Qazi Akash Logo
কাজী আকাশ

কী আমাদের সত্যিকারের মানুষ করে তোলে

কাজী আকাশ•২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬•৭ মিনিট

ইলিয়া রেপিনের আঁকা লিও তলস্তয়ের প্রতিকৃতি। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

লিও তলস্তয়ের ওয়ার অ্যান্ড পিস পড়েছেন? যদি এখনো না পড়েন, তবে আপনার মাথায় একটা প্রশ্ন উঁকি দিতে পারে। সবাই এই উপন্যাসের এত প্রশংসা করে কেন? এর মধ্যে কী এমন আছে যেটা এই উপন্যাসকে সর্বকালের অন্যতম সেরা উপন্যাসের তকমা দিয়েছে?

যাঁরা পড়েছেন, তাঁদের কেউ হয়তো বলবেন এর অসাধারণ গল্প বলার ভঙ্গির কথা, কেউ বা বলবেন জীবন্ত সব চরিত্রের কথা। আবার অনেকে হয়তো ওই সময়ের সমাজ, সম্রাট, সেনাপতি, অভিজাত শ্রেণি থেকে শুরু করে সাধারণ কৃষকদের নিখুঁত চিত্রায়ণের প্রশংসা করবেন।

কিন্তু উপন্যাসটি পড়ার পর আপনার হয়তো মনে হবে, আসল জাদুটা অন্য জায়গায়। তলস্তয় এখানে মানবজীবনের যে গভীর দর্শন তুলে ধরেছেন, তা শুধুই কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক বা যুক্তিনির্ভর বিষয় নয়, তা জীবনকে বাঁচানোর এবং কাজ করার দর্শন।

উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র পিয়েরে বেজুকভ ফ্রান্সে পড়াশোনা করেছেন, বাবার অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। কিন্তু জীবনের কোনো উদ্দেশ্য তিনি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সব জায়গায় হাতড়ে বেড়িয়ে শেষে একটা অদ্ভুত জায়গা থেকে তিনি জীবনের অর্থ খুঁজে পেলেন। একজন যুদ্ধবন্দী সৈনিকের কাছ থেকে তিনি শিখলেন, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে পুরোপুরি উপভোগ করে বেঁচে থাকাটাই আসল।

আরেক প্রধান চরিত্র প্রিন্স আন্দ্রেই বলকনস্কি ছিলেন একজন প্রতিভাবান বুদ্ধিজীবী। কিন্তু চারপাশের মানুষের অহংকার, আত্মম্ভরিতা এবং জীবনের অর্থহীনতা দেখতে দেখতে তিনি একসময় গভীর হতাশায় ডুবে যান। ঠিক তখনই তাঁর জীবনে আসে নাতাশা রোস্তোভা, যার জীবনের প্রতি প্রবল ভালোবাসা আন্দ্রেইকে মুগ্ধ করে। নাতাশা যেন এক টুকরো উজ্জ্বল রোদ হয়ে আন্দ্রেইয়ের শীতল বুদ্ধিবৃত্তিক মনকে উষ্ণ করে তোলে, তাকে নতুন করে বাঁচার আশা দেখায়।

তলস্তয় তাঁর উপন্যাসে মানব অস্তিত্বের যে মূল জায়গাটিতে আলো ফেলেছেন, তা কোনো সামাজিক মর্যাদা বা বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিটি জার্মান দার্শনিক মার্টিন হাইডেগারের বিয়িং বা ডাসেইন ধারণার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। হাইডেগারের মতে, তাঁর আগের সব দার্শনিক এই ধারণাটি পুরোপুরি এড়িয়ে গেছেন।

হাইডেগারের দর্শনের সহজ ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে অধ্যাপক হুবার্ট ড্রেফাস বলেছিলেন, ‘হাইডেগার মনে করেন, আমরা সব সময়ই এই জগৎ, মহাবিশ্ব ও এর অর্থের ভেতরেই আছি। এর ভেতরে থেকেই আমাদের সবকিছু সামলাতে হবে। কোনো উত্তর খোঁজার বদলে আমাদের শুধু নিজেদের অবস্থানটা বদলাতে হবে।’

