
চারদিকে ধু ধু প্রান্তর। কালচে রুক্ষ পাথুরে মাটি, তার মাঝে যেন অনন্তকালের শূন্যতা। জর্ডানের এই বিস্তীর্ণ মরুভূমির বুক চিরে আপনি যদি কোনো ছোট বিমানে চড়ে উড়ে যান, তবে নিচে তাকালে আপনার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে যেতে পারে। মাটির শত শত ফুট ওপর থেকে হঠাৎ চোখে পড়বে বিশালাকার সব নিখুঁত বৃত্ত। একটা বা দুটো নয়, ১১টি সুবিশাল পাথরের বৃত্ত ছড়িয়ে আছে জর্ডানের বুকে। যেন ভিনগ্রহের কোনো প্রাণী বিশাল কোনো কম্পাস দিয়ে মরুভূমির বুকে এঁকে রেখে গেছে নিখুঁত সব জ্যামিতিক নকশা।
রহস্যটা আরও ঘনীভূত হবে, যখন জানবেন এই বৃত্তগুলোর কোনো দরজা নেই! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। চারদিক দিয়ে নিরেট পাথরের দেয়াল দিয়ে ঘেরা এই বৃত্তগুলোতে ঢোকার বা বেরোনোর কোনো পথ রাখা হয়নি। ভেতরে যেতে হলে আপনাকে আক্ষরিক অর্থেই দেয়াল টপকে লাফ দিয়ে ভেতরে ঢুকতে হবে। যেন প্রাচীন যুগের কোনো গোপন ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জ, যার সদর দরজা বানাতেই ভুলে গেছে ইঞ্জিনিয়াররা!
কিন্তু কারা বানিয়েছে এগুলো? কেন বানিয়েছে? কবে বানিয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর আজও বিজ্ঞানীদের কাছে এক বিশাল ধাঁধা। চলুন, আজ এই পাথুরে গোলকধাঁধার গভীরে একটু ঢুঁ মারা যাক।
দুই
এই বৃত্তগুলোর আকার শুনলে আপনার চোখ কপালে উঠবে। ১১টি বৃত্তের মধ্যে ১০টিরই ব্যাস প্রায় ৪০০ মিটার বা ১ হাজার ৩১২ ফুট! পৃথিবীর মানুষের গড় উচ্চতা ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি। অর্থাৎ ওই বৃত্তগুলোর ব্যাস প্রায় ২৪০ জন মানুষের উচ্চতার সমান।
আরও সহজ করে বলি। কারণ বৃত্তগুলোর আকার বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ। পর পর চারটে আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল মাঠ পাশাপাশি রাখলে যতটা জায়গা নেবে, ঠিক ততটা একেকটি বৃত্ত! এত বিশাল একটা জায়গা জুড়ে নিরেট পাথরের দেয়াল তোলা হয়েছে, অথচ দেয়ালগুলো খুব একটা উঁচু নয়। মাত্র কয়েক ফুট উঁচু এই দেয়ালগুলো দেখে মনে হয়, যেন কোনো বিশাল খেলার মাঠের সীমানা প্রাচীর।

জর্ডান, সিরিয়া ও সৌদি আরবজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই কালচে পাথুরে মরুভূমিকে বলা হয় হারাত আল-শাম। অনেকে একে ব্ল্যাক ডেজার্টও বলে। স্থানীয় বেদুইনরা যুগ যুগ ধরে এই বিশাল কাঠামোগুলোকে বলে আসছে ওয়ার্কস অব দ্য ওল্ড মেন, মানে প্রাচীন মানুষদের কীর্তি। কারণ, তাদের বাবা-দাদারাও জানতেন না এগুলো কারা বানিয়েছে।
১৯২০-এর দশকে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের পাইলটরা কায়রো থেকে বাগদাদ পর্যন্ত নিয়মিত বিমান চালাতেন। মূলত তাঁরাই আকাশ থেকে প্রথম এই অদ্ভুত জ্যামিতিক নকশাগুলো খেয়াল করেন। তবে ওই পর্যন্তই। মরুভূমির বুকে পড়ে থাকা এই পাথর নিয়ে কারও তেমন কোনো মাথাব্যথা ছিল না। দশকের পর দশক এগুলো লোকচক্ষুর আড়ালেই পড়ে ছিল।
এরপর দৃশ্যপটে এলেন ডেভিড কেনেডি। ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার এই অধ্যাপক ১৯৯৭ সাল থেকে জর্ডানে শুরু এক যুগান্তকারী প্রকল্প করলেন। সেই প্রকল্পের নাম অ্যারিয়াল আর্কিওলজি ইন জর্ডান প্রজেক্ট। সঙ্গে ছিল মিডল ইস্টের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার জন্য এরিয়াল ফটোগ্রাফিক আর্কাইভ। কেনেডি যখন তাঁর দলবল নিয়ে আকাশ থেকে হাই-রেজ্যুলেশনের ছবি তুলতে শুরু করলেন, তখন বেরিয়ে এল এল চমক!
