Qazi Akash Logo
কাজী আকাশ

আমরা যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি, তা আসলে কোথায় যায়

কাজী আকাশ১৪ আগস্ট, ২০২৬৩ মিনিট

মাস শেষে বিদ্যুতের লম্বা বিলটা যখন হাতে আসে, তখন নিশ্চয়ই কপালে দু-তিনটে ভাঁজ পড়ে। বিলের কাগজে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা থাকে, পুরো মাসে আপনি ঠিক কত ইউনিট বিদ্যুৎ পুড়িয়েছেন। কিন্তু কখনো কি আপনার মনে হয়েছে, এই যে এত এত বিদ্যুৎ আমরা দিনরাত ব্যবহার করছি, কাজ শেষে এগুলো যায় কোথায়? ফ্যানের বাতাস বা টিভির আলোর ভেতর দিয়ে কি বিদ্যুৎ জাদুমন্ত্রের মতো উধাও হয়ে যায়? নাকি কোথাও গিয়ে জমা হয়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে আমাদের একটা প্রচলিত ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা কথায় কথায় বলি, ফ্যান বা ফ্রিজ বেশি ‘বিদ্যুৎ খাচ্ছে’। কিন্তু সত্যিটা হলো, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি আসলে বিদ্যুৎ বা ইলেকট্রন খেয়ে ফেলে না।

ধরুন, আপনার বাড়ির তারের ভেতরের ইলেকট্রনগুলো হলো একদল পিৎজা ডেলিভারি বয়। তারা নিজেরা শক্তি নিয়ে পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে আপনার বাড়িতে আসে না; বরং বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের প্রভাবে সার্কিটে শক্তি স্থানান্তরের কাজে অংশ নেয়। আপনার ফ্যান, টিভি বা ফ্রিজ সেই শক্তি ব্যবহার করে। ডেলিভারি বয় কিন্তু ফুরিয়ে যায় না, তাদের সংখ্যাও কমে না। ফুরিয়ে যায় শুধু তাদের বয়ে আনা শক্তিটুকু।

তাহলে মূল প্রশ্নটা হলো, ডেলিভারি বয়দের দিয়ে যাওয়া ওই শক্তির শেষ পরিণতি কী হয়? সেই বিষয়টা বুঝতে হলে একটু পদার্থবিজ্ঞানের সাহায্য নিতে হবে।

মহাবিশ্বের একটি অলঙ্ঘনীয় নিয়ম আছে—তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র। এই সূত্র বলছে, শক্তিকে আপনি কোনোভাবেই ধ্বংস করতে পারবেন না। এটিকে বড়জোর এক রূপ থেকে আরেক রূপে বদলে দেওয়া যায়। আপনার ঘরের বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিগুলো ঠিক এই রূপান্তরের কাজটাই করে।

ধরুন, আপনি ঘরের বাতি জ্বালালেন। বাতিটি বৈদ্যুতিক শক্তিকে আলোতে রূপান্তর করল। আপনি ফ্যান ছাড়লেন, ফ্যানের ভেতরের মোটর সেই বৈদ্যুতিক শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে বদলে দিল। আবার স্পিকার চালালে সেই শক্তি হয়ে যাচ্ছে শব্দশক্তি। কিন্তু এখানেই গল্পের শেষ নয়। আলো, শব্দ বা গতি কিন্তু শক্তির চূড়ান্ত গন্তব্য নয়।

একটু খেয়াল করলে দেখবেন, শক্তির শেষ গন্তব্য আসলে একটাই—তাপ! আপনি টিভি দেখুন, ব্লেন্ডারে মসলা পিষুন কিংবা মোবাইল চার্জ দিন, দিন শেষে সব বৈদ্যুতিক শক্তিই কোনো না কোনোভাবে তাপ শক্তিতে পরিণত হয়। ল্যাপটপ বা টিভির পেছনে হাত দিলেই সেই তাপ আপনি টের পাবেন।

এমনকি ফ্যানের বাতাসে যে শরীর ঠাণ্ডা হয়, সেই বাতাসও কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাপেই মিলিয়ে যায়। ফ্যানের ব্লেড যখন ঘোরে, তখন বাতাসের অণুগুলোর সঙ্গে তার ঘর্ষণ হয়। সেই ঘর্ষণে তৈরি হয় অতি সামান্য তাপ। আবার স্পিকার থেকে বের হওয়া শব্দশক্তি বাতাসের অণুগুলোকে কাঁপিয়ে শেষ পর্যন্ত ঘর্ষণের মাধ্যমে তাপেই পরিণত হয়। ঘরের বাতি থেকে বের হওয়া আলো যখন দেয়াল বা আসবাবপত্রে পড়ে, তখন সেই বস্তুগুলো আলোকে শুষে নিয়ে সামান্য গরম হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ, আপনি হাজার হাজার ইউনিটের যে বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যবহার করছেন, তা আসলে কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে না বা ধ্বংস হচ্ছে না। সেগুলো আসলে তাপ শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে আপনার ঘরকে সামান্য হলেও গরম করছে।

তারপর কী হয়? সেই তাপ কি ঘরেই আটকে থাকে? না। আপনার ঘরের তাপ জানালা-দরজা গলে, দেয়াল ভেদ করে মিশে যায় বাইরের বায়ুমণ্ডলে। বায়ুমণ্ডল থেকে একসময় তা অবলোহিত বিকিরণ হিসেবে মহাকাশের অসীম শূন্যতায় হারিয়ে যায়।

ব্যাপারটা বেশ কাব্যিক, তাই না? রাতে পড়ার টেবিলে আপনি যে বাতিটা জ্বেলেছেন কিংবা প্রিয় গান শোনার জন্য যে স্পিকারটা বাজিয়েছেন, তার জন্য খরচ হওয়া শক্তিটুকুও একসময় তাপ হয়ে মহাজাগতিক এক অনন্ত আঁধারে গিয়ে মেশে। মহাবিশ্বের শক্তি মহাবিশ্বেই ফিরে যায়, মাঝখান থেকে কেবল আপনার পকেটের টাকাটাই যা খসে!

সূত্র: বিবিসি সায়েন্স ফোকাস, ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি

আপনার মতামত জানান

মন্তব্যসমূহ

লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।

লোড হচ্ছে

কাজী আকাশ

১৪ আগস্ট, ২০২৬ এ ১০:৫১ AM

দারুণ