Qazi Akash Logo
কাজী আকাশ

কে জিতবে ব্যালন ডি'অর; মেসি, রদ্রি, ইয়ামাল নাকি কেইন

কাজী আকাশ•৩ আগস্ট, ২০২৬•৬ মিনিট

মাঠে গোল করা যদি শিল্প হয়, তবে সেই শিল্পের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি ব্যালন ডি'অর। একটা সময় ছিল যখন এই বলটা শুধু ঘুরে ফিরে মেসি ও রোনালদো কাছেই যেত, যেন এগুলো তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি! কিন্তু দিন বদলেছে। দুই লিজেন্ডের বয়স বেড়েছে। এগিয়ে এসেছে তরুণ তুর্কিরা।

একটা অদ্ভুত বিষয় খেয়াল করেছেন? যে হ্যারি কেইন সারা জীবন শিরোপার জন্য হা-হুতাশ করতেন, তিনি এখন ট্রফির বন্যায় ভাসছেন! অন্যদিকে মাত্র ১৯ বছরের এক তরুণ লামিন ইয়ামাল বিশ্বকাপ আর ইউরো জিতে ফুটবলকেই যেন কমপ্লিট করে ফেলেছেন! আর রদ্রি কিংবা এমবাপ্পে? তাঁদের গল্পটাও তো কোনো থ্রিলারের চেয়ে কম নয়।

খেলার দুনিয়ায় এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কে জিতবেন এ বছরের ব্যালন ডি’অর?

হ্যারি কেইন

ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে ৬৪ ম্যাচে ৭৩টি গোল! ফুটবল ইতিহাসে এক মৌসুমে এর চেয়ে বেশি গোল করার রেকর্ড আছে শুধু একজনেরই—লিওনেল মেসির। ২০১১-১২ মৌসুমে ৮২ গোলের রেকর্ড করেছিলেন তিনি। যে হ্যারি কেইন একসময় চ্যাম্পিয়নশিপে জেমি ভার্ডির সঙ্গে বেঞ্চ গরম করতেন, তাঁর জন্য এই পরিসংখ্যান মোটেও মন্দ নয়, কী বলেন? এই তালিকায় থাকা বাকিদের মতো কেইন কোনো উঠতি বিস্ময় নয়। কিন্তু ৩৩ বছর বয়সে এসে ঠিকই তিনি ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে সগৌরবে রাজত্ব করছেন।

ভাবতে অবাক লাগে, যে মানুষটা গত ১২ মৌসুমের প্রতিটিতে অন্তত ২৪টি করে গোল করেছেন, প্রিমিয়ার লিগে টানা গোল্ডেন বুট, একটি বিশ্বকাপ গোল্ডেন বুট এবং দুটি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু জিতেছেন—তিনি কখনো ব্যালন ডি'অর ভোটিংয়ে ১০ নম্বরের ওপরে উঠতে পারেননি! সংখ্যা বা গোল সবসময়ই ছিল, কিন্তু এবার যোগ হয়েছে শিরোপা। গত বছর বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে বুন্দেসলিগা জেতার পর কেইনের সেই বিখ্যাত ট্রফিখরা কেটেছে। এরপর যেন শিরোপার বন্যা বয়ে যাচ্ছে। এই মৌসুমে আরও একটি বুন্দেসলিগা, ডিএফবি-পোকাল এবং জার্মান সুপারকাপ জিতেছেন তিনি। ইংল্যান্ড হয়তো বিশ্বকাপে তাদের আক্ষেপ ঘুচাতে পারেনি, কিন্তু দলের অধিনায়ক হিসেবে ৬ গোল করে গ্যারি লিনেকারকে টপকে বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতা ঠিকই হয়ে গেছেন কেইন। এই অবিশ্বাস্য ফর্মটাই তাঁকে ব্যালন ডি'অরের দৌড়ে শক্তভাবে টিকিয়ে রেখেছে।

লামিন ইয়ামাল

‘সবচেয়ে বড় ব্যাপার শান্ত থাকা। আমি যখন বল নিয়ে ডি-বক্সে থাকি, তখন কী ঘটবে, সেই সিদ্ধান্তটা আমিই নিই!’

গত ফেব্রুয়ারিতে ভিয়ারিয়ালের বিপক্ষে বার্সেলোনার ৪-১ গোলের জয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক করার পর কথাগুলো বলেছিলেন লামিন ইয়ামাল। অন্য যেকোনো ১৯ বছর বয়সী তরুণের মুখে এমন কথা শুনলে আপনার কাছে চরম অহংকার মনে হতো। কিন্তু ইয়ামাল তো আর দশটা সাধারণ তরুণের মতো নন!

