ফুটবল ইতিহাসে মেক্সিকো এবার এক অনন্য রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে। কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিলে ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক হিসেবে তারা ফুটবল লোকগাথায় নিজেদের নাম লেখাতে প্রস্তুত। কারণ, বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে তারা তৃতীয়বারের মতো আয়োজন করছে বিশ্বকাপ! এল ট্রাইকালার নামে পরিচিত এই দলটি এবার বিশ্বমঞ্চে তাদের ১৮তম আসরে অংশ নিতে যাচ্ছে।
এর আগে ১৯৭০ আর ১৯৮৬ সালেও তারা নিজেদের মাঠে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল। মজার ব্যাপার হলো, ওই দুইবারই তারা কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছেছিল। ঘরের মাঠের উন্মাতাল সমর্থন সব সময়ই তাদের জন্য বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এবারও মেক্সিকান ভক্তরা গ্যালারি মাতাবেন। ১৯৮৬ সালের সেই দলের অভিজ্ঞ সদস্য হাভিয়ের আগুইরে এখন দলের কোচ। তাঁর হাত ধরে মেক্সিকো এবার কোয়ার্টার ফাইনালের গণ্ডি পেরিয়ে আরও অনেক দূর যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
ডাগআউটের দিকপাল
২০২৫ সালের জুলাই মাসে হাইমে লোজানোর বিদায়ের পর মেক্সিকোর ডাগআউটে ফিরেছেন হাভিয়ের আগুইরে। মেক্সিকো জাতীয় দলের কোচ হিসেবে এটি তাঁর তৃতীয় ইনিংস। এর আগে ২০০২ সালের কোরিয়া/জাপান বিশ্বকাপে তিনি দলের দায়িত্বে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ২-০ গোলে হেরে শেষ ষোলো থেকে বিদায় নিয়েছিল তারা। এরপর ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপেও তিনি ছিলেন হট সিটে। সেবারও শেষ ষোলোতে আর্জেন্টিনার কাছে ৩-১ গোলে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয় মেক্সিকোর।

এই অভিজ্ঞ কোচ বলেছিলেন, ‘আমাদের সবার নজর এখন চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে। তা হলো মেক্সিকোর ইতিহাসের সেরা বিশ্বকাপ উপহার দেওয়া।’ স্প্যানিশ বাস্ক বংশোদ্ভূত হওয়ায় তাঁকে ভালোবেসে ডাকা হয় এল ভাস্কো। তাঁর মূল লক্ষ্য শুধু মাঠের সাফল্যই নয়, বরং খেলোয়াড়দের মধ্যে জাতীয় দলের হয়ে খেলার সেই পুরোনো আবেগ ফিরিয়ে আনা।
এই বিশাল চ্যালেঞ্জে তাঁকে সাহায্য করছেন সহকারী কোচ এবং দলের সাবেক কিংবদন্তি খেলোয়াড় রাফায়েল মার্কেজ। আশা করা হচ্ছে, ২০৩০ বিশ্বকাপের আগে মার্কেজই দলের প্রধান কোচের দায়িত্ব নেবেন। বার্সেলোনার মতো ক্লাবের রিজার্ভ দলের কোচিংয়ের অভিজ্ঞতা এবং তাঁর দুর্দান্ত ব্যক্তিত্ব মেক্সিকোর জন্য বড় এক অস্ত্র।
গ্রুপ ও ফিক্সচার
এ গ্রুপের হয়ে খেলবে মেক্সিকো। তাদের সঙ্গী দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র।
- ১২ জুন: মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা (রাত ১টা) – মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম
- ১৯ জুন: মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ কোরিয়া (সকাল ৭টা) – এস্তাদিও গুয়াদালাজারা
- ২৫ জুন: চেক প্রজাতন্ত্র বনাম মেক্সিকো (সকাল ৭টা) – মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম
যেভাবে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করল
স্বাগতিক দেশ হওয়ার সুবাদে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মেক্সিকো সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। ৪৮ দলের এই বিশাল আসরটি হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় টুর্নামেন্ট।
বিশ্বমঞ্চের বৃত্তান্ত
- কনফেডারেশন: কনকাকাফ
- বিশ্বকাপে সেরা সাফল্য: কোয়ার্টার ফাইনাল (১৯৭০ ও ১৯৮৬)
- শেষ বিশ্বকাপ: কাতার ২০২২ (গ্রুপ পর্ব)
- প্রথম বিশ্বকাপ: উরুগুয়ে ১৯৩০ (গ্রুপ পর্ব)
- বিশ্বকাপে উপস্থিতি: ১৮ বার (১৯৩০, ১৯৫০, ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৬, ১৯৭০, ১৯৭৮, ১৯৮৬, ১৯৯৪, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২, ২০২৬)
- টানা কোয়ালিফাই করার রেকর্ড: ৯ বার (১৯৯৪ সাল থেকে টানা)
- বিশ্বকাপ আয়োজক: ১৯৭০, ১৯৮৬ এবং ২০২৬ (যৌথ আয়োজক)
- বিশ্বকাপের সার্বিক পরিসংখ্যান: ম্যাচ ৬০টি, জয় ১৭টি, ড্র ১৫টি, হার ২৮টি। গোল করেছে ৬২টি, গোল হজম করেছে ১০১টি।
বিশ্বকাপে সেরা সাফল্য
বিশ্বকাপে মেক্সিকোর সেরা সাফল্যগুলো এসেছে নিজেদের ঘরের মাটিতেই। ১৯৭০ সালে রাউল কার্দেনাসের অধীনে তারা কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালির কাছে ৪-১ গোলে হেরে বিদায় নেয়। এরপর ১৯৮৬ সালে বোরা মিলুটিনোভিচের অধীনে তারা আবারও কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছায়। সেবার পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত গোলশূন্য ড্র থাকার পর টাইব্রেকারে হেরে হৃদয় ভাঙে মেক্সিকোর।
