
দাড়িওয়ালা পুরুষকে কি বেশি আকর্ষণীয় দেখায়? নাকি ক্লিন শেভ করা মুখেই বেশি ভালো লাগে? আপনার পছন্দ হয়তো প্রথমটি। আবার আপনার বন্ধুর পছন্দ হতে পারে দ্বিতীয়টি। কিন্তু দাড়ি রাখার পেছনে কি শুধু সুন্দর দেখানোর ব্যাপারটাই কাজ করে? নাকি এর অন্য কোনো কারণও আছে?
গবেষণায় দেখা গেছে, দাড়ি থাকলেই যে একজন পুরুষকে নারীদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় লাগবে, এমন কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। বরং দাড়ির আরও কিছু কাজ থাকতে পারে। যেমন, অন্য পুরুষের কাছে নিজেকে বেশি শক্তিশালী বা প্রভাবশালী হিসেবে তুলে ধরা। এমনকি মারামারির সময় মুখের হাড়কে কিছুটা সুরক্ষাও দিতে পারে দাড়ি!
২০১২ সালে গবেষকেরা এ বিষয়ে একটি মজার পরীক্ষা করেছিলেন। তাঁরা নিউজিল্যান্ডের ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত নারী এবং সামোয়ার পলিনেশীয় নারীদের একই পুরুষদের দাড়িওয়ালা ও দাড়িহীন ছবি দেখান। এরপর জানতে চান, কোন ছবির পুরুষদের তাঁদের বেশি আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে।
ফলাফল ছিল বেশ চমকপ্রদ। উভয় নারীরাই দাড়িওয়ালা পুরুষদের দাড়িহীন পুরুষদের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় বলে মনে করেননি। অর্থাৎ, দাড়ি থাকলেই যে পুরুষের আকর্ষণ বাড়বে, গবেষণায় তার প্রমাণ মেলেনি।
অন্য গবেষণাগুলোতেও দাড়ি নিয়ে একরকম ফল পাওয়া যায়নি। কোনো নারী দাড়িওয়ালা পুরুষ পছন্দ করেন। কেউ পছন্দ করেন হালকা খোঁচা খোঁচা দাড়ি। আবার কারও পছন্দ একেবারে পরিষ্কার মুখ। একই মুভিতে নায়ককে কারও দাড়িসহ ভালো লাগে, কারও আবার ক্লিন শেভ করা অবস্থায়। তাই দাড়ি রাখলেই সবার মন জয় করা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই!
গবেষকেরা যদি দেখতেন, দাড়ি নারীদের আকৃষ্ট করার জন্যই মূলত বিবর্তিত হয়েছে, তাহলে বিভিন্ন সমাজ ও সংস্কৃতিতে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গবেষণার ফল তেমন নয়। তাই দাড়ির পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে।
দাড়ি নিয়ে ২০১২ সালের সেই গবেষণায় আরও একটি মজার বিষয় উঠে এসেছিল। নারীরা দাড়িওয়ালা পুরুষদের বেশি আকর্ষণীয় না ভাবলেও, দাড়িওয়ালা পুরুষদের সাধারণত বেশি বয়সী ও উঁচু সামাজিক মর্যাদার অধিকারী বলে মনে করেছিলেন। শুধু নারীরা নন, পুরুষেরাও এমনটাই ভেবেছিলেন।
আরেকটি বিষয় ছিল রাগী মুখের অভিব্যক্তি। একই পুরুষকে দাড়িসহ রাগী অবস্থায় দেখলে তাঁকে দাড়িহীন রাগী মুখের তুলনায় বেশি আক্রমণাত্মক বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু কেন এমন হয়?
