বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়ার ক্ষেত্রে চেক প্রজাতন্ত্র এবার যে রূপকথার জন্ম দিয়েছে, তা হার মানাবে যেকোনো রোমাঞ্চকর মুভিকেও! উয়েফা অঞ্চলের প্লে-অফে রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ড এবং ডেনমার্ককে টানা দুটি পেনাল্টি শুটআউটে হারিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর পর বিশ্বকাপের মূলমঞ্চে বীরদর্পে ফিরছে তারা। উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠেয় ২০২৬ বিশ্বকাপে এ গ্রুপে স্বাগতিক মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে মাঠ মাতাতে প্রস্তুত চেকিয়া।
****
ডাগআউটের দিকপাল
গত বছরের ডিসেম্বরে চেকিয়ার ডাগআউটের দায়িত্ব নেন ৭৪ বছর বয়সী বর্ষীয়ান কোচ মিরোস্লাভ কৌবেক। প্লে-অফের সেই রোমাঞ্চকর জয় দুটিই ছিল তাঁর অধীনে চেকিয়ার প্রথম দুই ম্যাচ! এর আগে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ফারো দ্বীপপুঞ্জের মতো দলের কাছে অপ্রত্যাশিত হারের পর ইভান হাসেককে বরখাস্ত করা হয়েছিল।
খেলোয়াড়ি জীবনে কৌবেক স্পার্টা প্রাগের মতো বিখ্যাত ক্লাবের গোলরক্ষক ছিলেন। ১৯৮০-এর দশকের শুরুতে কোচিং ক্যারিয়ার শুরু করা এই অভিজ্ঞ কোচ ভিক্টোরিয়া প্লাজেনের হয়ে তিনবার দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলেও কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা আছে তাঁর।
****
গ্রুপ ও ফিক্সচার
বিশ্বকাপে এ গ্রুপের হয়ে লড়বে চেক প্রজাতন্ত্র। তাদের প্রতিপক্ষ স্বাগতিক মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং দক্ষিণ কোরিয়া।
- ১২ জুন: দক্ষিণ কোরিয়া বনাম চেক প্রজাতন্ত্র (সকাল ৮টা) – এস্তাদিও গুয়াদালাজারা
- ১৮ জুন: চেক প্রজাতন্ত্র বনাম দক্ষিণ আফ্রিকা (রাত ১০টা) – আটলান্টা স্টেডিয়াম
- ২৫ জুন: চেক প্রজাতন্ত্র বনাম মেক্সিকো (সকাল ৭টা) – মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম
****
যেভাবে বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করল
উয়েফা অঞ্চলের বাছাইপর্বে ক্রোয়েশিয়ার পেছনে থেকে গ্রুপ রানার্সআপ হয় চেকিয়া। ফলে তাদের প্লে-অফ খেলতে হয়। সেমিফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল আয়ারল্যান্ড। নিজেদের ঘরের মাঠ প্রাগে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে খাদের কিনারে চলে গিয়েছিল তারা। কিন্তু পাত্রিক শিকের পেনাল্টি এবং শেষ মুহূর্তে অধিনায়ক লাদিস্লাভ ক্রেজচির গোলে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ায় চেকিয়া। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে জিতে তারা ফাইনালে ওঠে।
ঘরের মাঠে ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল ডেনমার্ক। অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত ম্যাচটি ২-২ গোলে সমতায় ছিল। পাভেল সুলচ এবং ক্রেজচি গোল করেন। এরপর পেনাল্টি শুটআউটে ডেনিশরা ৪টির মধ্যে মাত্র একটি গোল করতে সক্ষম হয়। আর মিশাল সাদিলেকের নেওয়া শেষ শটটি জালে জড়াতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো স্টেডিয়াম। এভাবে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত হয়ে যায় চেকিয়ার!
