
আপনার ঘরের বাল্বটা গড়ে কয়দিন টেকে? ছয় মাস? এক বছর? খুব বেশি হলে দুই বছর? এবার একটু বিস্মিত হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিন। সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ার লিভারমোরের ৬ নম্বর ফায়ার স্টেশনে একদল মানুষ জড়ো হয়েছে ১২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে উইশ করতে। কার জন্য জানেন? একটা বাল্বের জন্য! হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন। ১২৫ বছর ধরে একটানা জ্বলছে এই সেন্টেনিয়াল লাইট।
বাল্বটি সাধারণ হলেও এর আড়ালে লুকিয়ে আছে কয়েক দশকের পুরোনো এক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। আর তার সঙ্গে মিশে আছে পদার্থবিজ্ঞানের দারুণ এক ভুল বোঝাবুঝি। চলুন, সে বিষয়গুলো একটু আলোচনা করা যাক।
আজকের দিনে লাইটবাল্ব তো মুদি দোকানেও পাওয়া যায়। কিন্তু ১৯ শতকে এটি ছিল রীতিমতো শৌখিন ও দামি জিনিস। ওহিওর শেলবি ইলেকট্রিক কোম্পানির মতো নির্মাতারা তখন হাতে ধরে অনেক যত্ন করে বাল্ব বানাতেন। এই ইনক্যান্ডেসেন্ট বা ভাস্বর বাল্বের বিজ্ঞানটা কিন্তু খুব সোজা। কাঁচের ভেতর থেকে বাতাস বের করে নিয়ে একটা সরু টাংস্টেন তার রাখা হয়। এর ভেতর দিয়ে বিদ্যুৎ গেলেই তারটা গরম হয়ে আলো ছড়ায়।
কিন্তু এখানেই বাঁধে আসল বিপত্তি! একটা বস্তু কতটা গরম, তার ওপর নির্ভর করে সেটা কতটা উজ্জ্বল আলো দেবে। মানুষের চোখে দৃশ্যমান উজ্জ্বল সাদা আলো পেতে হলে ওই টাংস্টেন তারটিকে গরম হতে হবে প্রায় ৫ হাজার ৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বুঝতেই পারছেন, এটা প্রায় সূর্যের পৃষ্ঠের তাপমাত্রার সমান! কিন্তু মুশকিল হলো, ফারেনহাইট স্কেলে টাংস্টেনের গলনাঙ্ক ৬ হাজার ১৯২ ডিগ্রি। অর্থাৎ, সূর্যের মতো উজ্জ্বল হতে গেলে বাল্ব নিজেই গলে ভস্ম হয়ে যাবে!
তাই বাল্ব নির্মাতাদের সবসময় একটা ভারসাম্য খুঁজতে হতো। বাল্ব বেশি উজ্জ্বল করলে তার আয়ু কমে যাবে। কারণ পরমাণুগুলো বাষ্পীভূত হয়ে যায় যে! আর আয়ু বাড়াতে গেলে আলো হবে নিভু নিভু।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এই ১২৫ বছরের সেন্টেনিয়াল লাইট এত দিন টিকল কী করে? আর ষড়যন্ত্র তত্ত্বটাই বা কী? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯২৫ সালে। সে সময় ফিলিপস এবং জেনারেল ইলেকট্রিকের মতো বড় বড় কোম্পানি মিলে তৈরি করে ফোবাস কার্টেল। এদের উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বজুড়ে বাল্বের বাজার নিয়ন্ত্রণ করা। তারা বাল্বের আয়ু নির্ধারণ করে দিল মাত্র ১ হাজার ঘণ্টা! অর্থাৎ ৪১ দিন ৬ ঘণ্টা।
ব্যাস, শুরু হয়ে গেল ষড়যন্ত্র তত্ত্ব। অনেকেই বলতে লাগলেন, ‘দেখলেন তো কাণ্ড! কোম্পানিগুলো ইচ্ছে করে বাল্বের আয়ু কমিয়ে দিয়েছে, যাতে আমাদের বারবার বাল্ব কিনতে হয়।’ অনেকে আরেক ধাপ এগিয়ে বললেন, ‘প্রমাণ চান? ওই যে দেখুন, ক্যালিফোর্নিয়ার ফায়ার স্টেশনে ১২৫ বছর ধরে একটা বাল্ব জ্বলছে। আগের দিনের জিনিস কত মজবুত ছিল!’
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই সেন্টেনিয়াল লাইট বা ১২৫ বছরের পুরোনো বাল্বটা আসলে কোনো জাদুকরী মজবুত জিনিস নয়। বলা হয় এটি ৬০ ওয়াটের বাল্ব, কিন্তু বাস্তবে এটি টানে মাত্র ৪ ওয়াট বিদ্যুৎ! এর অদক্ষতার কারণে এটি ৪ ওয়াটের সাধারণ বাল্বের চেয়েও কম আলো দেয়। ইলেকট্রনিক্স ব্লগার মাউরেসির মতে, আসল ঘটনা হলো, শেলবি ইলেকট্রিক কোম্পানির কোনো এক কারিগর হয়তো ভুল করে এমন একটা বাল্ব বানিয়ে ফেলেছিলেন, যার ফিলামেন্টের রেজিস্ট্যান্স ছিল মারাত্মক বেশি। ফলে আলো হতো খুব কম। পরে হয়তো সেটাকে রাতের মৃদু আলো হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল!
অর্থাৎ, এই বাল্বটা কনস্পিরেসি থিওরি প্রমাণ করার বদলে উল্টো বুঝিয়ে দিচ্ছে, কেন কোম্পানিগুলো ওই ১ হাজার ঘণ্টার নিয়ম করেছিল। আপনি নিশ্চয়ই এমন কোনো বাল্ব কিনে ঘরে লাগাতে চাইবেন না, যেটা ১২৫ বছর টিকবে ঠিকই, কিন্তু আলো দেবে একটা জোনাকির চেয়েও কম! তার ওপর মাস শেষে বিদ্যুতের বিলও আসবে গাদাখানিক।
তাছাড়া, এখন তো এলইডি বাল্বের যুগ। এগুলো আরও সস্তা, আর অনেক বেশি দিন টেকে। বড় বড় কোম্পানিগুলো যে ইতিহাসের পাতায় নিজেদের পকেট ভারী করতে কোনো ধান্ধাবাজি করেনি, তা নয়। কিন্তু এই ১২৫ বছরের বাল্বটার ক্ষেত্রে তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। এই বাল্বটা টিকে আছে শুছু একটাই কারণে, এটার আলো আসলে ভালো করে দেখাই যায় না!
সূত্র: পপুলার সায়েন্স
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।



