এআই যুগে কোন চাকরি ঝুঁকিতে, কোনগুলো নিরাপদ; জানালো অ্যানথ্রোপিকের গবেষণা
প্রযুক্তির দুনিয়ায় এখন সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম হয়তো এআই। মানুষের কাজ কেড়ে নেওয়ার এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় মেতেছে এই প্রযুক্তি। সম্প্রতি বিখ্যাত এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক একটি তালিকা প্রকাশ করেছে, যেখানে পরিষ্কার করে দেখানো হয়েছে এআইয়ের কারণে কোন পেশাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে আছে, কোনগুলো আপাতত নিরাপদ। চলুন, তাদের সেই তালিকা ধরে একটু তলিয়ে দেখা যাক।
যেসব পেশা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে
১. ব্যবস্থাপনা
ব্যবস্থাপনা খাতের মূল কাজ হলো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং কর্মীদের কাজের হিসাব রাখা। কিন্তু এআই এখন মানুষের চেয়ে অনেক দ্রুত বিপুল পরিমাণ ডেটা বিশ্লেষণ করতে পারে। কর্মীদের কাজের রুটিন তৈরি থেকে শুরু করে ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক পূর্বাভাস, সব কাজ অ্যালগরিদমই নিমিষে করে দিচ্ছে। ফলে মাঝারিসারির ব্যবস্থাপকদের কাজের পরিধি ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে।
২. ব্যবসা ও অর্থায়ন
শেয়ারবাজারের হিসাব-নিকাশ, আর্থিক অডিট কিংবা বাজারের গতিপ্রকৃতি বোঝার জন্য আগে বিশেষজ্ঞদের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন এআই মডেলগুলো সেকেন্ডের ভগ্নাংশে বাজারের ট্রেন্ড বুঝে ফেলতে পারে। সাধারণ বুককিপিং বা ডেটাভিত্তিক আর্থিক পরামর্শ দেওয়ার মতো কাজগুলো তাই খুব সহজেই স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাচ্ছে।
৩. কম্পিউটার ও গণিত
মজার ব্যাপার হলো, যারা এআই তৈরি করেছে, তারাও এখন চরম ঝুঁকিতে! এআই এখন মানুষের দেওয়া সাধারণ নির্দেশ শুনে নিজেই নিখুঁত কোড লিখতে পারে, সফটওয়্যারের বাগ ধরতে পারে এবং জটিল গাণিতিক মডেলের সমাধান করতে পারে। ফলে সাধারণ প্রোগ্রামার বা প্রাথমিক স্তরের ডেটা অ্যানালিস্টদের কাজ খুব দ্রুত এআইয়ের হাতে চলে যাচ্ছে।
৪. স্থাপত্য ও প্রকৌশল
ভবনের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি বা কাঠামোগত চাপ হিসাব করা একসময় পুরোপুরি মানুষের কাজ ছিল। কিন্তু জেনারেটিভ এআই এখন নিজে থেকেই সবচেয়ে টেকসই এবং দৃষ্টিনন্দন আর্কিটেকচারাল মডেল তৈরি করতে পারে। মুহূর্তের মধ্যে ইঞ্জিনিয়ারিং সিমুলেশন করে ফেলতে পারায় জুনিয়র নকশাকারদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে আসছে।
৫. জীব ও সমাজবিজ্ঞান
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ডেটা সংগ্রহ, পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ কিংবা পুরোনো গবেষণাপত্র পড়ার কাজগুলো অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। এআই এখন হাজার হাজার পৃষ্ঠার গবেষণাপত্র পড়ে সেকেন্ডের মধ্যে তার সারমর্ম বের করে দিতে পারে। মাঠপর্যায়ের কাজ বেঁচে থাকলেও, ল্যাব বা ডেস্কে বসে করা গবেষণার বড় অংশই স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাচ্ছে।
৬. আইন পেশা
চুক্তিপত্র যাচাই করা, পুরোনো মামলার রায় ঘাঁটা কিংবা আইনি নোটিশের প্রাথমিক খসড়া তৈরি করতে একজন আইনজীবীর ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগে। অথচ এআই টুলগুলো নিমেষে নিখুঁতভাবে এই কাজগুলো করে দিচ্ছে। ফলে ল-ফার্মগুলোতে জুনিয়র আইনজীবী বা আইনি সহকারীদের কাজের বড় একটি অংশ সফটওয়্যারের দখলে চলে যাচ্ছে।
৭. শিক্ষা ও গ্রন্থাগার
