
লেখাটি পড়তে বেশ সুন্দর, বাক্যগুলোও বেশ গোছানো। কোথাও বানান ভুল নেই, কথার মধ্যে অপ্রয়োজনীয় জটিলতাও নেই। কিন্তু পুরো লেখাটা পড়ার পর মনে হলো, আসলে নতুন কিছুই জানা হলো না। কথাগুলো যেন আগেও কোথাও পড়েছি। লেখকের নিজস্ব ভাবনা, অভিজ্ঞতা কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির ছাপও তেমন খুঁজে পেলাম না।
এমন অভিজ্ঞতা এখন অনেক সম্পাদকেরই হচ্ছে। অনলাইনে লেখা জমা পড়ে আগের চেয়ে অনেক গোছানো অবস্থায়। বানান ও ব্যাকরণে ভুল কম। বাক্য গঠনও সুন্দর। অথচ লেখাগুলোর মধ্যে একধরনের মিল চোখে পড়ে। বিষয় আলাদা, লেখক আলাদা, কিন্তু পড়তে গিয়ে মনে হয়, সবাই যেন একই মানুষকে দিয়ে লেখাচ্ছেন।
এর পেছনে একটি বড় কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার। চ্যাটজিপিটির মতো বিভিন্ন এআই টুল এখন কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি নিবন্ধ লিখে দিতে পারে। শুধু বিষয় বলে দিলেই হলো। চাইলে শিরোনাম, ভূমিকা, উদাহরণ, উপসংহারসহ সবই পাওয়া যায়। এমনকি লেখাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে দেওয়ার অনুরোধও করা যায়।
কিন্তু সুন্দর করে লেখা আর ভালো লেখা এক বিষয় নয়। একটি লেখা পড়তে সাবলীল হতে পারে, অথচ তার মধ্যে হয়তো নতুন কোনো তথ্য নেই। তথ্য থাকলেও সেগুলোর পেছনে যথেষ্ট গবেষণা হয়তো পাওয়া যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা, লেখকের নিজের চিন্তাভাবনাই সেখানে অনুপস্থিত থাকতে পারে।
দ্য নিউ ক্লাইমেট নামে একটি প্রকাশনার সম্পাদক তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা থেকে এমন কিছু লক্ষণের কথা বলেছেন। প্রকাশনাটি পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে লেখালেখি করে। বিভিন্ন দেশের লেখকের লেখা সম্পাদনা করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন, এআইয়ের অতিরিক্ত ব্যবহারে লেখার ধরন কীভাবে বদলে যাচ্ছে। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের লেখালেখির জগৎ সম্পর্কেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা যায়।
চ্যাটজিপিটি জনপ্রিয় হওয়ার পর অনেক লেখকের মতো ওই সম্পাদকের মনেও দুই ধরনের ভাবনা এসেছিল। একদিকে ভয়, অন্যদিকে সম্ভাবনা। ভয়টা ছিল খুব স্বাভাবিক। একজন লেখককে একটি নিবন্ধ লিখতে গবেষণা করতে হয়, তথ্য যাচাই করতে হয়, তারপর শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে লেখাটি দাঁড় করাতে হয়। এতে কয়েক ঘণ্টা, কখনো কয়েক দিনও লেগে যেতে পারে। অথচ এআইকে একই কাজ করতে বললে কয়েক মিনিটেই একটি গোছানো লেখা পাওয়া যায়।
