বিশ্বকাপের গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে এবার যে উত্তাপ ছড়াচ্ছে, ফুটবল ইতিহাসে তা খুব কমই দেখা গেছে। সাধারণত এই তালিকায় দু-একজন বিশ্বমানের তারকার পাশাপাশি এমন কিছু আনকোরা নাম থাকে, যারা টুর্নামেন্টের ঠিক মোক্ষম সময়ে হঠাৎ করেই জ্বলে ওঠেন। কিন্তু এবারের চিত্রটা একদম ভিন্ন। গোল্ডেন বুটের লিডারবোর্ডটা এবার রীতিমতো এলিট ক্লাবে পরিণত হয়েছে। সেখানে জায়গা পেয়েছেন কেবল শীর্ষ সারির বিশ্বখ্যাত ফরোয়ার্ডরা।
লিওনেল মেসি এবং কিলিয়ান এমবাপ্পে দুজনেই ৬টি করে গোল নিয়ে সবার ওপরে আছেন। ঠিক তাদের ঘাড়ের কাছেই ৫ গোল নিয়ে শ্বাস ফেলছেন নরওয়ের আর্লিং হালান্ড এবং ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইন। ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও এমবাপ্পের সতীর্থ উসমান দেম্বেলেও ৪ গোল নিয়ে দৌড়ে বেশ ভালোভাবেই টিকে আছেন।

গোল করার এই দুর্দান্ত গতি মেসি ও এমবাপ্পেকে এরই মধ্যে এক অবিশ্বাস্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার করা বিশ্বকাপের ১৬ গোলের রেকর্ডটি এখন অতীত। ১৯ গোল নিয়ে মেসি এবং ১৮ গোল নিয়ে এমবাপ্পে দুজনেই ক্লোসাকে ছাড়িয়ে গেছেন। কিন্তু তাদের সামনে এখন আরও একটি বড়, এবং বলতে গেলে আরও কঠিন একটি রেকর্ড হাতছানি দিচ্ছে। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে ফরাসি স্ট্রাইকার জাস্ট ফন্টেইন একাই করেছিলেন ১৩টি গোল। এক বিশ্বকাপে কোনো খেলোয়াড়ের সবচেয়ে বেশি গোলের এই রেকর্ড আজও অক্ষত।
দীর্ঘদিন ধরে সবার ধারণা ছিল, ফন্টেইনের এই রেকর্ড হয়তো কোনো দিনই ভাঙবে না। কারণ তিনি এমন এক যুগে খেলতেন, যখন ফুটবলে গোলের ছড়াছড়ি ছিল। আধুনিক ফুটবলের মতো তখন জমাট রক্ষণভাগ, প্রতিপক্ষকে নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ কিংবা খেলোয়াড়দের শারীরিক ফিটনেসের এতটা কড়াকড়ি ছিল না। আধুনিক ফরোয়ার্ডরা মাঠে খুব একটা ফাঁকা জায়গাই পান না। এক বিশ্বকাপে দুই অঙ্কের কোটায় গোল করার সর্বশেষ কীর্তিটি জার্মানির জার্ড মুলারের। ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে তিনি ১০টি গোল করেছিলেন।
আধুনিক ফুটবলে যা অসম্ভব মনে হচ্ছিল, ৪৮ দলের বিশ্বকাপ সেই হিসাবটাই পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। টুর্নামেন্টের পরিধি বাড়ার কারণে এবার নকআউটে একটি রাউন্ড (রাউন্ড অব ৩২) বেশি খেলতে হচ্ছে। পাশাপাশি দল বাড়ার কারণে শক্তিশালী ও দুর্বল দলগুলোর মধ্যকার ব্যবধানও অনেক বেড়ে গেছে। ফলে এবারের বিশ্বকাপে ম্যাচপ্রতি গোলের গড় দাঁড়িয়েছে ২.৯৪, যা ১৯৭০ সালের পর সর্বোচ্চ। জয়ের ব্যবধানের গড়ও ২.১৮, যা ১৯৭৪ সালের পর সবচেয়ে বেশি।