শিক্ষার্থীদের মেধা ও শেখার গতির ওপর ভিত্তি করে এআই এখন পার্সোনালাইজড টিউটর হিসেবে কাজ করতে পারে। অন্যদিকে, লাইব্রেরির তথ্য খোঁজা বা বই গুছিয়ে রাখার কাজ অনেক আগেই ডিজিটাল হয়ে গেছে। উন্নত সার্চ অ্যালগরিদম ও চ্যাটবটগুলো এখন লাইব্রেরিয়ানের চেয়েও দ্রুত যেকোনো তথ্য খুঁজে দিতে সক্ষম।
৮. শিল্প ও গণমাধ্যম
এআইয়ের তুলিতে এখন অসাধারণ সব ছবি আঁকা হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে নতুন সুর। সাধারণ খবর লেখা, বিজ্ঞাপনের কপি তৈরি কিংবা গ্রাফিক ডিজাইনের কাজগুলো এআইয়ের মাধ্যমে চোখের পলকে করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে সৃজনশীল কাজের প্রাথমিক স্তরগুলোতে অ্যালগরিদমের সঙ্গে মানুষের এক অসম প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে।
৯. দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক
অফিসের ডেটা এন্ট্রি করা, ইমেইল পড়ে উত্তর দেওয়া কিংবা কাস্টমার সাপোর্টে চ্যাট করার মতো কাজগুলো এআইয়ের সবচেয়ে সহজ শিকার। আধুনিক ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্ট ও চ্যাটবটগুলো এতটাই উন্নত হয়েছে যে, প্রথাগত রিসেপশনিস্ট বা ডেটা এন্ট্রি অপারেটরদের কাজ প্রায় বিলুপ্তির পথে চলে এসেছে।
১০. বিক্রয় ও বিপণন
একজন ক্রেতা কী কিনতে চান, তা হয়তো তিনি নিজেও ভালোভাবে জানেন না, কিন্তু এআইয়ের প্রেডিকটিভ অ্যানালাইসিস তা আগেভাগেই বুঝে যায়। টার্গেটেড অ্যাড থেকে শুরু করে স্বয়ংক্রিয় ইমেইল ক্যাম্পেইন, সবই এখন এআইয়ের নিয়ন্ত্রণে। ফলে মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বা ফোনে কল করে জিনিস বিক্রির দিন ফুরিয়ে আসছে।
১১. সমাজসেবা
যদিও সমাজসেবায় মানুষের আবেগ জরুরি, কিন্তু প্রাথমিক মানসিক অবস্থার মূল্যায়ন করা বা মানুষকে সঠিক পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানোর মতো প্রশাসনিক কাজগুলো এআই দিয়ে করানো সম্ভব হচ্ছে। মানুষের বিকল্প না হলেও, এই খাতের ডেটাবেস মেইনটেইন করার কাজগুলো খুব দ্রুত সফটওয়্যার নির্ভর হয়ে পড়ছে।
যেসব পেশা আপাতত নিরাপদ
১. স্থাপন ও মেরামত
বাসার পানির লাইন ফেটে গেলে বা এসির গ্যাস লিক করলে কোনো সফটওয়্যার এসে তা ঠিক করে দিয়ে যাবে না। এই কাজগুলোর জন্য সরাসরি কায়িক শ্রম, তাৎক্ষণিক বুদ্ধি এবং পরিবর্তিত পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা দরকার, যা রোবট বা এআইয়ের পক্ষে এখনো সম্ভব নয়।****
২. নির্মাণকাজ
ইট গাঁথা, রড বাঁধা কিংবা ছাদ ঢালাই করার মতো কাজগুলো অত্যন্ত জটিল। নির্মাণকাজের পরিবেশ প্রতি মুহূর্তে বদলায়, যেখানে মানুষের শারীরিক উপস্থিতির কোনো বিকল্প নেই। রোবট দিয়ে এই কাজগুলো করানো বর্তমানে অসম্ভব রকমের ব্যয়বহুল এবং অবাস্তব।
৩. কৃষি
কৃষিতে প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগলেও বীজ বোনা, গাছের যত্ন নেওয়া, কিংবা ফসল কাটার মতো কাজে মানুষের নিপুণ হাতের স্পর্শ লাগে। কখন কোন গাছে রোগ হলো, তা দেখে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার মতো শারীরিক ও বুদ্ধিভিত্তিক কাজগুলো পুরোপুরি এআইয়ের হাতে ছেড়ে দেওয়া এখনো অনেক দূরের স্বপ্ন।****
৪. পরিবহন
সেলফ-ড্রাইভিং গাড়ি হয়তো রাস্তায় নেমেছে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো জটিল রাস্তার পরিস্থিতি সামলানো কিংবা হঠাৎ যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে তা সমাধান করার জন্য মানবচালকের কোনো বিকল্প নেই। আকাশে বিমান চালানো থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন, সবখানেই মানুষের উপস্থিত বুদ্ধির ওপর আমাদের নির্ভর করতে হয়।****