তাহলে মানুষ লেখকের প্রয়োজন কতটা থাকবে? লেখার জন্য যে সময় ও পরিশ্রম লাগে, তার মূল্য কি কমে যাবে? এসব প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। আবার এআইকে কাজে লাগানোর সুযোগও ছিল। লেখার ভুল ধরতে, বাক্য ঠিক করতে, কোনো বিষয় সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিতে কিংবা প্রয়োজনীয় গবেষণার সূত্র খুঁজে পেতে এটি সাহায্য করতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা ইংরেজিকে মাতৃভাষা হিসেবে ব্যবহার করেন না, তাঁদের জন্য ভাষা সম্পাদনার কাজে এআই বেশ উপকারী হতে পারে।
সমস্যা শুরু হয় যখন লেখক নিজের লেখা ঠিক করার বদলে পুরো লেখাটিই এআইকে দিয়ে লেখিয়ে নেন। কারণ, তখন লেখার ভাষা বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে পারে তার ভাবনা ও নিজস্ব বৈশিষ্ট্যও।
দেখতে বিশ্বাসযোগ্য হলেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের অভাব
এআইয়ের লেখা যাচাই করতে গিয়ে ওই সম্পাদক প্রথম দিকে একটি বড় সমস্যা দেখতে পান। তিনি এআইকে কোনো বিষয়ে একটি অনুচ্ছেদ লিখতে বলতেন। পাশাপাশি অনুরোধ করতেন, সেই বিষয়ের কয়েকজন বিশিষ্ট গবেষক বা চিন্তাবিদের বক্তব্য যেন লেখায় যুক্ত করা হয়।
এআই সুন্দর একটি অনুচ্ছেদ লিখে দিত। সঙ্গে থাকত উদ্ধৃতি ও সূত্র। প্রথম দেখায় সবকিছু বিশ্বাসযোগ্য মনে হতো। কিন্তু সূত্রগুলো খুললে সমস্যা ধরা পড়ত। কোনো কোনো ওয়েব ঠিকানা কাজ করত না। আবার যে বিশেষজ্ঞের নাম দেওয়া হয়েছে, তিনি সত্যিই আছেন, তাঁর বইও আছে; কিন্তু উদ্ধৃত কথাটি তিনি কোথাও বলেননি।
এখানেই বিপদ। এআই অনেক সময় এমনভাবে বাক্য সাজাতে পারে, যেন কথাগুলো নিশ্চিতভাবে সত্য। কিন্তু ভাষার সাবলীলতা সত্যতার প্রমাণ নয়। একটি বক্তব্য শুনতে যথেষ্ট যুক্তিসংগত হলেও সেটি ভুল হতে পারে। কোনো উদ্ধৃতি বিশ্বাসযোগ্য মনে হলেও সেটি হতে পারে বানানো। এমনকি কোনো ঘটনার তারিখ, গবেষণার ফল কিংবা পরিসংখ্যানও ভুলভাবে উপস্থাপিত হতে পারে।
তাই এআই দিয়ে লেখা তৈরি করলে সেটি যাচাই করার দায়িত্ব লেখকেরই। কোনো সূত্র দেওয়া থাকলে সেটি খুলে দেখতে হবে। গবেষণার কথা বলা হলে খুঁজে বের করতে হবে মূল গবেষণাপত্র। কারও বক্তব্য উদ্ধৃত করলে নিশ্চিত হতে হবে, তিনি সত্যিই কথাটি বলেছেন কি না। এআইয়ের দেওয়া তথ্য যাচাই না করে প্রকাশ করলে ভুলের দায় কিন্তু এআই নেবে না। পাঠকের কাছে লেখক ও প্রকাশনাকেই জবাব দিতে হবে।
লেখার ভাষা যখন একই রকম হয়ে যায়
এআইয়ের লেখা চেনার আরেকটি উপায় হলো ভাষার পুনরাবৃত্ত ধরন। একই ধরনের শব্দ, বাক্যগঠন ও উপস্থাপনা বারবার চোখে পড়তে পারে। কখনো লেখক কোনো ছোট কথোপকথনের কথা দিয়ে লেখা শুরু করেন। এরপর বলেন, ঘটনাটি তাঁকে অনেক দিন ভাবিয়েছে। বাস্তবে এমন অভিজ্ঞতা মানুষের হতেই পারে। কারও একটি কথা সত্যিই মনে দাগ কাটতে পারে। কিন্তু বিভিন্ন বিষয়ে লেখা অসংখ্য নিবন্ধে একই ধরনের ভূমিকা দেখা গেলে প্রশ্ন জাগে। প্রত্যেক লেখকের অভিজ্ঞতা কি সত্যিই এতটা মিলে যাচ্ছে?
