Qazi Akash Logo
কাজী আকাশ

চেলসি কেন হঠাৎ বয়স্ক প্লেয়ার বেশি কিনছে

কাজী আকাশ•২৮ জুলাই, ২০২৬•৬ মিনিট

চেলসির ট্রান্সফার নীতিতে হঠাৎ এক অভাবনীয় ইউটার্ন! তরুণ প্রতিভাদের পেছনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালার পর ব্লুজরা এবার নজর দিয়েছে অভিজ্ঞতার দিকে। ম্যাক্সেন্স ল্যাক্রোয়া, ড্যানি ওয়েলবেক এবং জর্ডান হেন্ডারসনকে দলে ভেড়াতে চাইছে স্ট্যামফোর্ড ব্রিজের ক্লাবটি। এই একটি খবরই পরিষ্কার বলে দিচ্ছে, চেলসির অন্দরমহলে বড়সড় কোনো পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।

ফরাসি ডিফেন্ডার ল্যাক্রোয়ার বয়স ২৬ বছর। ক্রিস্টাল প্যালেসের এই তারকার জন্য চেলসি ৫২ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করতে প্রস্তুত। ফুটবল বিশ্বে ২৬ বছর বয়সটা খেলোয়াড়দের সেরা সময় ধরা হলেও, চেলসির সাম্প্রতিক স্কোয়াডের তুলনায় ল্যাক্রোয়া রীতিমতো বয়স্ক! গত দুই বছরে চেলসি ল্যাক্রোয়ার চেয়ে বেশি বয়সী কোনো খেলোয়াড় কেনেনি। তোসিন আদারাবিয়ো যখন এসেছিলেন, তখন তাঁর বয়স প্রায় ২৭ ছুঁইছুঁই ছিল, সেটাই ছিল একমাত্র ব্যতিক্রম। এর পাশাপাশি ব্রাইটন থেকে ৩৫ বছর বয়সী স্ট্রাইকার ড্যানি ওয়েলবেক এবং ব্রেন্টফোর্ড থেকে ৩৬ বছর বয়সী জর্ডান হেন্ডারসনকেও আনার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে তারা।

এই অভিজ্ঞদের আগমনে কপাল পুড়তে পারে তরুণদের। বিশেষ করে গত বছর ইপসউইচ টাউন থেকে আসা ২৩ বছর বয়সী স্ট্রাইকার লিয়াম ডেলাপের জায়গা প্রথম একাদশে বেশ হুমকির মুখে। অথচ এই ডেলাপকে প্রিমিয়ার লিগের অন্যতম সেরা তরুণ স্ট্রাইকার হিসেবেই দলে টানা হয়েছিল।

হঠাৎ এই পরিবর্তন কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে গত চার মৌসুমের দলবদল এবং মাঠের পারফরম্যান্সের চরম অসামঞ্জস্যতার মধ্যে। চার বছর আগে ক্লাবের মালিকানা যখন ব্লুকো (BlueCo) কনসোর্টিয়ামের হাতে যায়, তখন তৎকালীন ম্যানেজার থমাস টুখেল অভিজ্ঞদের পেছনে দেদারসে টাকা উড়িয়েছিলেন। ম্যানচেস্টার সিটি থেকে ২৭ বছর বয়সী রহিম স্টার্লিংকে আনা হয়েছিল প্রায় ৫০ মিলিয়ন পাউন্ডে। সপ্তাহে ৩ লাখ পাউন্ডের বেশি পারিশ্রমিক পাওয়া স্টার্লিং চেলসির জার্সিতে চূড়ান্ত ব্যর্থ হন এবং শেষমেশ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ফ্রি ট্রান্সফারে ক্লাব ছাড়েন।

শুধু স্টার্লিং নন, নাপোলি থেকে ৩৩ মিলিয়ন পাউন্ডে আসা ৩১ বছর বয়সী সেনেগালের ডিফেন্ডার কালিদু কৌলিবালিও এক মৌসুম পরেই আল-হিলালে পাড়ি জমান। বার্সেলোনা থেকে ১০.৩ মিলিয়ন পাউন্ডে আসা ৩৩ বছর বয়সী স্ট্রাইকার পিয়েরে-এমেরিক অবামেয়াংয়ের পরিণতিও হয়েছিল স্টার্লিংয়ের মতোই, ফ্রি ট্রান্সফারে বিদায়।

অভিজ্ঞদের পেছনে এমন কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা জলেও যাওয়ার পর চেলসির মালিকপক্ষের টনক নড়ে। তারা রাতারাতি নীতি বদলে ফেলে। অভিজ্ঞদের বাদ দিয়ে তারা শুরু করে ইয়ুথ প্রজেক্ট। এই প্রজেক্টে দারুণ কিছু সাফল্যও আসে। যেমন ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ২২ বছর বয়সী এনজো ফার্নান্দেজকে তৎকালীন ব্রিটিশ রেকর্ড ১০৭ মিলিয়ন পাউন্ডে কেনে তারা। ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে এনজো ২৪টি অ্যাসিস্ট করেছেন। এরপর ব্রাইটন থেকে ২১ বছর বয়সী ময়েজেস কাইসেডোকে ১০০-১১৫ মিলিয়ন পাউন্ডে আনা হয়। শুরুতে সংগ্রাম করলেও পরে তিনি লিগের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেন। আর ২১ বছর বয়সে ৪০ মিলিয়ন পাউন্ডে আসা কোল পালমারের কথা তো না বললেই নয়। চেলসিতে যোগ দেওয়ার পর লিগে ৪৭টি গোল করে তিনি এখন দলের সবচেয়ে বড় ভরসা।