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডেভিড পাটসের মতে, দাড়ি পুরুষের মুখের নিচের অংশ ও চোয়ালকে তুলনামূলক বড় দেখাতে পারে। এতে তাঁকে দেখতে মনে হতে পারে আরও শক্তিশালী ও ভয়ংকর।
যারা নিজেদের বেশি শক্তিশালী বা প্রভাবশালী হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছে, তারা হয়তো সঙ্গী পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা পেয়েছে। ফলে তাদের সন্তান জন্ম দেওয়ার সুযোগও বেড়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, এটি দাড়ির বিবর্তনের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা। দাড়ি যে ঠিক এই কারণেই তৈরি হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।
দাড়ির সঙ্গে পুরুষের সামাজিক মর্যাদা ও প্রতিযোগিতার সম্পর্ক থাকতে পারে, এমন ধারণার পক্ষে আরও কিছু তথ্য আছে। গবেষকেরা ১৮৪২ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে পুরুষদের মুখের লোম রাখার ফ্যাশন নিয়ে গবেষণা করেছিলেন। তাঁরা দেখেন, অবিবাহিত পুরুষের তুলনায় অবিবাহিত নারীর সংখ্যা কম হলে দাড়ি রাখার চল বাড়ার প্রবণতা ছিল। অর্থাৎ, যখন তুলনামূলক কম নারীর জন্য বেশি পুরুষের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছিল, তখন দাড়ি বেশি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।
কেন এমন হতে পারে? গবেষকদের ধারণা, দাড়ি পুরুষকে বেশি প্রভাবশালী বা শক্তিশালী দেখাতে সাহায্য করে। তাই সঙ্গী পাওয়ার প্রতিযোগিতায় এটি কোনো ভূমিকা রাখতে পারে। অবশ্য এই গবেষণা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে দাড়িই পুরুষদের সঙ্গী পাওয়ার সুযোগ বাড়িয়েছে। এখানে শুধু দাড়ির ফ্যাশন ও নারী-পুরুষের সংখ্যার অনুপাতের মধ্যে একটি সম্পর্ক দেখা গেছে।
এবার আসা যাক আরও অদ্ভুত একটি ধারণায়। দাড়ি কি মুখকে আঘাত থেকে বাঁচাতে পারে? ডারউইন শুধু মানুষের দাড়ি নিয়েই ভাবেননি। তিনি সিংহ, এল্ক ও লিংক্সের মতো প্রাণীর গলার লোম নিয়েও চিন্তা করেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, এসব প্রাণীর গলার লোম প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে লড়াইয়ের সময় গলার নরম অংশকে রক্ষা করতে সাহায্য করতে পারে। তাহলে মানুষের দাড়িও কি একই কাজ করে?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষকেরা একটি পরীক্ষা করেন। অবশ্য তাঁরা দাড়িওয়ালা ও দাড়িহীন পুরুষদের ডেকে এনে মুখে ঘুষি মারেননি! বরং মানুষের মুখের মতো আচরণ করতে পারে, এমন একটি মডেল তৈরি করেছিলেন। চোয়ালের হাড়ের অনুকরণে তাঁরা এমন একটি তন্তু ও ইপোক্সির মিশ্রণ ব্যবহার করেন, যার শক্তি ও দৃঢ়তা হাড়ের কাছাকাছি। আর মুখের ত্বকের অনুকরণে ব্যবহার করেন ভেড়ার লোম। এক মডেলে লোম ছেঁটে ফেলা হয়েছিল। অন্যটিতে রাখা হয়েছিল লোম। এভাবে তাঁরা দাড়িহীন ও দাড়িওয়ালা মুখের অনুকরণ তৈরি করেন।
এরপর দুই মডেলের ওপর ওজন ফেলে আঘাতের প্রভাব মাপা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, লোম ছাঁটা মডেলে আঘাত লোম রাখা মডেলের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি ছিল। অর্থাৎ, লোমের আবরণ আঘাতের কিছুটা প্রভাব কমাতে পারে। এ থেকে গবেষকেরা ধারণা করেন, মানুষের দাড়িও মুখের হাড়, বিশেষ করে চোয়ালকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।