আবার কোনো বিষয় ব্যাখ্যা করার পর লেখক হঠাৎ বলে বসেন, বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কেন গুরুত্বপূর্ণ, সেটি বোঝানোর প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা হয়তো লেখায় নেই। ভালো লেখায় বিষয়টির গুরুত্ব তথ্য, উদাহরণ ও যুক্তির মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে। শুধু গুরুত্বপূর্ণ বলে দিলেই পাঠক তার গুরুত্ব বুঝতে পারেন না।
এআই প্রায়ই লেখাকে আকর্ষণীয় করতে ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করে। প্রতিটি বাক্যে আলাদা করে জোর দেওয়ার চেষ্টা থাকে। প্রয়োজনমতো এমন বাক্য ব্যবহার করলে লেখার গতি বাড়ে। কিন্তু প্রায় প্রতিটি অনুচ্ছেদেই একই কৌশল চলতে থাকলে লেখা কৃত্রিম শোনায়। মনে হয়, লেখক কোনো বক্তব্য বোঝানোর চেয়ে বক্তব্যটিকে নাটকীয় করে তুলতেই বেশি ব্যস্ত।
লেখায় জোর দেওয়ার জন্য ছোট বাক্য দরকার হতে পারে, তবে সব কথাকেই বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলতে গেলে শেষ পর্যন্ত কোনো কথাই আলাদা গুরুত্ব পায় না।
সবকিছুই যেন ঘটছে নিঃশব্দে
এআইয়ের লেখায় আরেকটি লক্ষণ হলো এমন শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহার, যা কোনো ঘটনার পেছনে চলতে থাকা প্রক্রিয়া বোঝায়। যেমন, কোনো সমস্যার বিস্তার হচ্ছে নীরবে, কোনো পরিবর্তন এগিয়ে যাচ্ছে চোখের আড়ালে, কিংবা বড় একটি ঘটনার পেছনে আরেকটি প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
এ ধরনের বাক্য সব সময় ভুল নয়। অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সত্যিই ধীরে ধীরে ঘটে। মানুষ প্রথমে তা বুঝতে পারে না। কিন্তু সমস্যা হয় যখন লেখায় বারবার একই ধরনের শব্দ ব্যবহার করে সাধারণ ঘটনাকেও রহস্যময় করে তোলা হয়।
পরিবেশ ও জলবায়ু নিয়ে লেখেন এমন একজন লেখক একবার একটি ঘূর্ণিঝড়কে নীরব বলে বর্ণনা করেছিলেন বলে ওই সম্পাদক উল্লেখ করেছেন। অথচ ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘটনা মোটেও নীরব নয়। এর বাতাস, বৃষ্টি ও ধ্বংসাত্মক প্রভাব স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। এখানে শব্দের ব্যবহার শুধু অস্বাভাবিকই নয়, বিষয়টিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার ঝুঁকিও তৈরি করে।
আরেকটি পরিচিত কৌশল হলো, বড় একটি ঘটনার আড়ালে থাকা তুলনামূলক ছোট প্রশ্নটি তুলে ধরা। এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করা হয়, যেন লেখকই প্রথম সেই প্রশ্নটি খুঁজে পেয়েছেন। অথচ প্রশ্নটি হয়তো খুবই পরিচিত, কিংবা মূল আলোচনার মধ্যে আগে থেকেই স্পষ্টভাবে ছিল।
সমস্যা আসলে শব্দে নয়। আবার কোনো শব্দ একবার ব্যবহার করলেই একটি লেখা এআই দিয়ে তৈরি হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। সমস্যা হলো একই ধরনের বাক্য ও উপস্থাপনার অকারণ পুনরাবৃত্তি। একটি লেখা যত বেশি নিজস্ব চিন্তা থাকে, তার ভাষাতেও তত বেশি বৈচিত্র্য থাকার সুযোগ থাকে।
গবেষণা আছে, অথচ সূত্র নেই