জন্মের পর থেকেই আমরা এই জগতের সঙ্গে জড়িয়ে আছি, তাই বাইরের কেউ হয়ে একে দেখার সুযোগ আমাদের নেই। বেঁচে থাকার এই প্রবল তাগিদই আমাদের অনুসন্ধিৎসু মনকে পুষ্টি জোগায়। পিয়েরে এবং আন্দ্রেই তাঁদের জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা থেকেই এই সত্যটা শিখেছিলেন।

এমন একটা সমাজ ও সংস্কৃতিতে আমরা বাস করি, যেখানে মানুষের বুদ্ধিমত্তার মুকুট হিসেবে যুক্তি ও চিন্তাশক্তিকেই সবচেয়ে বেশি কদর করা হয়। অথচ আমরা যে মূলত একেকটা জৈবিক সত্তা বা রক্তমাংসের মানুষ, সেই সাধারণ সত্যটাই আমরা ভুলে যাই। এখন তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের যুক্তিনির্ভর চিন্তাভাবনাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার, এমনকি জায়গা দখল করারও হুমকি দিচ্ছে! তাই এখন সময় এসেছে নিজেদের প্রশ্ন করার, আমরা কি সত্যিই নিজেদের চিনি? আমরা কি নিজেদের জন্য যথেষ্ট সময় দিচ্ছি?

আসুন, নিজেদের একটু অন্যভাবে বোঝার চেষ্টা করি।

দুই

উনিশ শতকে বিজ্ঞানীরা মূলত শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষণা করতেন। যেমন, কথা বলা ও বোঝার জন্য মস্তিষ্কের ব্রোকা এবং ওয়েরনিক অঞ্চল আবিষ্কার। এরপর ১৯৪০ ও ৫০-এর দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাডার, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও প্রাথমিক কম্পিউটার নিয়ে গবেষণার জোয়ার আসে। জন ফন নিউম্যানের মতো বিজ্ঞানীরা ভাবতে শুরু করেন, এই প্রযুক্তিগুলোর সঙ্গে কি মানুষের মস্তিষ্কের কোনো মিল আছে? ক্লড শ্যাননের ইনফরমেশন থিওরি বিজ্ঞানীদের এই ধারণা আরও জোরালো করে যে, মানুষের মস্তিষ্ক হয়তো একধরনের তথ্য প্রক্রিয়াকরণের মেশিন!

এরপর কম্পিউটার যতই শিল্পের দখল নিতে শুরু করল, মানব মস্তিষ্ককে কম্পিউটারের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতাও তত বাড়তে লাগল। কম্পিউটারের মতো মস্তিষ্কও ইনপুট নেয়, প্রসেস করে, আউটপুট দেয়; এমনটাই ভাবতে শুরু করলেন সবাই। শুরু হলো মনের কম্পিউটেশনাল থিওরির যুগ। মস্তিষ্ক হলো হার্ডওয়্যার, আর মন হলো সফটওয়্যার। এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠল কগনিটিভ নিউরোসায়েন্স, যেখানে স্মৃতি, যুক্তি, ভাষাসহ সবকিছুকেই গাণিতিক নিয়মে বাঁধার চেষ্টা চলল।

১৯৯০-এর দশক থেকে আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্কে যে বিপ্লব এসেছে, তাতে বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস আরও পোক্ত হয়েছে যে মস্তিষ্কও হয়তো এমন একটা বিশাল নেটওয়ার্ক, যা কম্পিউটারের মতোই কাজ করে।

কিন্তু এই উপমা বা মেটাফোরগুলো বিজ্ঞানীদের কাজে লাগলেও, মানুষের চিন্তার একটা সীমানা টেনে দিয়েছে। মস্তিষ্ক তো আর মানুষের তৈরি কোনো যন্ত্র নয়, এটি ৪ বিলিয়ন বছরের বিবর্তনের ফসল। এর কোনো হার্ডওয়্যার বা সফটওয়্যার নেই। জন্মের পর থেকেই নিউরনগুলো নিজেদের মতো করে তৈরি হয়ে সারা জীবন ধরে বিকশিত হয়।

কম্পিউটার চালানোর জন্য একজন মানুষ দরকার হয়। কিন্তু মস্তিষ্ক একদম একা, শরীরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করে। এর ভেতরে এমন কোনো ছোট মানুষ বসে নেই যে সবকিছু দেখবে এবং নির্দেশ দেবে!

