Qazi Akash Logo
কাজী আকাশ

ইংল্যান্ডে জন্মানো হালান্ড খেলবেন জন্মভূমির বিপক্ষে

কাজী আকাশ•১১ জুলাই, ২০২৬•৫ মিনিট

নরওয়ে যখন শেষবার ফুটবল বিশ্বকাপে খেলেছিল, আর্লিং হালান্ডের তখন জন্মই হয়নি! ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে নরওয়ে, আর তাতেই বাজিমাত। দলকে একেবারে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে তুলে এনেছেন হালান্ড। এটি তার জন্য শুধু ব্যক্তিগত মাইলফলকই নয়, বরং বহু বছর ধরে কাঁধে বয়ে বেড়ানো এক বিশাল দায়িত্ব পূরণের মিশন। কিন্তু ১২ জুলাই মিয়ামির কোয়ার্টার ফাইনালে তার সামনে এখন এমন এক প্রতিপক্ষ, যাদের সঙ্গে তাঁর রয়েছে নাড়ির টান। প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড, যে দেশে তার জন্ম!

আর্লিং হালান্ডের জন্ম ইংল্যান্ডে হলেও তিনি নরওয়ের হয়ে খেলেন

২০০০ সালে ইংল্যান্ডের লিডসে জন্ম হালান্ডের। বাবা আলফ-ইঙ্গে হালান্ড তখন লিডস ইউনাইটেড ছেড়ে সবেমাত্র ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দিয়েছেন। হালান্ডের তিন বছর বয়সে বাবার ইনজুরির কারণে পুরো পরিবার ফিরে যায় নরওয়ের ছোট্ট শহর ব্রায়নে। সেখানেই ফুটবলের হাতেখড়ি। জন্মসূত্রে তিনি চাইলেই ইংল্যান্ডের জার্সি গায়ে খেলতে পারতেন। কিন্তু নিজের শেকড়ের প্রতি অগাধ টান তাকে নরওয়ের জার্সিই বেছে নিতে বাধ্য করেছে।

২০২০ সালে ইংল্যান্ডের তৎকালীন কোচ গ্যারেথ সাউথগেটকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, হালান্ড কি কখনো ইংল্যান্ডের হয়ে খেলতে পারতেন? সাউথগেটের সোজাসাপটা উত্তর ছিল, ‘তার মতো খেলোয়াড়রা খুব ভালো করেই জানে তারা কোথায় খেলতে চায়। সে নরওয়ের প্রতিই নিজের আনুগত্য অনুভব করে।’

ইংল্যান্ডের বদলে নরওয়েকে বেছে নেওয়ার একটা বড় ঝুঁকি ছিল। এমন তো হতে পারত যে, জর্জ বেস্ট, রায়ান গিগস কিংবা জর্জ উইয়াহর মতো কিংবদন্তিদের দলে নাম লেখাতে হতো তাকে, যারা ক্লাব ফুটবলে সব জিতলেও কখনো বিশ্বকাপ খেলতে পারেননি। কিন্তু হালান্ড সেই দুর্ভাগ্য এড়িয়েছেন। শেষ ষোলোর লড়াইয়ে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে জোড়া গোল দিয়ে বিদায় করে তিনি প্রমাণ করেছেন, নরওয়েকে বেছে নেওয়াটা কোনো ভুল সিদ্ধান্ত ছিল না।

অনেকেই হয়তো ভাবেন নরওয়ে মানেই শুধুই হালান্ড। কিন্তু ২৫ বছর বয়সী এই তারকার বাইরেও নরওয়ের এবারের দলটি দারুণ শক্তিশালী। অনেকেই একে নরওয়ের সোনালি প্রজন্ম বলছেন, ঠিক যেমনটা কয়েক বছর আগে বেলজিয়ামের ক্ষেত্রে বলা হতো।

আর্সেনালের হয়ে সদ্যই প্রিমিয়ার লিগ জেতা অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড মাঝমাঠে আলো ছড়াচ্ছেন, এরই মধ্যে ৩টি অ্যাসিস্টও করে ফেলেছেন। দলে আছেন আলেকজান্ডার সরলথ, জর্জেন স্ট্র্যান্ড লারসেন, অস্কার ববের মতো পরীক্ষিত খেলোয়াড়রা। পাশপাশি প্যাট্রিক বার্গ, স্যান্ডার বার্গে এবং আন্তোনিও নুসার মতো খেলোয়াড়রাও অপ্রত্যাশিতভাবে দলের জয়ে বড় ভূমিকা রাখছেন।