এই গ্রীষ্মে তিনি তার প্রমাণও দিয়েছেন। স্পেনের এই ফরোয়ার্ড ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ২০ বছর বয়স হওয়ার আগেই ইউরো এবং বিশ্বকাপের ফাইনালে শুধু খেলেননি, দুটোই জিতে নিয়েছেন! বিশ্বকাপে গোল করেছেন মাত্র একটি, যা তাঁর নিজের বিশাল মাপকাঠিতে একটু কমই মনে হতে পারে। কিন্তু পুরো টুর্নামেন্টে তাঁর প্রভাব ছিল অবিশ্বাস্য। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে পেনাল্টি আদায় করে নেওয়া, পুরো টুর্নামেন্টে মেসির চেয়েও বেশিবার প্রতিপক্ষকে সফলভাবে ড্রিবল করে বোকা বানানো—সবই করেছেন তিনি। ফাইনালে শারীরিক শক্তির খেলায় তাঁকে বোকা বানাতে চাওয়া আর্জেন্টিনাকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার পেছনেও তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। আর এসবই তিনি করেছেন হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট নিয়ে!

ফাইনাল শেষে জো হার্ট বোধহয় সবচেয়ে দারুণ কথাটা বলেছিলেন, ‘লামিন ইয়ামালের বয়স মাত্র ১৯। কী সুন্দর একটা দিন তাঁর জন্য! ১৯ বছর বয়সেই সে ফুটবল গেমটাকে পুরোপুরি কমপ্লিট করে ফেলল!’

বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা ও সুপারকোপা জয়ে ৪৫ ম্যাচে ২৪ গোল আর ১৮ অ্যাসিস্ট যোগ করলে, গতবারের রানার্সআপ ইয়ামালের এবার ব্যালন ডি'অর জেতার দাবিটা যে সবচেয়ে জোরালো, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

রদ্রি

গত অক্টোবরে এসিএল ইনজুরি কাটিয়ে ম্যানচেস্টার সিটির অধিনায়ক যখন মাঠে ফিরলেন, তখন পেপ গার্দিওলা বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপে আমরা আসল রদ্রিকে দেখতে পাব।’ ২০২৩ সালের ব্যালন ডি'অর জয়ী এই মিডফিল্ডার কি সত্যিই নিজের সেরা ছন্দে ফিরতে পারবেন? সন্দেহ ছিল অনেকের মনেই। কিন্তু ফুটবলের অন্যান্য অনেক বিষয়ের মতোই, গার্দিওলার ভবিষ্যদ্বাণী এবারও অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে।

পুরো স্পেন দলের রক্ষাকবচ ছিলেন রদ্রি। মাঠের প্রতিটি বাঁক তিনি নিয়ন্ত্রণ করেছেন, বলের দখল রেখেছেন এবং স্পেনের রক্ষণভাগের দিকে ধেয়ে আসা প্রায় প্রতিটি বিপদ একাই ধ্বংস করেছেন। ফলে টুর্নামেন্টের ৮ ম্যাচে স্পেন গোল খেয়েছে মাত্র একটি! টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি ৭৫৬টি পাস সম্পন্ন করেছেন রদ্রি। শুধু তা-ই নয়, বল স্পর্শ করা, পাস বা প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে পাস দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন সবার ওপরে। শুধু ফাইনালেই তিনি ১০১টি নিখুঁত পাস দিয়েছেন এবং আর্জেন্টিনাকে এমনভাবে শ্বাসরুদ্ধ করে রেখেছিলেন যে তারা একটি শটও অন-টার্গেটে রাখতে পারেনি!

স্পেনের অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপের ট্রফি তোলার পাশাপাশি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বলও জিতেছেন রদ্রি। একই সঙ্গে নাম লিখিয়েছেন ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে এক্সক্লুসিভ ক্লাবে। গার্ড মুলার, ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউয়ার এবং জিনেদিন জিদানের পর মাত্র চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপ, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, ইউরোপিয়ান কাপ এবং ব্যালন ডি'অর জেতার অবিশ্বাস্য কীর্তি এখন তাঁর পকেটে।