আমাদের দৃষ্টিশক্তির কথাই ধরুন। আমরা ভাবি, চোখের রেটিনা ক্যামেরার মতো চারপাশের সবকিছুর ছবি তুলে মস্তিষ্কে পাঠায় এবং মস্তিষ্ক সেই অনুযায়ী কাজ করে। কিন্তু ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে রুশ মনস্তাত্ত্বিক আলফ্রেড এল. ইয়ারবাস একটি দারুণ পরীক্ষা করে দেখিয়েছিলেন, আমাদের চোখ কীভাবে দেখে। তিনি ইলিয়া রেপিনের অ্যান আনএক্সপেক্টেড ভিজিটর নামে একটি চিত্রকর্ম দেখতে দিয়ে মানুষের চোখের গতিবিধি মেপেছিলেন। তিনি দেখলেন, মানুষকে যখন ভিন্ন ভিন্ন নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, তখন তাদের চোখ ছবির ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ঘুরছে। অর্থাৎ, আমরা পুরো ছবিটা দেখি না, আমরা শুধু সেটাই দেখি, যেটা আমাদের দরকার বা যেটা আমরা দেখতে চাই।

এখান থেকেই বোঝা যায়, মানুষের মস্তিষ্ক আসলে চারপাশের পরিবেশের ওপর কতটা নির্ভরশীল। চারপাশের পরিবেশটাই আসলে আমাদের জন্য একটা রেডিমেড বিশ্ব মডেল। তাই মস্তিষ্ককে সবকিছুর খুঁটিনাটি সেভ করে রাখতে হয় না। এই কারণেই মানুষের মস্তিষ্ক এত কম রিসোর্স ব্যবহার করে এত দারুণভাবে কাজ করতে পারে। অথচ এআই মডেলগুলোকে একটা ছোট জিনিস শেখাতেও বিশাল পরিমাণ ডেটা ও রিসোর্স লাগে।

সহজ কথায়, কম্পিউটারের মেটাফোর আমাদের বোঝায়, আমরা কেবলই পরোক্ষভাবে তথ্য নিই। কিন্তু বাস্তবে মানুষ সক্রিয়ভাবে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে তার চারপাশের পরিবেশ থেকে তথ্য নেয়।

তিন

প্লেটোর আমল থেকে শিল্প, নন্দনতত্ত্ব আর সৌন্দর্য নিয়ে কত শত বিতর্ক হয়ে আসছে! শিল্প আসলে কী, তার কোনো ধরাবাঁধা সংজ্ঞা আজ পর্যন্ত কেউ দিতে পারেনি। কিন্তু মানবসমাজে শিল্পের যে দরকার আছে, তা নিয়ে কারও কোনো দ্বিমত নেই।

কবি উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ যেমন বলেছিলেন, কবিতা হলো শক্তিশালী আবেগের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ। আবার লিও তলস্তয় তাঁর হোয়াট ইজ আর্ট বইয়ে বলেছিলেন, শিল্পের আসল কাজ শিল্পীর সত্যিকারের অনুভূতি পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

কিন্তু অনুভূতি তো ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাহলে একটা শিল্পকর্ম কীভাবে সেটা আরেকজনের কাছে পৌঁছে দেয়? দার্শনিক নেলসন গুডম্যান এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখেছিলেন, শিল্পের ভাষা আসলে সাধারণ ভাষা বা কম্পিউটারের কোডের মতো নয়।

যেমন গানের কথাই ধরুন। গানের একটা সুর বাজলে আমাদের হয়তো মন খারাপ হয়ে যায় বা কান্না পায়। কিন্তু গানের নোটে তো আর ‘কান্না’ শব্দটা লেখা থাকে না! ওই সুরের প্যাটার্নগুলো আমাদের মস্তিষ্কে এমন একটা অনুভূতি তৈরি করে, যা আমাদের মন খারাপ করে দেয়।

