
কোনো বন্ধুর জন্মদিনের দাওয়াতে গেছেন। সেখানে আপনার পাশে বসলেন এক অচেনা ভদ্রলোক। কথায় কথায় জানতে পারলেন, তিনি পেশায় একজন লেখক। আপনি মনে মনে ভাবলেন, ‘বাহ! মানুষটার সঙ্গে তো দারুণ একটা আড্ডা জমবে।’
এরপর শুরু হলো আসল খেলা। পরের টানা দুই ঘণ্টা ধরে ওই ভদ্রলোক তার লেখা নতুন উপন্যাসের প্লট, চরিত্র ও সাহিত্যদর্শন আপনাকে এমনভাবে গিলিয়ে ছাড়লেন যে আপনার কান দিয়ে ধোঁয়া বের হওয়ার উপক্রম! কিন্তু আড্ডার ওই দুই ঘণ্টায় তিনি একবারের জন্যও আপনাকে জিজ্ঞেস করলেন না, ‘তা ভাই, আপনি কী করেন? আপনার খবর কী?’
আমি নিশ্চিত, এমন পরিস্থিতি আপনার কাছে খুব চেনা। আমাদের সবার জীবনেই এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা আড্ডায় বসে শুধু নিজের ঢোল নিজেই পেটাতে থাকেন, অন্যের ব্যাপারে তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ থাকে না। কিন্তু মানুষ কেন এমন হয়? কেন আমরা অন্যের সম্পর্কে এত কম প্রশ্ন করি?
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক নিওবি ওয়ে ঠিক এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজে বের করেছেন। আর সেই উত্তরের পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের বেশ মজার কিছু মনস্তাত্ত্বিক কারণ। মজার পাশাপাশি একে অদ্ভুত কারণও বলতে পারেন।
অধ্যাপক নিওবি ওয়ের এই গবেষণা শুরু হয়েছিল তাঁর নিজের জীবনের এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা থেকে। ২০০৭ সালের কথা। তিনি তাঁর ছোট ছোট ছেলেমেয়েকে নিয়ে কয়েক মাসের জন্য চীনের সাংহাইয়ে গিয়েছিলেন। ট্রিপটা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা এক অভিজ্ঞতা।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার পর ঘটল এক অদ্ভুত কাণ্ড। তিনি যখন বন্ধুদের কাছে তাঁর এই দারুণ অভিজ্ঞতার গল্পগুলো বলতে চাইলেন, তখন দেখলেন এ বিষয়ে কারও কোনো আগ্রহই নেই! কেউ একটা প্রশ্নও করল না যে, ‘সাংহাই কেমন লাগল?’ নিওবি ভীষণ অবাক হয়ে ভাবলেন, ‘মানুষের কৌতূহলের হলোটা কী?’
প্রায় ২০ বছর পর তিনি সেই উত্তরটা খুঁজে পেয়েছেন। নিওবি বলছেন, মানুষ মূলত ভৌত, বস্তুগত বা প্রাকৃতিক জগৎ নিয়েই বেশি কৌতূহল দেখায়। কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের কৌতূহলের জায়গাটা আমাদের সমাজে মারাত্মকভাবে অবহেলিত।
এই বিষয়টা পরীক্ষা করার জন্য নিওবি এবং তাঁর দল ১১ থেকে ১৩ বছর বয়সী ৩৮৯ জন স্কুলশিক্ষার্থীর ওপর একটি গবেষণা চালান। তারা শিশুদের বলেন, ‘তোমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু বা প্রিয় শিক্ষককে তুমি কোন দুটি প্রশ্ন করতে চাও?’
কিছু শিশু বলল, তাদের আসলে কোনো প্রশ্নই নেই! কেউ কেউ খুব সাদামাটা প্রশ্ন করল। যেমন ‘রাতের খাবার কখন দেবে?’ কিন্তু যেসব শিশু অন্যদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন করতে চেয়েছিল, দেখা গেল তাদের নিজেদের বন্ধুত্বের গভীরতা বেশি এবং তারা মানসিকভাবে অনেক বেশি সুখী। কারণ, অন্যের জীবন সম্পর্কে প্রশ্ন করাটাই হলো মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গড়ার গোপন রহস্য।
তাহলে সমস্যাটা কোথায়?
