিনিময়ে জাহাজ বোঝাই করলেন খাবার দিয়ে। যথাযথ খাবার সংগ্রহ করে দ্বীপ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। এখানে আর তাঁর কোনো কাজ নেই। স্বার্থসিদ্ধি শেষ। কুক তাঁর দলবল নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন আরও উত্তরে। তবে অভিযান মোটেও সহজ ছিল না। পদে পদে বাধাবিপত্তি। কুক জানতেন না, ভাগ্যের নির্মম পরিহাস মেনে আবার একদিন ফিরে আসতে হবে এই দ্বীপে। কিন্তু কেন? কেনই বা কুক হাওয়াই দ্বীপে আসবেন? সে প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে যেতে হবে আরও ১০ বছর পেছনে।
১৭৬৮ সাল। ১০০ জন নাবিক নিয়ে ক্যাপ্টেন কুক যাত্রা করেছেন তাহিতি দ্বীপের উদ্দেশে। হ্যাঁ, ক্যাপ্টেন ব্লাইয়ের সেই বিখ্যাত তাহিতি দ্বীপ। চার্লস নর্ডহফ ও জেমস নরম্যান হল রচিত ‘দ্য বাউন্টি ট্রিলজি’ বইয়ের কথা বলছি। ‘বাউন্টি বিদ্রোহ’ নামে সেবা প্রকাশনী থেকেও বইটি প্রকাশিত হয়েছে।
যা হোক, প্রসঙ্গে ফিরি। কুকের যাত্রা শুরু হলো। আনুষ্ঠানিকভাবে সবাইকে জানানো হলো, তাহিতি দ্বীপে যাচ্ছেন বৈজ্ঞানিক গবেষণার কাজে। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য ভিন্ন। কুককে আসলে পাঠানো হয়েছে দক্ষিণের এক বিশাল মহাদেশ খোঁজার কাজে। কুক সে যাত্রায় বিফল হলেন। খুঁজে পেলেন না দক্ষিণের দ্বীপ। তবে আবিষ্কার করলেন নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া দ্বীপের কিছু অংশ। টানা তিনবার সমুদ্রযাত্রা করে এই দুই দ্বীপমহাদেশসহ আরও কয়েকটি দ্বীপ আবিষ্কার করেন তিনি। সঙ্গে প্রতিটি দ্বীপের নিখুঁত মানচিত্রও তৈরি করেন কুক নিজে। কিন্তু সবচেয়ে দক্ষিণের দ্বীপ খুঁজে না পাওয়ার কষ্ট ছিল তাঁর মনে। কিছুতেই তিনি এটা মেনে নিতে পারছিলেন না। ভেবেছিলেন, দক্ষিণে আর কোনো মহাদেশ নেই। হাল ছেড়েই দিয়েছিলেন। কিন্তু কপালে এখানেই তাঁর সমুদ্রযাত্রার শেষ লেখা ছিল না।
১৭৭৮ সাল। আবার চড়ে বসলেন জাহাজে। এবার আগের চেয়েও দক্ষিণে যেতে চান। যাত্রাপথে দেখা পান হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের। শুরুতেই সে কথা বলেছি। কুক দ্বীপ ছেড়ে চললেন আরও দক্ষিণে। কিন্তু বেশি দূর যেতে পারলেন না। ফলে কাছের এক দ্বীপে নোঙর ফেলেন। ওটা ছিল তাহিতি দ্বীপের কেলাকেকুয়া অঞ্চল। এখানে ঘটে এক মজার ঘটনা।

দ্বীপের আদিবাসীরা লোনো নামের এক দেবতার পূজা করত। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, কেলাকেকুয়া ছিল পবিত্র স্থান। এখানেই আবির্ভাব হওয়ার কথা দেবতা লোনার। ক্যাপ্টেন কুকের জাহাজ সেখানে নোঙর ফেললে আদিবাসীরা মনে করল দেবতারা এসেছেন তাঁদের সাহায্য করার জন্য। আদিবাসীরা কুক ও তাঁর দলবলকে দেবতা হিসেবেই সম্মান করতে শুরু করে। ধূর্ত কুক সেটা বুঝতে পেরে তাঁদের সরলতার সুযোগ নেন। চেপে যান আসল সত্যটা। ধীরে ধীরে নাবিকেরা জুলুম করতে শুরু করেন আদিবাসীদের ওপর। এভাবেই চলছিল দিন। হঠাৎ এক নাবিকের মৃত্যু হয়। এর পর থেকে কুকের বিপত্তির শুরু।
আদিবাসীরা বুঝল, তারা দেবতা নয়। দেবতাদের মৃত্যু হয় নাকি! আদিবাসীরা তাদের ওপর চড়াও হলো। কুক বাধ্য হলেন দ্বীপ ছাড়তে। কিন্তু যাবেন কোথায়? উত্তাল সমুদ্রে ঝড়ের কবলে পড়ে আবার ফিরে আসেন হাওয়াই দ্বীপে। এবার আদিবাসীরা তাঁদের বরণ তো করল না, বরং পাথর ছুড়ে মারতে শুরু করে। রাতদিন এভাবেই চলছিল দুই পক্ষের হালকা সংঘর্ষ। ক্যাপ্টেনের ক্ষুধার্ত নাবিকেরা মাঝেমধ্যে তীরে নেমে খাবার চুরি করতেন। জাহাজ থেকে ছোট বোট নিয়ে চলে যেতেন তীরে। একদিন এক আদিবাসী বোট চুরি করে সরিয়ে ফেলে। আদিবাসীদের স্পর্ধা দেখে খেপে যান কুক। আদিবাসীদের স্থানীয় এক রাজা কালানিওপুকে তুলে আনার চেষ্টা করেন। ভেবেছিলেন, ভয় দেখিয়ে বোটটি ফেরত চাইবেন। হলো হিতে বিপরীত। রাজাকে তুলে নেওয়ার সময় আদিবাসীদের হাতে ধরা পড়েন কুক। এর মধ্যে জাহাজ থেকে এক সৈন্যের ছোড়া গুলিতে মারা যায় আদিবাসীদের এক গোত্রপ্রধান। অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। আদিবাসীরা একযোগে আক্রমণ করে কুকদের ওপর। যুদ্ধক্ষেত্রেই আদিবাসীদের একাধিকবার ছুরির আঘাতে মারা যান ক্যাপ্টেন কুক। শেষ হয় ক্যাপ্টেন কুকের উপাখ্যান।

তবে কুকের কৃতিত্বের কথা মানুষ ভোলেনি। তাঁর কারণেই পৃথিবীর মানচিত্রে যোগ হয়েছিল নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ আরও অনেক দ্বীপের নাম। সঙ্গে সেসব দ্বীপের মানচিত্রও পাওয়া গিয়েছিল।
সূত্র: হিস্ট্রি ডট কম
*লেখাটি পূর্বে কিশোর আলোয় প্রকাশিত
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।