কিন্তু তারুণ্যনির্ভর এই প্রজেক্টের একটা অন্ধকার দিকও ছিল। ৬২ মিলিয়ন পাউন্ডে আসা ২২ বছর বয়সী মিখাইলো মুদ্রিক ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে চার বছরের জন্য নিষিদ্ধ হয়েছেন। ৪৫ মিলিয়ন পাউন্ডে আসা ২৩ বছর বয়সী জোয়াও ফেলিক্স ১২ ম্যাচে মাত্র ১ গোল করে আল-নাসরে বিক্রি হয়েছেন। আর ৭০ মিলিয়ন পাউন্ডে আসা ২১ বছর বয়সী ফরাসি ডিফেন্ডার ওয়েসলি ফোফানার সময়টা কেটেছে ইনজুরির সঙ্গে লড়াই করে।

এই সবকিছু মিলিয়ে মাঠে চেলসির পারফরম্যান্স ছিল রোলারকোস্টারের মতো। ২০২২-২৩ মৌসুমে ৪৪ পয়েন্ট নিয়ে তারা লিগ শেষ করে ১২তম স্থানে। পরের দুই মৌসুমে কিছুটা উন্নতি করে যথাক্রমে ৬ষ্ঠ (৬৩ পয়েন্ট) ও ৪র্থ (৬৯ পয়েন্ট) স্থানে উঠে এলেও, ২০২৫-২৬ মৌসুমে তারা আবার মুখ থুবড়ে পড়ে। মাত্র ৫২ পয়েন্ট নিয়ে লিগ শেষ করে ১০ম স্থানে! গত চার বছরে শুধু কনফারেন্স লিগ ও ক্লাব বিশ্বকাপ জেতা চেলসির মালিকপক্ষের আকাশচুম্বী উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে এই ফলাফল একদম বেমানান।

দলটার অনভিজ্ঞতার চরম রূপ ফুটে ওঠে আরও। ২০২৫-২৬ মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগের বিগ-সিক্স দলগুলোর মধ্যে চেলসির শুরুর একাদশের গড় বয়স ছিল সবচেয়ে কম—মাত্র ২৪ বছর ১৯৪ দিন। পুরো লিগের ২০টি দলের মধ্যে গড় বয়সের দিক থেকে তাদের অবস্থান ছিল একেবারে তলানিতে, ২০তম। অর্থাৎ, আক্ষরিক অর্থেই একদল তরুণকে নিয়ে লড়াই করছিল তারা, যেখানে অভিজ্ঞতার মারাত্মক ঘাটতি ছিল।

এবার এই তারুণ্যের আধিক্য কাটাতেই নতুন ম্যানেজার জাবি আলোনসো দল গোছাতে চাইছেন নিজের মতো করে। আলোনসোর কোচিং দর্শনটাই তারুণ্য ও অভিজ্ঞতার দারুণ এক মিশেল। বেয়ার লেভারকুসেনে থাকার সময় তিনি গ্রানিত জাকা ও আলেজান্দ্রো গ্রিমাল্ডোসহ ২৭ বছরের বেশি বয়সী আটজন অভিজ্ঞ খেলোয়াড়কে দলে ভিড়িয়েছিলেন। চেলসিতেও তিনি সেই একই টোটকা কাজে লাগাতে চাইছেন।

মালিক বেহদাদ এগবালিও স্বীকার করেছেন, কোল পালমার, কাইসেডোর মতো তরুণ কোর গ্রুপটিতে তারা এখন অভিজ্ঞতার পরশ লাগাতে চান। ইতিমধ্যে সান্ডারল্যান্ড থেকে ৩৩ বছর বয়সী সুইস মিডফিল্ডার গ্রানিত জাকাকে আনার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে চেলসি। তবে ২৩ বছর বয়সী মর্গ্যান রজার্সকে দলে ভিড়িয়েছে, যাঁর প্রিমিয়ার লিগে খেলার ভালো অভিজ্ঞতা রয়েছে। ওয়েলবেক এবং ল্যাক্রোয়া দলে এলে চেলসির আক্রমণ ও রক্ষণভাগ আরও স্থিতিশীল হবে। অবশ্য এর ফলে নিকোলাস জ্যাকসনের মতো খেলোয়াড়দের ক্লাব ছাড়ার পথ প্রশস্ত হতে পারে এবং ডেলাপদের মতো তরুণদের প্রথম একাদশে জায়গা পাওয়া কঠিন হয়ে যাবে।

গত মৌসুমের ১০ম স্থানে শেষ করার হতাশা কাটাতে এবং ড্রেসিংরুমে শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব আনতে আলোনসো এখন অভিজ্ঞদের ওপরই বাজি ধরছেন। তারুণ্যের রোমাঞ্চ নাকি অভিজ্ঞতার ভার; চেলসির এই নতুন অধ্যায় কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়!

আপনার মতামত জানান

মন্তব্যসমূহ

লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।

লোড হচ্ছে
এখনও কোনো মন্তব্য নেই।