তিন
আকাশ থেকে তোলা ছবিগুলো যখন ল্যাবরেটরিতে বসে বিশ্লেষণ করা হলো, তখন বিজ্ঞানীদের চোখ ছানাবড়া! প্রতিটি বৃত্ত একে অপরের সঙ্গে এতটাই নিখুঁতভাবে মিলে যায় যে, ডেভিড কেনেডি নিজেই স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, ‘এগুলোর মধ্যকার এই নিখুঁত মিলকে নিছক কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো উপায় নেই।’
প্রশ্ন হলো, প্রাচীন যুগের মানুষ, যাদের কাছে কোনো আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল না, তারা কীভাবে এত নিখুঁত ৪০০ মিটারের বৃত্ত আঁকল?

কেনেডি একটা চমৎকার থিওরি দিয়েছেন। তাঁর মতে, কাজটা যতটা কঠিন মনে হচ্ছে, হয়তো ততটা কঠিন ছিল না। এই বৃত্তগুলো মূলত স্থানীয় পাথর দিয়েই বানানো। ১২ জন শক্তপোক্ত মানুষ যদি টানা এক সপ্তাহ হাড়ভাঙা খাটুনি খাটে, তবে এমন একটা বিগ সার্কেল বানিয়ে ফেলা সম্ভব।
কিন্তু ওই যে, নিখুঁত গোল আকারটা কীভাবে এল? এর উত্তরও দিয়েছেন কেনেডি। তিনি বলছেন, এর জন্য অন্তত একজন মাস্টারমাইন্ড দরকার ছিল। কাজটা হয়তো খুব সাধারণ একটা বুদ্ধিতেই করা হয়েছিল। ওই মাস্টারমাইন্ড বৃত্তের ঠিক মাঝখানে একটা খুঁটি পুঁতেছিলেন। তারপর সেই খুঁটির সঙ্গে ২০০ মিটার লম্বা একটা দড়ি বেঁধেছিলেন। দড়ির অন্য প্রান্ত ধরে তিনি শুধু খুঁটিটাকে কেন্দ্র করে গোল হয়ে হেঁটেছেন আর মাটিতে দাগ কেটে গেছেন। ঠিক যেন জ্যামিতি বক্সের পেন্সিল-কম্পাসের মতো!
এই থিওরির সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো বৃত্তগুলোর ভেতরের ছোটখাটো ত্রুটি। আকাশ থেকে দেখা যায়, বৃত্তের যেসব জায়গায় মাটি উঁচু-নিচু বা এবড়োখেবড়ো, সেখানে বৃত্তের আকার কিছুটা বেঁকে গেছে। কারণ, দড়ি ধরে ওই উঁচু-নিচু জায়গায় নিখুঁতভাবে হাঁটা স্থপতির পক্ষে সম্ভব হয়নি।
কিন্তু আসলে প্রশ্ন হলো, এগুলো বানানো হয়েছিল কেন? প্রথম দর্শনে যে কারও মনে হতে পারে, এগুলো হয়তো প্রাচীনকালের বিশাল কোনো খোঁয়াড়। পশুদের আটকে রাখার জন্য এগুলো বানানো হয়েছিল। কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই এই থিওরি বাতিল হয়ে যায়।
প্রথমত, দেয়ালগুলো মাত্র কয়েক ফুট উঁচু। একটা ছাগল বা ভেড়াও চাইলে একটু কসরত করে এই দেয়াল টপকে পালাতে পারে। দ্বিতীয়ত, ভেতরে পশুদের খাবার বা পানি দেওয়ার মতো কোনো বাড়তি কাঠামোর অস্তিত্ব নেই। তৃতীয়ত, পশুদের আটকে রাখার খোঁয়াড় এত নিখুঁত জ্যামিতিক বৃত্তাকার হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা, খোঁয়াড়ে ঢোকার জন্য তো একটা গেট লাগবে! এখানে তো সেটাও নেই!
তাহলে কি এগুলো কোনো সমাধিক্ষেত্র?
