সবাই তাঁকে ডাকে খুদে জাদুকর বলে। কিন্তু পৃথিবীতে তাঁর অর্জনগুলো যেন মহাবিশ্বেরও সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। অনেকেই বলেন, ২০২২ সালে তিনি যখন বিশ্বকাপের ট্রফিটা ওপরে তুলে ধরলেন, তখনই নাকি তাঁর ফুটবলের সবকিছু জেতা শেষ হয়ে গেছে! কিন্তু মেসি তো থামার পাত্র নন। তিনি এখনো আপন মনে খেলে যাচ্ছেন। ফুটবল বিশ্বের রথী-মহারথীরা এখনো ভেবেই কূল পান না তিনি রক্তমাংসের মানুষ, নাকি অন্য গ্রহের কোনো এলিয়েন?
সাফল্যের সাতকাহন
বার্সেলোনার হয়ে টানা ১৭টি দূর্দান্ত মৌসুম কাটিয়েছেন তিনি। জিতেছেন ৩৪টি শিরোপা। এরপর পিএসজির হয়ে জিতেছেন টানা দুটি ফ্রেঞ্চ লিগ। ইন্টার মায়ামিকে জিতিয়েছেন তাদের ইতিহাসের প্রথম এমএলএস কাপ। সব মিলিয়ে ক্লাব ফুটবলে তাঁর ৪০টি শিরোপা জেতার বিশ্বরেকর্ড আছে।
আর্জেন্টিনার আকাশিনির্ভর জার্সিতেও তিনি কম যান না। অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গোল্ড মেডেল, ফিনালিসিমা এবং দুটি কোপা আমেরিকা জিতেছেন তিনি। তবে তাঁর মুকুটের সবচেয়ে বড় পালকটি যোগ হয় ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে। ৩৫ বছর বয়সে তিনি আর্জেন্টিনাকে এনে দেন তাদের স্বপ্নের তৃতীয় বিশ্বকাপ।
মেসির মতো ড্রিবলিং ক্ষমতা ফুটবল ইতিহাসে আর কারও আছে কি না, সন্দেহ। প্রতিপক্ষের দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে বল গলিয়ে দেওয়ায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার! তিনি শুধু গোল করতেই ওস্তাদ নন, গোল করাতেও সমান দক্ষ। ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্টের রেকর্ড তাঁরই দখলে। বার্সেলোনা এবং মায়ামির হয়ে গড়ে প্রতি ম্যাচে প্রায় একটি করে গোল করেছেন তিনি। আর হ্যাঁ, বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে রেকর্ড আটবার ফিফার বর্ষসেরা পুরস্কার তো তাঁর আছেই!

গুণীদের গুণগান
‘একসময় মানুষ বলত, আমাকে আটকাতে একটা পিস্তল লাগবে। আর এখন মেসিকে আটকাতে একটা মেশিনগান দরকার।’
রিস্টো স্টয়চকভ
‘আমি যখন প্রথমবার মেসির দেখা পাই, তখন হাত বাড়িয়ে তাঁকে ছুঁয়ে দেখেছিলাম। আমি নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম, সে আমাদের মতোই একজন সাধারণ মানুষ কি না!’
জিয়ানলুইজি বুফন
‘আমি ওর সঙ্গে অনেক ম্যাচ খেলেছি, কিন্তু ও মাঠে কী করে, সেটা আমি আজও বুঝে উঠতে পারিনি। ও মানুষ হতে পারে না, ও একজন এলিয়েন। লিও ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়।’
ডি মারিয়া
‘মেসি একটা জোকস! আমার নিজের চোখে দেখা সবচেয়ে সুন্দর জোকস।’
ওয়েন রুনি
‘যখন নিজের ক্যারিয়ারের দিকে তাকাই, সবচেয়ে বেশি আনন্দ পাই মেসির শুরুর দিনগুলো মনে করে। মেসি যখন অবসর নেবে, তখন শুধু বার্সেলোনা নয়, পুরো ফুটবল দুনিয়ার উচিত ১০ নম্বর জার্সিটাকে চিরতরে তুলে রাখা।’
রোনালদিনহো
‘সে মানুষ না-ও হতে পারে, কিন্তু সবচেয়ে ভালো ব্যাপার হলো, মেসি এখনো নিজেকে মানুষই মনে করে!’
হাভিয়ের মাশচেরানো
গোপন গল্প
১. বিখ্যাত আমেরিকান গায়ক লিওনেল রিচির নামানুসারেই মেসির নাম রাখা হয়েছিল। এই গায়কের একটা বিখ্যাত গানের অ্যালবাম ছিল ড্যান্সিং অন দ্য সিলিং। মেসির মা সেলিয়া এই অ্যালবামের ভক্ত ছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, গত বছর মায়ামিতে এই দুই লিওনেলের দেখাও হয়েছিল!
২. ছোটবেলায় মেসির গ্রোথ হরমোনের সমস্যা ছিল। ১৩ বছর বয়সে যখন বার্সেলোনায় ট্রায়াল দিতে যান, তখন তাঁর উচ্চতা ছিল মাত্র ৪ ফুট ৬ ইঞ্চি। স্প্যানিশ ডিফেন্ডার জেরার্ড পিকে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, ‘মেসি বল পায়ে নেওয়ার আগেই আমরা এই পিচ্চি ছেলেটাকে বাতিল করে দিয়েছিলাম। কিন্তু সে যখন বল পায়ে দৌড় শুরু করল, আমাদের সব সন্দেহ দূর হয়ে গেল।’
৩. সাইজে খুব ছোট হওয়ায় এবং চিকিৎসার অনেক খরচ থাকায় বার্সেলোনার কর্মকর্তারা প্রথমে তাঁকে দলে নিতে চাননি। কিন্তু স্পোর্টিং ডিরেক্টর কার্লোস রেক্সাচ ক্লাবের নিয়মের তোয়াক্কা করেননি। তিনি মেসির এজেন্টের সঙ্গে দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় হাতের কাছে কোনো কাগজ না পেয়ে একটা সাধারণ টিস্যু পেপারের ওপরই চুক্তি সই করিয়ে নিয়েছিলেন!