তবে সব ছাপিয়ে আলোটা হালান্ডের ওপরই বেশি। ব্রায়নের যুব দল থেকে উঠে এসে মোল্ডেতে ওলে গানার সুলশারের অধীনে নিজেকে শানিত করেছেন। এরপর রেডবুল সালজবুর্গ হয়ে বরুশিয়া ডর্টমুন্ডে এবং ২০২২ সালে বাবার পুরোনো ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দিয়ে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়।
বাবার মতো সিটির হয়ে খেলেন হালান্ড

বাছাইপর্বের ৮ ম্যাচে ১৬ গোল এবং মূল পর্বের ৪ ম্যাচে ৭ গোল—এমন অতিমানবিক ফর্ম নিয়ে তিনি এখন ছুটছেন গোল্ডেন বুটের দিকে। ৮ গোল নিয়ে মেসি ও এমবাপ্পে আছেন শীর্ষে, ৭ গোল নিয়ে হালান্ড ঠিক তাদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছেন। ৬ গোল নিয়ে দৌড়ে আছেন ইংল্যান্ডের হ্যারি কেইনও।

সাড়ে ৬ ফুট উচ্চতা ও সোনালি বড় চুলের হালান্ডকে দেখলে সত্যিই প্রাচীন ভাইকিং যোদ্ধাদের কথা মনে পড়ে যায়। ব্রাজিলের বিপক্ষে জয়ের পর সতীর্থদের নিয়ে তিনি যে ভাইকিং রো উদযাপন করেছিলেন, তাতেই তার দেশপ্রেম স্পষ্ট। জাতীয় দলের জার্সিতে নিজের নামের পেছনে তিনি ব্যবহার করেন ব্রাউট হালান্ড। ব্রাউট মূলত তার মায়ের বংশের নাম, আর বাবার নামের সঙ্গে মায়ের নাম মিলিয়ে রাখার এই ঐতিহ্য তিনি সগর্বে বহন করছেন।

বিশ্বের অন্যতম বড় সুপারস্টার হলেও হালান্ড কিন্তু একদম মাটির মানুষ। মাত্র ৫৫ লাখ মানুষের দেশ নরওয়ের এই মহাতারকা নিয়মিত তার শহর রোগাল্যান্ডে যান। ওসলোতে তার নিজস্ব ফ্ল্যাট আছে, এমনকি অবসরের পর দেশে একটি খামার চালানোর ইচ্ছার কথা তিনি বহুবার বলেছেন।

তবে স্বভাবের দিক থেকে তিনি পুরোপুরি সাধারণ নরওয়েজিয়ানদের মতো নন। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মানুষ সাধারণত খুব বিনয়ী হয়, নিজেদের নিয়ে বড়াই করতে পছন্দ করে না। কিন্তু হালান্ড ভীষণ আত্মবিশ্বাসী, কিছুটা উদ্ধত এবং নিজের সামর্থ্য সম্পর্কে খুব ভালো করেই জানেন। এই ব্যতিক্রমী স্বভাবটিই তাকে সে দেশের মানুষের কাছে আরও আকর্ষণীয় নায়কে পরিণত করেছে।

ফুটবলের বাইরেও হালান্ড এখন এক বিশাল সেলিব্রেটি। ইউটিউবে তার চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ২৪ লাখের বেশি। শেষ ৩২-এ আইভরি কোস্টের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে জয়সূচক গোল করার কয়েক ঘণ্টা পরই ডালাসের রাস্তায় কাউবয় টুপি ও বুট কেনার একটি ভিডিও তিনি আপলোড করেছিলেন। মাত্র চার দিনেই সেটির ভিউ ছাড়িয়েছে ৫০ লাখ! শুধু তা-ই নয়, ভাইকুইন্স নামে একটি অ্যানিমেটেড সিনেমায় হালান্ড নামে এক ভাইকিংয়ের চরিত্রেই কণ্ঠ দিচ্ছেন তিনি।

বাবা আলফ-ইঙ্গে হালান্ড ১৯৯৪ সালে বিশ্বকাপ খেলেছিলেন। বাবার সেই রেকর্ড ছুঁয়ে এবার নরওয়েকে অবিশ্বাস্য এক সাফল্যের পথে নিয়ে যাচ্ছেন ছেলে। ১২ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত ৩টায় মিয়ামির মাঠে যখন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নামবেন, তখন কি তিনি ১৯৬৬ সালের পর ইংল্যান্ডের আরেকটি বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে দিতে পারবেন? ৫৫ লাখ নরওয়েজিয়ানের আশা এখন এই ভাইকিং যোদ্ধার কাঁধেই!

সূত্র: বিবিসি

আপনার মতামত জানান

মন্তব্যসমূহ

লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।

লোড হচ্ছে
এখনও কোনো মন্তব্য নেই।