সমস্যা হলো, ছোটবেলা থেকেই আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, অন্যের ব্যক্তিগত ব্যাপারে নাক গলানো বা বেশি প্রশ্ন করা অভদ্রতা। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আমাদের বর্তমান ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনযাপন, যেখানে আমরা চারপাশের মানুষকে নিয়ে মাথা ঘামাতে চাই না।
কিন্তু সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্যটা বেরিয়ে এল যখন ছেলে আর মেয়েদের উত্তরের তুলনা করা হলো। গবেষণায় দেখা গেল, মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের ‘আমার কোনো প্রশ্ন নেই’ বলার হার প্রায় দ্বিগুণ! এর মানে কী?
চলতি বছরের শুরুতে নিওবি ওয়ে এ বিষয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন, আমাদের সমাজে তথাকথিত পুরুষালি মানসিকতার কারণেই কৌতূহল মারা যাচ্ছে। যেসব কিশোর মনে করে, ‘বন্ধুদের সামনে নিজের কষ্ট প্রকাশ করা যাবে না’ কিংবা ‘সম্মান পেতে হলে অন্যের সাথে লড়াই করতে হবে’, তারাই মূলত অন্যের গল্প শোনার প্রতি সবচেয়ে কম আগ্রহ দেখায়।
অধ্যাপক নিওবির মতে, ‘আমাদের সমাজ ধরে নিয়েছে, অন্যের আবেগ বা অনুভূতি নিয়ে কৌতূহল দেখানোটা মেয়েলি ব্যাপার। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যেহেতু মেয়েলি বিষয়গুলোকে খুব একটা পাত্তা দেওয়া হয় না, তাই ইন্টারপার্সোনাল কৌতূহল বিষয়টিকে বিজ্ঞানীরাও এত দিন এড়িয়ে গেছেন।’
কীভাবে এই কৌতূহল ফিরে পাবেন?
নিওবি বিশ্বাস করেন, শিশুরা জন্মগতভাবেই কৌতূহলী হয়। একটু চর্চা করলেই এই মরে যাওয়া কৌতূহলকে আবার জাগিয়ে তোলা সম্ভব। তিনি নিউইয়র্কের স্কুলগুলোর জন্য ‘লিসেনিং উইথ কিউরিওসিটি’ নামে ২৬ পর্বের একটা পাঠ্যক্রম তৈরি করেছেন। সেখানে শেখানো হয় কীভাবে এমন প্রশ্ন করতে হয়, যার উত্তর শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-তে দেওয়া যায় না। ফলাফল? এই কোর্স শেষে শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে ছেলেদের বন্ধুত্বের মান অনেক বেড়ে গেছে!
আপনিও চাইলে আজ থেকেই এই চর্চা শুরু করতে পারেন। খুব সাধারণ একটা উপায় বাতলে দিই। আড্ডায় বসে পরিচিত কাউকে তাঁর ছোটবেলার কোনো মজার স্মৃতি নিয়ে প্রশ্ন করুন। মানুষ অতীত নিয়ে কথা বলতে খুব ভালোবাসে। এরপর তিনি যা বলছেন, তার সূত্র ধরে আরও দু-একটা প্রশ্ন করুন। দেখবেন, মানুষটা কেমন আগ্রহ নিয়ে কথা বলছে!
প্রথম দিকে নিজে থেকে এত প্রশ্ন করতে আপনার হয়তো একটু অস্বস্তি বা লজ্জা লাগতে পারে। কিন্তু অধ্যাপক নিওবি ওয়ে দারুণ একটা অভয় দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই আসলে ভেতরে ভেতরে চাই কেউ আমাদের সত্যিকারের কিছু প্রশ্ন করুক। আমাদের নিয়ে কেউ একটু আগ্রহ দেখাক।’
তাহলে আর দেরি কেন? আজই কোনো আড্ডায় বসে পাশের মানুষটিকে তাঁর নিজের সম্পর্কে একটা সুন্দর প্রশ্ন করেই ফেলুন না! হয়তো এই একটা প্রশ্নই আপনাদের সম্পর্কটাকে নতুন একটা মাত্রা দিয়ে বসবে!
সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।