৫. উৎপাদন
বড় বড় কারখানায় হয়তো স্বয়ংক্রিয় মেশিন কাজ করছে, কিন্তু সেই মেশিনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করা, উৎপাদনের মান যাচাই করা এবং কাস্টমাইজড পণ্য তৈরি করার জন্য মানুষের হাত লাগে। প্রতিটি পণ্যের নিখুঁত ফিনিশিং নিশ্চিত করতে কারখানার ফ্লোরে মানুষের কায়িক শ্রম অপরিহার্য।
৬. নিরাপত্তা ও সুরক্ষা
পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস বা নিরাপত্তারক্ষীদের কাজ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং অনিশ্চিত। হঠাৎ কোনো বিপদে মানুষের আবেগ বুঝে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কোনো অ্যালগরিদমের নেই। মানুষের জীবন বাঁচানোর মতো সংবেদনশীল জায়গায় যন্ত্রের ওপর ভরসা করার সময় এখনো আসেনি।
৭. খাদ্য ও পরিবেশন
রান্না করা শুধু উপাদান মেশানোর বিষয় নয়, এটি একটি শিল্প। স্বাদ পরীক্ষা করে মসলা কমানো বা বাড়ানো একজন শেফই পারেন। তেমনি হাসিমুখে রেস্তোরাঁয় খাবার পরিবেশন করার মধ্যে যে আন্তরিকতা থাকে, কোনো রোবট ওয়েটার তা কখনোই দিতে পারবে না।
৮. মাঠ ও বাগান পরিচর্যা
কোন গাছের ডাল কতটুকু কাটলে দেখতে সুন্দর লাগবে, কিংবা এবড়োখেবড়ো মাঠে কীভাবে লন-মোয়ার চালাতে হবে, তার জন্য শৈল্পিক চোখ ও শারীরিক শক্তি দুটোই লাগে। বাইরের খোলা পরিবেশে আবহাওয়া ও মাটির ধরন বুঝে কাজ করা এআইয়ের ক্ষমতার একেবারেই বাইরে।
৯. ব্যক্তিগত পরিচর্যা
চুল কাটা, ম্যাসেজ থেরাপি দেওয়া কিংবা জিম ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করার জন্য মানুষের সরাসরি হাতের স্পর্শ ও আবেগের আদান-প্রদান দরকার। আপনার মনের অবস্থা বুঝে একটি সুন্দর হেয়ারকাট দেওয়ার অনুভূতি কোনো যন্ত্র আপনাকে কখনোই দিতে পারবে না।
১০. স্বাস্থ্যসেবা সহায়তা
নার্স বা প্যারামেডিকদের কাজ কেবল রোগীর পালস মাপা নয়। একজন মুমূর্ষু রোগীকে ধরে বেডে শুইয়ে দেওয়া, ব্যথায় কাতর মানুষকে একটু সান্ত্বনা দেওয়া কিংবা জরুরি মুহূর্তে দৌড়ে গিয়ে অক্সিজেন লাগানোর মতো কাজগুলোতে গভীর মানবিক অনুভূতির প্রয়োজন হয়।
১১. চিকিৎসক ও সার্জন
এআই হয়তো রোগ নির্ণয়ে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু রোগীর বুকে স্টেথোস্কোপ লাগিয়ে তার কষ্টের কথা শোনা কিংবা অপারেশন থিয়েটারে জটিল অস্ত্রোপচার করার জন্য দক্ষ সার্জনের হাতের বিকল্প নেই। মানুষের শরীর ও মনের জটিলতা কেবল আরেকজন মানুষই সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারেন।
ওপরের**** তালিকাগুলো পড়ার পর আপনার মনে এআইয়ের কাছে চাকরি হারানোর ভয় উঁকি দেওয়াটা একদম অমূলক নয়। এটা সত্যি যে, গতানুগতিক ছকে বাঁধা কাজগুলো আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এআইয়ের দখলে চলে যাবে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠটাও আমাদের দেখতে হবে। এআই কোনো জাদুর কাঠি নয়, এটি কেবল একটি হাতিয়ার। মানুষের যে আবেগ, উপস্থিত বুদ্ধি এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করার অসীম ক্ষমতা রয়েছে, কোনো সফটওয়্যার তা নকল করতে পারবে না। তাই যারা অন্ধের মতো ভয় না পেয়ে এআইকে নিজের কাজের সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করতে শিখবেন এবং নিজের কাজের জায়গায় সৃজনশীলতার ছাপ রাখবেন, তারা শুধু টিকে থাকবেন তা-ই নয়; বরং এই নতুন যুগে তারাই নেতৃত্ব দেবেন। যন্ত্র হয়তো শ্রম দিতে পারে, কিন্তু শিল্পের জন্ম দেয় মানুষের মস্তিষ্কই!
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।