ব্যাপারটা অনেকটা মাথায় হেলমেট পরার মতো নয়, তবে ধারণাটি কিছুটা একই রকম। বাইরের একটি আবরণ আঘাতের কিছু শক্তি শুষে নিতে পারে।
আজকাল কারও চোয়ালের হাড় ভেঙে গেলে চিকিৎসা নেওয়া যায়। প্রয়োজন হলে অস্ত্রোপচারও করা সম্ভব। কিন্তু প্রাচীনকালে চিকিৎসার সুযোগ ছিল অনেক কম। চোয়ালের হাড় ভেঙে গেলে খাবার চিবানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন কয়েক সপ্তাহ ধরে স্বাভাবিকভাবে খাবার খেতে না পারলে ভিপদ হয়ে যেত।
বর্তমানেও ঘুষি বা ভোঁতা কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত চোয়ালের হাড় ভাঙার একটি বড় কারণ। গাড়ি দুর্ঘটনার পর এমন আঘাতের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর একটি। বিভিন্ন সমাজে নারীদের তুলনায় পুরুষদের চোয়ালের হাড় ভাঙার ঘটনা বেশি দেখা যায়। অথচ পুরুষদের চোয়ালের হাড় সাধারণত তুলনামূলক পুরু।
তাই দাড়ি যদি মুখের হাড়কে সামান্য হলেও সুরক্ষা দিয়ে থাকে, তাহলে অতীতে তা কিছুটা সুবিধা দিতে পারত। তবে পরীক্ষাটি করা হয়েছিল মডেলের ওপর। বাস্তব মানুষের মুখে দাড়ি ঠিক কতটা সুরক্ষা দেয়, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। দাড়ি যদি আঘাতের প্রভাব কমাতে পারে, তাহলে দাড়িওয়ালা মানুষ কি মারামারিতে বেশি সুবিধা পান? ২০১৮ সালে ইউএফসির লড়াইয়ের তথ্য নিয়ে একটি গবেষণা করা হয়েছিল। এতে দেখা যায়, দাড়ি থাকলে প্রতিপক্ষের ঘুষিতে অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা কমে যায়, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যাদের দাড়ি ছিল, তাদের লড়াইয়ের ক্ষমতাও বাড়েনি।
আবার কিছু বিজ্ঞানীর মতে, দাড়ি উল্টো অসুবিধার কারণও হতে পারে। প্রতিপক্ষ দাড়ি ধরে টান দিতে পারে। তাই দাড়ি থাকলেই যে লড়াইয়ে বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাবে, এমন নয়। মডেলের ওপর পরীক্ষা করে আঘাতের ক্ষমতা কম পাওয়া আর বাস্তব লড়াইয়ে সুবিধা পাওয়া এক কথা নয়। এ দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে।
তাহলে দাড়ির আসল কাজ কী? এখন পর্যন্ত পাওয়া গবেষণা থেকে দাড়ির কাজ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো একক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। তবে ডেভিড পাটসের ধারণা, দাড়ি সম্ভবত অন্য পুরুষের কাছে সামাজিক মর্যাদা ও প্রভাব দেখানোর ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নারীদের আকৃষ্ট করতেও দাড়ির কিছু ভূমিকা থাকতে পারে। কিন্তু বিভিন্ন সমাজ ও সময়ে নারীদের কাছে দাড়ির আকর্ষণীয়তার প্রভাব একরকম নয়। অন্যদিকে দাড়িওয়ালা পুরুষকে বেশি প্রভাবশালী বা আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম বলে মনে করার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি ধারাবাহিক।
দাড়ির কাজ শুধু সুন্দর দেখানো কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের গবেষণা চলছে। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার। মুখের লোম নিয়ে মানুষের ধারণা শুধু সৌন্দর্যের মধ্যে আটকে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বয়স, শক্তি, সামাজিক মর্যাদা এবং মানুষের পরিবর্তনের ইতিহাস।
সূত্র: পপুলার সায়েন্স
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।