কিলিয়ান এমবাপ্পে

বিশ্বকাপে নিজের পুরোনো পিএসজি সতীর্থ লিওনেল মেসির সঙ্গে রীতিমতো টক্কর দিয়েছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। শিরোপা, গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন বল আর বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসন—এই চারটির জন্য লড়াই হয়েছে দুজনের। এর মধ্যে এমবাপ্পে জিতেছেন দুটি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে দুই গোল করে ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা দুবার গোল্ডেন বুট জেতার কীর্তি গড়েন তিনি। বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা এখন ২২, যা মেসির চেয়ে একটি বেশি! ১৯৭০ সালে গার্ড মুলারের পর এই প্রথম কোনো খেলোয়াড় এক আসরে ১০ বা তার বেশি গোল করলেন।

তবুও এমবাপ্পে খুশি নন। ফ্রান্স অধিনায়কের আক্ষেপ, ‘আমি সর্বোচ্চ গোলদাতা না হয়ে ফাইনালে খেলাটাকেই বেশি পছন্দ করতাম।’ ঘরোয়া ফুটবলেও তাঁর মৌসুমটা ছিল গোলের বন্যায় ভরপুর, কিন্তু হতাশার। লা লিগা এবং চ্যাম্পিয়নস লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে মৌসুম শেষ করলেও, ৪৪ ম্যাচে ৪২ গোল করার পরও তাঁর ঝুলিতে কোনো শিরোপা ওঠেনি। হ্যারি কেইনের মতো এমবাপ্পেও হয়তো এবার টের পাবেন, ব্যালন ডি'অর জেতার জন্য শুধু গোল করাই যথেষ্ট নয়!

লিওনেল মেসি

৮০ হাজার দর্শকের বিশাল এক স্টেডিয়ামে জুতো জোড়া খুলে একা মাটিতে বসে আছেন লিওনেল মেসি। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন দূরে, তাঁর পাশ দিয়েই বুনো উল্লাসে মেতে ছুটে যাচ্ছেন স্পেনের বদলি খেলোয়াড়েরা। বিশ্বমঞ্চ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় আর্জেন্টিনা অধিনায়কের চোখে নিশ্চয়ই এমন কোনো দৃশ্য আঁকা ছিল না! গত ছয় সপ্তাহ ধরে তিনি যে পারফরম্যান্স দেখিয়েছিলেন, তাতে তাঁর দল না পারলেও, অন্তত তাঁর নিজের আরেকটু ভালো বিদায় প্রাপ্য ছিল।

অনেকেই ভেবেছিলেন, ৪০তম জন্মদিনের আগে মেসির এই বিশ্বকাপটা হয়তো শুধু একটা নস্টালজিয়া জাগানো স্মৃতি হয়ে থাকবে। কিন্তু তিনি টুর্নামেন্ট শুরু করলেন প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করে! এরপর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল, জর্ডানের বিপক্ষে আরেকটি। গ্রুপ পর্বে রীতিমতো রাজত্ব করার পর নকআউটে একা হাতে আর্জেন্টিনাকে টেনে তুলেছেন তিনি। কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোল, মিশরের বিপক্ষে এক গোল ও এক অ্যাসিস্ট, সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাসিস্ট এবং সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে ডোবাতে তাঁর জোড়া অ্যাসিস্ট! তৃতীয় স্থান নির্ধারণী সেই অদ্ভুত ম্যাচে এমবাপ্পে জোড়া গোল না করলে গোল্ডেন বুটটাও হয়তো তাঁর হাতেই উঠত।

বিশ্বকাপের ফাইনাল হেরেও কি ব্যালন ডি'অর জেতা যায়? গত ১৯ বছরে মাত্র চারবার এমন খেলোয়াড়ের হাতে এই পুরস্কার উঠেছে। তাঁদের মধ্যে কেউই তখন চ্যাম্পিয়নস লিগ, বিশ্বকাপ, ইউরো বা কোপা আমেরিকার কোনোটিই জেতেননি। মজার ব্যাপার হলো, ওই চারবারের তিনবারই পুরস্কারটি জিতেছেন স্বয়ং মেসি! ৩৯ বছর বয়সে এমএলএসে খেলে এবং একটি ফাইনাল হেরে গিয়ে নবম ব্যালন ডি'অর জেতাটা হয়তো তাঁর জন্য কঠিন। কিন্তু এই বয়সেও যে তিনি সেরাদের দৌড়ে সবার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জোর আলোচনা টিকিয়ে রেখেছেন, এটিই তাঁর গ্রেটনেসের সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

আপনার মতামত জানান

মন্তব্যসমূহ

লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।

লোড হচ্ছে
এখনও কোনো মন্তব্য নেই।