তথ্যভিত্তিক লেখার ক্ষেত্রে একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ—পাঠক যেন বুঝতে পারেন, লেখক তথ্যগুলো কোথা থেকে পেয়েছেন। কোনো গবেষণার ফল উল্লেখ করা হলো, সঙ্গে একটি পরিসংখ্যান দেওয়া হলো, কিংবা কোনো বিজ্ঞানীর বক্তব্য তুলে ধরা হলো; কিন্তু এসবের উৎস কোথায়? মূল গবেষণাপত্রের লিংক নেই, নির্ভরযোগ্য সংবাদ প্রতিবেদনের সূত্র নেই, প্রতিষ্ঠানের কোনো বিবৃতির উল্লেখও নেই। শুধু লেখকের বক্তব্যের ওপর ভরসা করতে বলা হলে সেই লেখা যাচাই করা পাঠকের জন্য কঠিন। একই সঙ্গে সম্পাদকের জন্যও এটি সমস্যা তৈরি করে। কারণ, একটি প্রকাশনার দায়িত্ব শুধু সুন্দর ভাষায় কিছু কথা উপস্থাপন করা নয়, বরং তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করাও তার কাজের অংশ।
এআই দিয়ে লেখা হলে এই সমস্যাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, এআই কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুল তথ্যের সঙ্গে এমন সূত্র জুড়ে দিতে পারে, যা দেখলে সত্যি বলে মনে হয়। আবার সূত্র থাকলেও সেটি লেখার বক্তব্যকে সমর্থন নাও করতে পারে। তবে সূত্রের লিংক থাকলেই যে লেখা ভালো গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে, তা-ও নয়। লিংকটি কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, সেখানে কী বলা হয়েছে এবং মূল লেখার দাবির সঙ্গে তার মিল আছে কি না, সেসব পরীক্ষা করতে হবে। শুধু অনুচ্ছেদের শেষে কয়েকটি লিংক জুড়ে দিলেই গবেষণার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
সাক্ষাৎকারের উদ্ধৃতি একদম নিখুঁত
সাংবাদিকতা বা অভিজ্ঞতাভিত্তিক লেখায় মানুষের বক্তব্যের মূল্য অনেক। একটি প্রতিবেদনের জন্য সাংবাদিক হয়তো কয়েকজনের সাক্ষাৎকার নিলেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলার পর এমন একটি বক্তব্য পাওয়া গেল, যা পুরো বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করে। কখনো সেই বক্তব্যটি লেখকের ধারণাকে সমর্থন করে, কখনো নতুন কোনো দিক সামনে আনে।
এমন উদ্ধৃতি পাওয়া সহজ নয়। অনেক সময় দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের মধ্যেও প্রয়োজনীয় বক্তব্য পাওয়া যায় না। আবার কখনো একটি ছোট বাক্যই ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ দিক পরিষ্কার করে দেয়। এআই দিয়ে লেখার ক্ষেত্রে বিপদ হলো, সেটি সাক্ষাৎকারের মতো বিশ্বাসযোগ্য কথোপকথন তৈরি করে দিতে পারে। কোনো কাল্পনিক ব্যক্তির নাম, তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা এবং মুখে বলা একটি বক্তব্য তৈরি হতে পারে; কিন্তু সেই ব্যক্তি যদি বাস্তবে কথাটি না বলে থাকেন, তাহলে উদ্ধৃতিটি মিথ্যা। এটি শুধু তথ্যের ভুল নয়; পাঠকের বিশ্বাসের সঙ্গেও প্রতারণা। যাঁর নামে বক্তব্যটি চালানো হচ্ছে, তাঁরও ক্ষতি হতে পারে।
এখানে মনে রাখা দরকার, মানুষের বক্তব্য শুধু লেখাকে আকর্ষণীয় করার উপকরণ নয়। এর পেছনে একজন বাস্তব মানুষ, তাঁর অভিজ্ঞতা ও বক্তব্যের সত্যতা রয়েছে। কোনো উদ্ধৃতি লেখার সঙ্গে চমৎকারভাবে মিলে গেলেই সেটি ব্যবহার করা যায় না। বক্তব্যটি সত্যিই দেওয়া হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে।
অঘটিত ব্যাপরকে ছবির সাহায্যে সত্য প্রমাণ করা
এআই দিয়ে তৈরি ছবি নিয়েও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে কোনো বাস্তব ঘটনা, দুর্যোগ বা বিপর্যয়ের ছবি হিসেবে এ ধরনের ছবি ব্যবহার করা হলে ঝুঁকি তৈরি হয়।