ফন্টেইনের ভক্তরা হয়তো একটা যুক্তি দেখাবেন, ফন্টেইন ১৩ গোল করতে ম্যাচ খেলেছিলেন মাত্র ৬টি। অন্যদিকে মেসি বা এমবাপ্পেরা রেকর্ড ভাঙতে দুটি ম্যাচ বেশি খেলার সুযোগ পাচ্ছেন। কিন্তু আপনি যদি পরিসংখ্যানের দিকে তাকান, শুক্রবার কেপ ভার্দের বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে নামতে যাওয়া মেসি ঠিক ফন্টেইনের গাণিতিক হারেই গোল করে চলেছেন। হালান্ড, কেইন বা এমবাপ্পেও খুব একটা পিছিয়ে নেই।
অবশ্য এক টুর্নামেন্টে ম্যাচপ্রতি সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডটা কিন্তু ফন্টেইনের নয়। ১৯৫৪ বিশ্বকাপে হাঙ্গেরির ফরোয়ার্ড সান্দোর ককসিস মাত্র ৫ ম্যাচ খেলে ১১টি গোল করেছিলেন! মেসি, এমবাপ্পে ও হালান্ড যদি তাদের বর্তমান ফর্ম ধরে রাখতে পারেন, তবে তারা বিশ্বকাপের ইতিহাসের সেরা ১৫টি গোল-স্কোরিং রেটের তালিকায় ঢুকে যাবেন, যা ১৯৭০ সালের পর আর কেউ পারেনি।
ফন্টেইনের এই ১৩ গোলের হিসাব নিয়ে অবশ্য একটি ছোট বিতর্ক আছে। টুর্নামেন্টে তার শেষ ৪টি গোল এসেছিল পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে। অনেকেই মনে করেন, সেমিফাইনালে হেরে যাওয়া দুটি দলের মধ্যে ব্রোঞ্জ পদকের জন্য এই ম্যাচটির আসলে কোনো গুরুত্ব নেই। তাই এই ম্যাচের রেকর্ডগুলো মূল হিসাব থেকে বাদ দেওয়া উচিত। ২০০২ বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেই মাত্র ১১ সেকেন্ডে গোল করে রেকর্ড গড়েছিলেন তুরস্কের হাকান সুকুর। সেটি নিয়েও একই বিতর্ক আছে।
তবে ফিফা যে এই রেকর্ডগুলো বাতিল করবে, এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই যারা ইতিহাস গড়তে চান, তাদের ফোকাস রাখতে হবে যত বেশি সম্ভব ম্যাচ খেলা এবং গোল করার দিকে।

এবার দেখা যাক, পরিসংখ্যান কী বলছে? এবারের বিশ্বকাপে বিশ্বমানের ফরোয়ার্ডদের ছড়াছড়ি এতটাই বেশি যে, রেকর্ড ভাঙার সম্ভাবনা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে প্রবল। চার রাউন্ড শেষে চারজন খেলোয়াড়ের ৫ বা তার বেশি গোল করার ঘটনা ১৯৩৮ সালের পর আর কখনো ঘটেনি।
ম্যাচ প্রতি দুটি করে গোল নিয়ে মেসি ফন্টেইনের রেকর্ড ভাঙার দৌড়ে এই মুহূর্তে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন। কোনো দল সেমিফাইনালে উঠলে তারা নিশ্চিতভাবে আরও একটি ম্যাচ (ফাইনাল বা তৃতীয় স্থান নির্ধারণী) খেলার সুযোগ পায়। সেই হিসাবে মেসি হয়তো আরও ৪টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবেন।
তিনি যদি গোলের এই বর্তমান ধারা ধরে রাখতে পারেন, তবে টুর্নামেন্ট শেষে তার গোলসংখ্যা দাঁড়াতে পারে ১৩ থেকে ১৪টি। অন্যদিকে এমবাপ্পের গোলসংখ্যা হতে পারে ১১টি। বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তাঁরা যেভাবে খেলেছেন, সেই হিসাবে এই পরিসংখ্যান করা হয়েছে। অন্য ফরোয়ার্ডদের দল টুর্নামেন্টের শেষ পর্যায়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম থাকায়, তাদের প্রজেকশনও কিছুটা নিচে রাখা হয়েছে।
তবে দিন শেষে এসব পূর্বাভাস ও সম্ভাবনা কেবলই কিছু গাণিতিক হিসাব। বিশ্বকাপ সব সময়ই যুক্তি ও হিসাব-নিকাশকে বুড়ো আঙুল দেখাতে ভালোবাসে। ২০২২ সালের ফাইনালে এমবাপ্পের সেই অবিশ্বাস্য হ্যাটট্রিকের কথা নিশ্চয়ই আপনি ভুলে যাননি! এই সুপারস্টারদের কেউ কি ফন্টেইনের রেকর্ড ভাঙতে পারবেন? হয়তো, আবার হয়তো না। তবে লড়াইটা যে জমে উঠেছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।