শিল্পের ক্ষেত্রে কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম থাকে না। একটা পেইন্টিংয়ে রঙের একটুখানি হেরফের পুরো ছবির অর্থ পাল্টে দিতে পারে। গণিতে যেমন ১ + ১ = ২ হতে হবে, শিল্পে এমন কোনো নিয়ম নেই। আর এই নিয়মহীনতার কারণেই শিল্প মানুষের এত জটিল ও বিশাল জীবনের অনুভূতিগুলোকে এত সুন্দর করে প্রকাশ করতে পারে।

গুডম্যানের মতে, শিল্প হলো মানবজীবনের একটা সামগ্রিক অভিজ্ঞতা, যেখানে জ্ঞান, চিন্তা, আবেগ, স্মৃতিসহ সবকিছু মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। আধুনিক কবি ডানা জিওিয়া যেমন বলেছিলেন, কবিতা আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সজাগ করে। এই পৃথিবীটাই যে আমাদের আসল বাড়ি, আবার মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা এই পৃথিবীর কেউ না; বেঁচে থাকার এই অদ্ভুত দ্বন্দ্বটাই কবিতায় ফুটে ওঠে।

**** 

চার

গত দুই দশকে স্নায়ুবিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছেন, আবেগ শুধু আমাদের সাময়িক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সব সিদ্ধান্তের পেছনে একটা বড় ভূমিকা পালন করে। আবেগ ঠিক করে দেয় আমরা কোন জিনিসটা মনে রাখব আর কোনটা ভুলে যাব।

স্নায়ুবিজ্ঞানী আন্তোনিও দামাসিও তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, যাদের মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার অংশে  সমস্যা আছে, তাদের যুক্তি একদম ঠিক থাকলেও তারা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। তারা হয়তো ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নষ্ট করবে একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে, কিন্তু আসল কাজটা আর করা হবে না।

আবেগ আমাদের জীবনের আসল উদ্দেশ্যটা ঠিক করে দেয়। আবেগ ছাড়া যুক্তি দিকভ্রান্ত নাবিকের মতো। আমাদের জীবনের ছোট ছোট অনুভূতিগুলোই আসলে আমাদের সম্পর্ক ও পৃথিবীকে বুঝতে সাহায্য করে।

বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, আবেগ ও চিন্তাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের চিন্তা, যুক্তি ও আবেগের মধ্যে কোনো স্পষ্ট দেয়াল নেই। এই সবকিছু মিলেমিশেই কাজ করে।

পশ্চিমা দর্শনে সব সময় মন ও শরীর, আবেগ ও যুক্তিকে আলাদা করে দেখার একটা প্রবণতা ছিল। কিন্তু জীবনকে বুঝতে হলে এই কৃত্রিম দেয়ালগুলো ভাঙতে হবে। মানুষের জীবন হলো উপলব্ধি, আবেগ, চিন্তা ও কাজের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ।

তলস্তয় এআই আবিষ্কারের ১০০ বছর আগেই বুঝেছিলেন, শুধু যুক্তি দিয়ে জীবনের আসল মানে খুঁজে পাওয়া যায় না। পিয়েরে জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পেয়েছিল বর্তমানকে উপভোগ করার মাধ্যমে। আর আন্দ্রেই বাঁচার আশা ফিরে পেয়েছিল ভালোবাসার ভেতরে।

আমাদের মনে রাখা উচিত, আমরা শুধু কিছু সমীকরণ মেলানোর জন্য জন্মাইনি। আমরা এই পৃথিবীর মানুষ, যারা যুক্তির চেয়েও বেশি আবেগ দিয়ে ভাবে, শিল্প তৈরি করে এবং চারপাশের মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে জীবনের অর্থ খোঁজে। যন্ত্র যতই বুদ্ধিমান হোক না কেন, মানুষের এই আবেগ ও অনুভূতির জগতটা তার কাছে সব সময়ই অধরা থেকে যাবে।

সূত্র: মিডিয়াম

ট্যাগসমূহ:#দর্শন#বিজ্ঞান

আপনার মতামত জানান

মন্তব্যসমূহ

লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।

লোড হচ্ছে
এখনও কোনো মন্তব্য নেই।