ধরা যাক, কোনো এলাকায় ভয়াবহ বন্যা হয়েছে। সেই বন্যা নিয়ে একটি প্রতিবেদন লেখা হলো। প্রতিবেদনের সঙ্গে এআই দিয়ে তৈরি একটি ছবি যুক্ত করা হলো, যা দেখতে একেবারে বাস্তব ছবির মতো। ছবিতে দেখা যাচ্ছে, ঘরবাড়ি ডুবে গেছে, মানুষ আশ্রয় খুঁজছে, চারপাশে পানি। পাঠক ছবিটিকে সত্যিকারের বন্যার ছবি বলেই ধরে নিতে পারেন।
প্রথম প্রকাশের সময় ছবির নিচে হয়তো লেখা হলো, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি। কিন্তু পরে কেউ ছবিটি কেটে অন্য জায়গায় ব্যবহার করলে সেই পরিচয় হারিয়ে যেতে পারে। ছবিটি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে, যেন সেটি সত্যিকারের ঘটনার দৃশ্য।
সমস্যার এখানেই শেষ নয়। ভবিষ্যতে কেউ ওই দুর্যোগ সম্পর্কে ছবি খুঁজলে এআইয়ের ওই ছবিটিও দেখতে পারে। তখন সে হয়তো বুঝতেই পারবেন না, ছবিটি বাস্তব নয়। এভাবে এআই দিয়ে তৈরি ছবি কোনো ঘটনার ইতিহাস সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দিতে পারে।
অবশ্য এআই দিয়ে সব ধরনের ছবি তৈরি করা সমস্যার নয়। কোনো জটিল বৈজ্ঞানিক ধারণা বোঝাতে চিত্র তৈরি করা, তথ্যচিত্রের জন্য একটি কাল্পনিক দৃশ্য আঁকা কিংবা গ্রাফ সাজানোর কাজে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
লেখার শেষে শুধু উপসংহার যোগ করলেই হয় না
কোনো নিবন্ধের শুরু, মাঝখান ও শেষের মধ্যে স্বাভাবিক যোগসূত্র থাকা দরকার। লেখার শেষের দিকে এসে মূল বক্তব্যগুলো গুছিয়ে বলা যেতে পারে। কিন্তু কিছু পরিচিত শব্দ দিয়ে প্রতিটি লেখার উপসংহার তৈরি করলে তা একসময় একঘেয়ে হয়ে ওঠে।
একই কথা অতিরিক্তভাবে বলা, প্রয়োজন ছাড়াই নতুন অনুচ্ছেদ শুরু করা কিংবা লেখার শেষে নতুন কিছু না বলে আগের কথাই পুনরাবৃত্তি করা দুর্বল লেখার লক্ষণ। এগুলো এআইয়ের আগেও ছিল। তবে এআই দিয়ে লেখা তৈরি করার প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ধরনের লেখাও বেশি চোখে পড়ছে বলে সম্পাদক মনে করেন।
একটি লেখায় অনেক পরিপাটি বাক্য থাকলেই সেটি পাঠকের মনে জায়গা করে নেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। লেখার প্রতিটি অংশের একটি কাজ থাকা উচিত। কোনো অনুচ্ছেদ যদি নতুন তথ্য না দেয়, আগের বক্তব্যকে পরিষ্কার না করে কিংবা পাঠককে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য না করে, তাহলে সেটির প্রয়োজন আছে কি না তা ভেবে দেখা দরকার।
ভাষা সুন্দর, কিন্তু বক্তব্য ফাঁকা
এআই দিয়ে লেখার সবচেয়ে কঠিন সমস্যা সম্ভবত এখানেই। লেখা দেখতে সুন্দর, পড়তেও আরামদায়ক’ কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাঠকের হাতে খুব বেশি কিছু থাকে না।
সম্পাদক যখন দ্য নিউ ক্লাইমেট প্রকাশনা শুরু করেন, তখন তাঁর ধারণা ছিল, জমা পড়া লেখার বড় সমস্যা হবে দুর্বল ভাষা। অনেক লেখায় বাক্য ঠিক করতে হতো, বানান সংশোধন করতে হতো, বক্তব্য পরিষ্কার করে দিতে হতো। কিন্তু চ্যাটজিপিটি জনপ্রিয় হওয়ার পর তিনি অন্য একটি পরিবর্তন লক্ষ করেন। লেখার ভাষা আগের চেয়ে গোছানো হয়ে উঠেছে, অথচ অনেক লেখার নিজস্ব স্বর হারিয়ে গেছে।
এ ধরনের লেখা প্রথম দেখায় আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। শিরোনাম আছে, ভূমিকা আছে, কয়েকটি যুক্তি আছে, শেষে সুন্দর উপসংহারও আছে, কিন্তু লেখাটি শেষ করার পর মনে প্রশ্ন জাগে, নতুন কী জানা গেল? লেখক আসলে কোন বিষয়টি বোঝাতে চেয়েছেন? তাঁর বক্তব্যের পক্ষে কী প্রমাণ দেওয়া হয়েছে?