****
বিশ্বমঞ্চের বৃত্তান্ত
- কনফেডারেশন: উয়েফা
- সেরা সাফল্য: রানার্সআপ (১৯৩৪ ও ১৯৬২)
- শেষ বিশ্বকাপ: ২০০৬ (গ্রুপ পর্ব)
- প্রথম বিশ্বকাপ: ১৯৩৪ (রানার্সআপ)
- বিশ্বকাপে উপস্থিতি: ১০ বার (১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৫৪, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৮২, ১৯৯০, ২০০৬, ২০২৬)
- সার্বিক পরিসংখ্যান: ম্যাচ ৩৩টি, জয় ১২টি, ড্র ৫টি, হার ১৬টি। গোল করেছে ৪৭টি, গোল হজম করেছে ৪৯টি। (উল্লেখ্য, ১৯৩০ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তারা চেকোস্লোভাকিয়া এবং ১৯৯৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত চেক রিপাবলিক নামে খেলেছে)।
****
বিশ্বকাপে সেরা সাফল্য
সাবেক চেকোস্লোভাকিয়া হিসেবে খেলে ১৯৩৪ এবং ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপে রানার্সআপ হওয়াই তাদের সেরা সাফল্য। ১৯৩৪ সালে রোমানিয়া, সুইজারল্যান্ড এবং জার্মানিকে হারিয়ে নিজেদের প্রথম ফাইনালে উঠেছিল দলটি। তবে ফাইনালে স্বাগতিক ইতালির কাছে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হেরে যায় তারা। অন্যদিকে চিলিতে অনুষ্ঠিত ১৯৬২ বিশ্বকাপে হাঙ্গেরি ও যুগোস্লাভিয়াকে হারিয়ে ফাইনালে উঠলেও শক্তিশালী ব্রাজিলের কাছে শিরোপা হাতছাড়া হয় তাদের।
****
চেকিয়ার শেষ বিশ্বকাপ
২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চে দেখা গিয়েছিল দলটিকে। তত দিনে স্লোভাকিয়া থেকে আলাদা হয়ে দেশের নাম হয়েছে চেক রিপাবলিক। সেবার তাদের শুরুটা হয়েছিল স্বপ্নের মতো। টমাস রোসিকির জোড়া গোলে যুক্তরাষ্ট্রকে ৩-০ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছিল তারা। কিন্তু পরের ম্যাচগুলোতে ঘানা এবং ইতালির কাছে হেরে হতাশাজনকভাবে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়।
****
চেকিয়ার প্রথম বিশ্বকাপ
চেকোস্লোভাকিয়া নামে ১৯৩৪ সালের ইতালি বিশ্বকাপে তাদের অভিষেক হয়। ১৬ দলের সেই টুর্নামেন্টটি সরাসরি নকআউট পদ্ধতিতে খেলা হয়েছিল। রোমানিয়া ও সুইজারল্যান্ডকে হারানোর পর সেমিফাইনালে ওলড্রিচ নেজেডলির দুর্দান্ত হ্যাটট্রিকে জার্মানিকে ৩-১ গোলে হারায় তারা। ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে আন্তোনিন পুকের গোলে শুরুতে এগিয়ে গেলেও, পরে গোল খেয়ে বসে এবং অতিরিক্ত সময়ের গোলে ইতালির কাছে শিরোপা হারায়।
****
বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা
১৯৩৪ সালের টুর্নামেন্টে ৫ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন ওলড্রিচ নেজেডলি। স্পার্টা প্রাগের এই কিংবদন্তি ১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপেও ২টি গোল করেছিলেন। বিশ্বকাপে তাঁর মোট ৭টি গোলের রেকর্ড আজও কোনো চেক খেলোয়াড় ভাঙতে পারেননি। ৫ গোল নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছেন টমাস স্কুরাভি। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ১৯৩৪ সালে ইতালির মাটিতে আলো ছড়ানো নেজেডলি ১৯৯০ সালে ইতালিতে বিশ্বকাপ চলাকালেই মৃত্যুবরণ করেন।
****
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচের রেকর্ড
চেকোস্লোভাকিয়ার হয়ে তিনটি বিশ্বকাপে মোট ১২টি ম্যাচ খেলেছেন লাদিস্লাভ নোভাক। ১৯৬২ সালে ফাইনালে ওঠা দলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ছিলেন এই ডিফেন্ডার। খেলোয়াড়ি জীবন শেষে অল্প সময়ের জন্য জাতীয় দলের কোচের দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি।
****
বিশ্বকাপের স্মরণীয় মুহূর্ত
চেকোস্লোভাকিয়ার দুইবার ফাইনালে ওঠার পেছনে অনেক নাটকীয় মুহূর্ত লুকিয়ে আছে। এর মধ্যে ১৯৩৪ সালের সেমিফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে নেজেডলির হ্যাটট্রিকটি অন্যতম। ১৯৬২ সালে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে ৮০ মিনিট পর্যন্ত ১-১ সমতা ছিল। এরপর অ্যাডলফ শেরারের জোড়া গোলে জয় ছিনিয়ে নেয় তারা। আর ১৯৬২ সালের পর তাদের সেরা পারফরম্যান্স আসে ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে। সে বছর তারা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। সেবার কোস্টারিকার বিপক্ষে ৪-১ গোলের জয়ে স্ট্রাইকার স্কুরাভির হ্যাটট্রিকটি ভক্তদের মনে আজও গেঁথে আছে।
****
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় জয়
১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স দেখিয়েছিল চেকোস্লোভাকিয়া। জেডেনেক জিকান এবং ভাক্লাভ হোভোরকার জোড়া গোলে সেবার শক্তিশালী আর্জেন্টিনাকে রীতিমতো ৬-১ ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছিল তারা!
দীর্ঘ দুই দশক পর বিশ্বকাপে ফিরে চেকিয়া এবার কেমন চমক দেখায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। দুই বার ফাইনাল খেলা দলটি কি এবার স্বাগতিক মেক্সিকো এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে হারিয়ে পরের পর্বে যেতে পারবে?
সূত্র: ফিফা
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।