৪. ২০২২ বিশ্বকাপ জেতার কয়েক ঘণ্টা পর মেসি ইনস্টাগ্রামে ট্রফি হাতে একটা ছবি দিয়েছিলেন। প্রায় সাড়ে ৭ কোটি লাইক নিয়ে এটি এখনো ইনস্টাগ্রামের ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি লাইক পাওয়া ছবি। এর দুই দিন পর ট্রফি নিয়ে বিছানায় ঘুমানোর আরেকটা ছবি দিয়েছিলেন তিনি, সেটি আছে তালিকার তিন নম্বরে।
রেকর্ডের রোজনামচা
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সপ্তম কনিষ্ঠ গোলদাতা মেসি। গোল করার সময় তাঁর বয়স ছিল ১৮ বছর ৩৫৮ দিন।
আন্তোনিও কারভাহাল, লোথার ম্যাথাউস, রাফায়েল মার্কেজ, আন্দ্রেস গুয়ার্দাদো, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং মেসি—ফুটবল ইতিহাসে কেবল এই ছয়জনই টানা ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেছেন।
পাঁচটি আলাদা বিশ্বকাপে অ্যাসিস্টের রেকর্ড একমাত্র মেসিরই আছে। নকআউট পর্বে সবচেয়ে বেশি ৬টি অ্যাসিস্ট করার যৌথ রেকর্ড আছে পেলে এবং মেসির।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ড মেসির–২৬টি।
পাওলো মালদিনিকে টপকে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি মিনিট খেলার রেকর্ডও তাঁর—২,৩১৪ মিনিট।
অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ১৯টি ম্যাচ খেলেছেন মেসি।
এক বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব, শেষ ষোলো, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল—প্রতিটি ধাপে গোল করার একমাত্র রেকর্ডটি শুধু মেসিরই।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে যৌথভাবে শীর্ষে আছেন পেলে ও মেসি—২১টি।
বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে সবচেয়ে বেশি গোল করেছেন মেসি—১৩টি।
বিশ্বকাপে রেকর্ড ১১ বার ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছেন তিনি।
বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি সুযোগ তৈরির রেকর্ড যৌথভাবে ম্যারাডোনা ও মেসির—৬৭টি।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সফল ড্রিবল করেছেন মেসি।
একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে দুটি বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল জিতেছেন তিনি।

বিশ্বকাপের বৃত্তান্ত
২০০৬ সালে দারুণ এক বিশ্বকাপ অভিষেক হয়েছিল মেসির। বদলি হিসেবে নেমে মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন তিনি। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে বাদ পড়ে তাঁর দল। ২০১০ সালের বিশ্বকাপেও তিনি আলো ছড়িয়েছিলেন, কিন্তু কোনো গোল পাননি। সেবারও ওই জার্মানির কাছে হেরেই বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা।
২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে অবিশ্বাস্য সব ড্রিবলিং ও দারুণ সব গোল করে দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন। জিতেছিলেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল। কিন্তু ফাইনালে সেই জার্মানির কাছেই আবার স্বপ্নভঙ্গ হয় তাঁর। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সের কাছে হেরে শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিতে হয়। অনেকেই তখন ভেবেছিলেন, মেসির বুঝি আর বিশ্বকাপ জেতা হলো না!
কিন্তু গল্পটা যে অন্য রকম লেখা ছিল! ২০২২ সালে মেসি খেললেন তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা টুর্নামেন্ট। ৭টি গোল করলেন, খেললেন স্বপ্নের ফাইনাল। সেবার তিনি শুধু গোল্ডেন বলটাই বাড়ি নিয়ে যাননি, বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন তাঁর আজীবনের স্বপ্নের সেই সোনালি ট্রফিটাও!
২০২৬ বিশ্বকাপে মেসি ও আর্জেন্টিনার সম্ভাবনা
গত ৬২ বছরে কোনো দল টানা দুটি বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। কিন্তু তাই বলে আর্জেন্টিনার আত্মবিশ্বাস মোটেও কমেনি। তাঁদের জাদুকরী কোচ লিওনেল স্কালোনি এখনো দলের সঙ্গে আছেন। গোলপোস্টের পাহারায় আছেন এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, রক্ষণে দেয়াল হয়ে আছেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরো।
গত বিশ্বকাপের সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় এনজো ফার্নান্দেজ এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। তাঁর সঙ্গে মাঝমাঠে আছেন রদ্রিগো ডি পল এবং অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। আর আক্রমণভাগে জুলিয়ান আলভারেজ ও লাওতারো মার্টিনেজের মতো বিশ্বমানের তারকারা তো আছেনই। দল থেকে ডি মারিয়া বিদায় নিয়েছেন ঠিকই, তবে থিয়াগো আলমাদা, নিকো পাজ এবং ১৮ বছর বয়সী ফ্রাঙ্কো মাস্তানতুয়োনোর মতো নতুন প্রতিভারা আর্জেন্টিনাকে নতুন স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। আর সঙ্গে যদি মেসি থাকেন, তাহলে তো কথাই নেই!
সূত্র: ফিফা
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।