কেনেডি বলছেন, একটি বৃত্তের ঠিক সীমানার ওপর তিনটি পাথরের স্তূপ পাওয়া গেছে, যেগুলো সাধারণত প্রাচীনকালে কবর হিসেবে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু কেনেডির মতে, এই স্তূপগুলো মূল বৃত্ত বানানোর অনেক পরে সেখানে যোগ করা হয়েছে। যখন এই বিশাল বৃত্তগুলোর আসল উদ্দেশ্য মানুষের মন থেকে হারিয়ে গেছে, তখন হয়তো পরবর্তী কোনো প্রজন্ম জায়গাটাকে কবরস্থান হিসেবে ব্যবহার করেছে।
চার
রহস্যের জট খুলতে ইংল্যান্ডের ডারহাম ইউনিভার্সিটির দুজন প্রত্নতাত্ত্বিক গ্রাহাম ফিলিপ এবং জেনি ব্র্যাডবারি সিরিয়ার হোমস শহরের কাছে একটি বিগ সার্কেল নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন।
সেখানে গিয়ে তাঁরা দেখলেন, বৃত্তটা এমন একটা জায়গায় বানানো, যার ঠিক ভেতরে দাঁড়ালে চারপাশের ফসলের খেত এবং মানুষের বসতির এক চমৎকার প্যানোরামিক বা বিস্তৃত দৃশ্য চোখে পড়ে। তাঁদের মতে, এই কৌশলগত অবস্থানের কারণেই হয়তো জায়গাটিকে বৃত্ত বানানোর জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল। হয়তো এটি ছিল কোনো বিশেষ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জায়গা, কিংবা প্রাচীন মানুষদের একত্রিত হওয়ার কোনো পবিত্র ময়দান।

ডেভিড কেনেডি এবং তাঁর দলের গবেষণা থেকে একটা বিষয় খুব স্পষ্ট। জর্ডানের এই মরুভূমি আসলে পাথরের কাঠামোর এক বিশাল উন্মুক্ত জাদুঘর! শুধু বৃত্ত নয়, হাজার হাজার বিচিত্র সব পাথরের কাঠামো ছড়িয়ে আছে এই মেগালিথিক ল্যান্ডস্কেপে।
যেমন ধরুন ঘুড়ির মতো দেখতে কাঠামোগুলো। এগুলো ছিল প্রাচীন যুগের ভয়াবহ সব মরণফাঁদ। ভি-আকৃতির বিশাল পাথরের দেয়াল দিয়ে ঘেরা এই কাঠামোগুলোর কাজ ছিল মরুভূমির নিরীহ প্রাণীগুলোকে তাড়িয়ে এনে একটা নির্দিষ্ট খাঁচায় আটকে ফেলা। ওপর থেকে দেখলে এগুলোকে অবিকল আকাশে ওড়া ঘুড়ির মতো মনে হয়।
এছাড়াও আছে চাকার মতো দেখতে কাঠামো, যেগুলোর ভেতর থেকে সাইকেলের স্পোকের মতো পাথরের লাইন বেরিয়ে গেছে। আছে পেন্ডান্ট, যা মূলত সারি সারি পাথরের স্তূপের লাইন, যেগুলো কোনো সমাধির পাশ থেকে শুরু হয়ে বহুদূর পর্যন্ত চলে গেছে। আরও আছে রহস্যময় সব দেয়াল, যেগুলো কোনো কারণ ছাড়াই মরুভূমির বুক চিরে মাইলের পর মাইল এঁকেবেঁকে চলে গেছে। এর কোনো ব্যবহারিক অর্থই আজ পর্যন্ত খুঁজে পাননি বিজ্ঞানীরা।
ডেভিড কেনেডির এই পুরো গবেষণার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল গুগল আর্থ। তাঁর মতে, মাটিতে দাঁড়িয়ে আপনি যখন এই কাঠামোগুলোর দিকে তাকাবেন, তখন আপনার কাছে এগুলোকে শুধু কিছু এলেবেলে পাথরের স্তূপ ছাড়া আর কিছুই মনে হবে না। কিন্তু আপনি যখনই মাটি থেকে কয়েক শ ফুট ওপরে উঠবেন, তখনই জাদুর মতো সব স্পষ্ট হতে শুরু করবে।
গুগল তাদের ‘সার্চ স্টোরিজ’ সিরিজের একটি ভিডিওতে ডেভিড কেনেডির এই কাজ নিয়ে চমৎকার একটি ডকুমেন্টারিও প্রকাশ করেছে। সেখানে কেনেডি বলেছিলেন, ‘ওপর থেকে তাকালেই হঠাৎ করে আপনি বুঝতে পারেন, এতদিন আপনি ঠিক কোন জিনিসটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন!’
পাঁচ
এই বৃত্তগুলোর বয়স ঠিক কত? ছবি আর মাটিতে পাওয়া সামান্য কিছু নিদর্শনের রেডিওকার্বন অ্যানালাইসিস করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন, এগুলো অন্তত ২ হাজার বছরের পুরোনো। তবে প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি বড় অংশের ধারণা, এগুলো আরও অনেক, অনেক প্রাচীন। হয়তো প্রাগৈতিহাসিক যুগের, যখন মানুষ লিখতে বা পড়তে শেখেনি, তখনকার কোনো যাযাবর সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব কোনো বিশ্বাসের ওপর ভর করে মরুভূমির বুকে এই বিশাল স্বাক্ষর রেখে গেছে।
জর্ডানের এই বিগ সার্কেলগুলো দেখলে বোঝা যায়, আধুনিক সভ্যতা ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগে বসেও আমরা অতীত সম্পর্কে কত কম জানি! শত শত বছর ধরে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, মরুভূমির রুক্ষ হাওয়ায় টিকে থাকা এই বৃত্তগুলো আজও যেন বোবা দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
সূত্র:
১. লাইভ সায়েন্স
২. জাইটশ্রিফ্ট ফুর ওরিয়েন্ট আর্কিওলজি জার্নাল
৩. সার্চ স্টোরিজ, ডেভিড কেনেডির কাজ অবলম্বনে ইউটিউব ভিডিও
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।



