
বই পড়া মস্তিষ্কের জন্য অনেকটা একসঙ্গে কয়েকজনের দলবদ্ধভাবে কাজ করার মতো। আমরা যখন একটি লেখা পড়ি, তখন মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে কাজ শুরু করে। চোখ প্রথমে পাতার অক্ষরগুলো দেখে। মস্তিষ্কের বিশেষ কিছু অংশ সেই অক্ষরগুলো চিনে নেয় এবং সেগুলোকে শব্দে পরিণত করে। এরপর ভাষার সঙ্গে যুক্ত অংশগুলো সেই শব্দের অর্থ খুঁজে বের করে। একই সঙ্গে মনোযোগ আমাদের পড়ার দিকে আটকে রাখে। আর স্মৃতি সাহায্য করে আগের কথাগুলো মনে রাখতে। যেমন, রহস্য গল্প পড়ার সময় শুরুতে পাওয়া ছোট্ট একটি সূত্র শেষের ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে বুঝতে স্মৃতিই আমাদের সাহায্য করে।
পড়তে শেখাটাও আসলে মস্তিষ্কের একটি বড় পরিবর্তন। মস্তিষ্কের এই ক্ষমতাকে বলা হয় নিউরোপ্লাস্টিসিটি। সহজ করে বললে, আমাদের মস্তিষ্ক নিজের কাজের ধরন বদলাতে পারে এবং নতুন দক্ষতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। ছোটবেলায় পড়তে শেখার সময় মস্তিষ্কের এমন কিছু অংশ একসঙ্গে কাজ করতে শেখে, যেগুলো আগে অন্য কাজ করত। ধীরে ধীরে তারা আরও দ্রুত ও দক্ষ হয়ে ওঠে। ফলে আমরা অক্ষর দেখে সহজেই শব্দ ও তার অর্থ বুঝতে পারি।
গল্পের বই পড়ার সময় মস্তিষ্ক আরও মজার একটি কাজ করে। গল্পের ভেতরের ঘটনাগুলো সামনে মুভির দৃশ্যের মতো ভেসে ওঠে। কোনো চরিত্র বিপদে পড়লে আমরা তার ভয় কল্পনা করি। সে আনন্দিত হলে আমাদেরও ভালো লাগে। আবার কোনো চরিত্র প্রিয় কাউকে হারালে আমাদের মনও খারাপ হয়ে যায়। মনোবিজ্ঞানী গ্রিন একে বলেন ন্যারেটিভ ট্রান্সপোর্টেশন। মানে গল্পের জগতে এক ধরনের ডুবে যাওয়া।
তাই বইয়ের কোনো চরিত্রকে নিয়ে ভয়, আনন্দ, ভালোবাসা বা দুঃখের অনুভূতি আমাদের কাছে সত্যিই সত্যি মনে হতে পারে। যদিও আমরা জানি, ঘটনাগুলো আসলে বইয়ের পাতায় ঘটছে। গল্পের চরিত্রটি সত্যিকারের মানুষ নয়, তবু তার কষ্টে আমাদের মন খারাপ হয়। কারণ গল্প পড়ার সময় মস্তিষ্ক শুধু শব্দের অর্থ বোঝে না, সেই ঘটনাগুলোকে মনের মধ্যে বাস্তব অভিজ্ঞতার মতো কল্পনাও করে।
তবে নিয়মিত গল্পের বই পড়লে মস্তিষ্কের কী দীর্ঘমেয়াদি উপকার হয়, সে বিষয়ে বিজ্ঞানীরা এখনো গবেষণা করছেন। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ৭০টি পরীক্ষার ফল একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গল্প পড়ার কিছু ছোট কিন্তু ইতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে। বিশেষ করে অন্য মানুষের অনুভূতি বোঝা এবং তারা কী ভাবছে তা অনুমান করার ক্ষমতা, অর্থাৎ সহমর্মিতা ও মানসিক অবস্থা বোঝার দক্ষতায় কিছু উন্নতি দেখা গেছে।
তবে সবার ক্ষেত্রে ফল এক রকম নয়। কে পড়ছে, কী বই পড়ছে এবং কতটা মন দিয়ে পড়ছে; এসবের ওপরও এর প্রভাব অনেকটাই নির্ভর করে।
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।