সব মিলিয়ে লেখাটিতে অনেক শব্দ থাকলেও তথ্য ও যুক্তির যোগফল যথেষ্ট হয় না। বিষয়টি অঙ্কের একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যায়। দুটি সংখ্যাকে যোগ করার পর যে ফল পাওয়ার কথা, তার সঙ্গে যদি হিসাবের ফল না মেলে, তাহলে শুধু সুন্দরভাবে হিসাবটি লিখে লাভ নেই। লেখার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বাক্যগুলো ঠিকঠাক বসানো হয়েছে কি না, সেটাই শেষ কথা নয়। সেগুলো মিলে অর্থপূর্ণ কিছু তৈরি করছে কি না, সেটিই আসল।
তাহলে কি এআই ব্যবহার করা বন্ধ করে দিতে হবে
এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা প্রয়োজন। কোনো লেখায় এআইয়ের সাহায্য নেওয়া হয়েছে বলেই সেটি খারাপ, এমন নয়। বানান ঠিক করা, দুর্বোধ্য বাক্য সহজ করা, কোনো বিষয়ের প্রাথমিক ধারণা নেওয়া কিংবা গবেষণার জন্য সম্ভাব্য সূত্র খুঁজতে এআই কাজে লাগতে পারে।
কিন্তু ব্যবহার আর নির্ভরশীলতার মধ্যে পার্থক্য আছে। লেখক যদি প্রতিটি চিন্তা, প্রতিটি অনুচ্ছেদ, এমনকি নিজের অভিজ্ঞতাও এআইকে দিয়ে লিখিয়ে নেন, তাহলে ধীরে ধীরে তাঁর নিজের ভূমিকা কমে আসতে পারে। লেখার সিদ্ধান্তগুলোও তখন অন্য একটি ব্যবস্থার তৈরি করা ধরন অনুসরণ করতে থাকে।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার। এআইয়ের মতো শোনায় এমন কোনো বাক্য দেখলেই লেখাটিকে এআই দিয়ে তৈরি বলা যায় না। মানুষও পরিচিত শব্দ ব্যবহার করেন, ছোট বাক্য লেখেন, কোনো ঘটনার গুরুত্ব তুলে ধরেন কিংবা লেখার শেষে উপসংহার টানেন। তাই শুধু কয়েকটি শব্দ বা বাক্য দেখে লেখকের সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলা ঠিক হবে না।
তারচেয়ে বরং দেখা দরকার, লেখাটিতে যথেষ্ট তথ্য আছে কি না, তথ্যের নির্ভরযোগ্য সূত্র দেওয়া হয়েছে কি না, উদ্ধৃতি যাচাই করা হয়েছে কি না এবং লেখক নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন কি না। একই সঙ্গে লেখাটিতে নিজস্ব অভিজ্ঞতা, চিন্তা কিংবা নতুন কোনো পর্যবেক্ষণ আছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
লেখার মূল কাজ পাঠককে কিছু জানানো, কোনো বিষয় বুঝতে সাহায্য করা কিংবা নতুনভাবে ভাবার সুযোগ তৈরি করা। এআই এই কাজে সহযোগী হতে পারে। কিন্তু লেখকের হয়ে সব চিন্তা করতে শুরু করলে লেখার প্রয়োজনীয় অংশই হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
পাঠক শুধু সুন্দর বাক্য পড়তে চান না। পাঠক জানতে চান, লেখক কী বলতে চাইছেন, কেন বলছেন এবং তাঁর বক্তব্য বিশ্বাস করার মতো কারণ কী কী আছে। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারলে ভাষার চাকচিক্য দিয়ে লেখার ঘাটতি ঢেকে রাখা যায় না।
এআই দিয়ে লেখা ঠিক করে নেওয়া যায়। কিন্তু লেখকের হয়ে ভাবার দায়িত্বও যদি এআইয়ের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তাহলে একসময় লেখাটি হয়তো আরও নিখুঁত হবে, কিন্তু তার ভেতরে লেখককে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
সূত্র: মিডিয়ামে প্রকাশিত টিম স্মেডলির ‘হাউ আই স্পট এআই রাইটিং আ মাইল অ্যাওয়ে—বাই অ্যান এডিটর’ অবলম্বনে।
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।