মেক্সিকোর প্রথম বিশ্বকাপ
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপেই অংশ নিয়েছিল মেক্সিকো। সেই আসরে তারা প্রথম ম্যাচ খেলেছিল ফ্রান্সের বিপক্ষে। এরপর তারা চিলি এবং আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হয়। তিনটি ম্যাচেই হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল। তবে ফ্রান্সের বিপক্ষে ৪-১ গোলে হারা সেই ম্যাচে হুয়ান কারেনো একটি গোল করে মেক্সিকোর ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ গোলদাতা হিসেবে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখেন।
মেক্সিকোর শেষ বিশ্বকাপ
কাতার বিশ্বকাপে মেক্সিকানদের পারফরম্যান্স বেশ হতাশাজনক ছিল। জেরার্ডো মার্টিনোর অধীনে পোল্যান্ডের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র দিয়ে শুরু করে তারা। এরপর চিরচেনা প্রতিপক্ষ আর্জেন্টিনার কাছে ২-০ গোলে হেরে যায়। শেষ ম্যাচে সৌদি আরবকে ২-১ গোলে হারালেও তা নকআউটে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না। ১৯৭৮ সালের পর সেবারই প্রথম মেক্সিকোকে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল।
বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা
লুইস হার্নান্দেজ এবং হাভিয়ের হার্নান্দেজ। নামের শেষের এই মিল ছাড়াও তাঁদের আরেকটি বড় মিল আছে। বিশ্বকাপে মেক্সিকোর হয়ে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ড এই দুজনেরই দখলে। উভয়ই ৪টি করে গোল করেছেন। এল ম্যাটাডোর খ্যাত লুইস হার্নান্দেজ ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করেন, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে দুর্দান্ত এক গোল করে ড্র এনে দেন এবং শেষ ষোলোতে জার্মানির বিপক্ষে আরেকটি গোল করেন।
এর ঠিক ১২ বছর পর বিশ্বমঞ্চে আবির্ভাব ঘটে হাভিয়ের চিচারিতো হার্নান্দেজের। তিনি টানা তিনটি বিশ্বকাপে গোল করার দারুণ কীর্তি গড়েন। ২০১০ বিশ্বকাপে ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনা, ২০১৪ সালে ক্রোয়েশিয়া এবং ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে গোল করে তিনি মেক্সিকোর হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের ৫০তম গোল পূর্ণ করেছিলেন।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড
জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামার ক্ষেত্রে রাফায়েল মার্কেজ এখনো সবার ওপরে আছেন। এই কিংবদন্তি ডিফেন্ডার বিশ্বকাপে মোট ১৯টি ম্যাচ খেলেছেন। ২০০২ বিশ্বকাপে তাঁর অভিষেক হয়। এরপর ২০০৬, ২০১০, ২০১৪ এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপ খেলে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান।
বিশ্বকাপে স্মরণীয় মুহূর্ত
মেক্সিকান ভক্তদের কাছে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপটি এখনো দারুণ সুখস্মৃতি হয়ে আছে। শুধু গ্যালারির সেই বিখ্যাত মেক্সিকান ওয়েভ বা উৎসবমুখর পরিবেশের জন্যই নয়, দল হিসেবে তাদের চমৎকার ফুটবলের জন্যও। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে শেষ ষোলোতে ওঠার পর তারা বুলগেরিয়াকে ২-০ গোলে হারায়। ওই ম্যাচে ম্যানুয়েল নেগ্রেটের সেই অবিশ্বাস্য সিজার কিক গোলটি আজও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে বিবেচিত হয়।
আরেকটি স্মরণীয় মুহূর্ত এসেছিল ১৯৯৮ সালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে। মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যেই ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েছিল মেক্সিকো। যখন মনে হচ্ছিল বিদায় নিশ্চিত, ঠিক তখন শেষ ১৫ মিনিটে রিকার্ডো পেলিয়ার হেড এবং ৯৪ মিনিটে লুইস হার্নান্দেজের অবিশ্বাস্য গোলে ২-২ সমতায় ফেরে মেক্সিকো। আর তাতেই শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত হয় তাদের!
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় জয়
বিশ্বকাপে এ পর্যন্ত ৬০টি ম্যাচ খেলেছে মেক্সিকো। এর মধ্যে তাদের সবচেয়ে বড় জয়টি এসেছিল ১৯৭০ সালে নিজেদের ঘরের মাঠে এল সালভাদরের বিপক্ষে। মেক্সিকো সিটির বিখ্যাত এস্তাদিও আজটেকা স্টেডিয়ামে হওয়া সেই ম্যাচে ৪-০ ব্যবধানের বিশাল জয় পেয়েছিল স্বাগতিকরা।
আগামী ১২ জুন মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে তাদের বিশ্বকাপ মিশন। কী মনে হয়, নিজেদের মাঠে চেনা দর্শকদের গর্জনে মেক্সিকো কি এবার সেমিফাইনালের সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নটা ছুঁতে পারবে?
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।



