ফুটবলের গল্পগুলো মাঝেমধ্যে কেমন অদ্ভুত সুন্দর একটা বৃত্ত তৈরি করে! এই বৃত্তে যেমন বেদনা থাকে, তেমনি থাকে দারুণ এক রোমাঞ্চ। কানাডার ফুটবল তারকা আলফনসো ডেভিসের জীবনে এখন ঠিক এমনই একটা বৃত্ত পূর্ণ হতে চলেছে। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে রাউন্ড অব ৩২ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মাঠে নামতে যাচ্ছে কানাডা। আর এই ম্যাচ দিয়েই বিশ্বকাপের মঞ্চে প্রথমবারের মতো পা রাখতে যাচ্ছেন কানাডার অধিনায়ক ডেভিস।
সবচেয়ে নাটকীয় ব্যাপার হলো, ম্যাচটি হতে যাচ্ছে লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে। ঠিক এক বছর আগে এই মাঠেই এক ভয়ংকর ইনজুরির শিকার হয়ে স্ট্রেচারে করে মাঠ ছেড়েছিলেন তিনি।
সময়টা ছিল ২০২৫ সালের মার্চ মাস। কনকাকাফ নেশনস লিগে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ চলছিল। সেই ম্যাচেই নিজের এসিএল ছিঁড়ে যায় বায়ার্ন মিউনিখের এই সুপারস্টারের। সঙ্গে হাঁটুর আরও বেশ কিছু ক্ষতি হয়। সেই চোট কাটিয়ে উঠতে পুরো আট মাস সময় লেগেছিল তার। এরপর আবার হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়ে এবারের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলোও মিস করেন তিনি। কিন্তু এখন, সব শারীরিক চোট ও মানসিক বাধা পেরিয়ে তিনি আবার প্রস্তুত।
লস অ্যাঞ্জেলেসে ফেরা নিয়ে ডেভিসের মনে কোনো ভয় কাজ করছে কি না? ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে তিনি কিন্তু একদম নির্ভার ছিলেন। খুব শান্ত গলায় বলেছেন, ‘আমি এটা নিয়ে ভাবছি না। ইনজুরি তো যেকোনো জায়গাতেই হতে পারত। এটা এমন একটা জিনিস, যার ওপর কারও হাত নেই। এখন এই স্টেডিয়ামে ফিরে এসে আমার শুধু মনে হচ্ছে, গত বছর মার্চে যে কাজটা আমি শুরু করেছিলাম, সেটা শেষ করার একটা সুযোগ পেয়েছি।’
‘এই স্টেডিয়ামে খেলতে আমার খুব ভালো লাগে, কারণ এটা সত্যিই সুন্দর। গতবার আমার খেলাটা মাঝপথেই থেমে গিয়েছিল, কিন্তু দিন শেষে এটাই ফুটবল। কেউ তো আর ইচ্ছা করে আহত হয় না। আমি আগামীকালের ম্যাচের জন্য নিজেকে মানসিকভাবে ও শারীরিকভাবে প্রস্তুত করছি।’

মাঠের বাইরে বসে সতীর্থদের বিশ্বকাপ খেলতে দেখাটা ডেভিসের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। বিশেষ করে খেলাগুলো যখন নিজেদের দেশের মাটিতে হচ্ছিল! তিনি বলেন, ‘এটা খুব যন্ত্রণাদায়ক ছিল। আপনি যখন ফুটবলকে এত ভালোবাসেন, তখন শুধু মাঠে নেমেই খেলতে চাইবেন। প্রথম ম্যাচটা গ্যালারিতে বসে দেখার সময় আমার মনে হচ্ছিল, কখন যে মাঠে নামব! দ্বিতীয় ম্যাচে সেই ইচ্ছা আরও বেড়ে গেল। তৃতীয় ম্যাচের আগে তো আমি সরাসরি কোচ জেসি মার্শের কাছে গিয়ে বললাম, আমাকে অন্তত কয়েক মিনিটের জন্য হলেও নামানো যায় কি না। তিনি চাইলেই বলতে পারতেন, ‘ঠিক আছে, যাও খেলে এসো’।”
কিন্তু কোচ জেসি মার্শ তো শুধু একজন কোচ নন, তিনি খেলোয়াড়দের অভিভাবকও। তিনি ডেভিসকে বোঝালেন, মাঠে ফেরার জন্য তার শারীরিক পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তাই তিনি ঝুঁকি নিতে চান না।
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ডেভিস ঠিক কতক্ষণ খেলবেন, তা নিয়ে কোচ মার্শ স্পষ্ট কিছু না বললেও জানিয়েছেন, তার এই তারকা খেলোয়াড় মাঠে নামতে পুরোপুরি প্রস্তুত। মার্শের ভাষায়, ‘আলফনসো আমাদের দলের সবচেয়ে বড় এক্স-ফ্যাক্টর। সে যখন মাঠে থাকে, তখন তার গতিশীলতা আমাদের আরও ভালো খেলতে সাহায্য করে। তার উপস্থিতি ও আত্মবিশ্বাস আমাদের পুরো দলের বিশ্বাসকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যায় যে, আমরা এই টুর্নামেন্টে নিজেদের সামর্থ্যের সেরাটা দিয়ে অনেক দূর যাওয়ার স্বপ্নও দেখতে পারি।’

কানাডার বিশ্বকাপ মিশন এখন যুক্তরাষ্ট্রে চলে এলেও, গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো হয়েছিল টরন্টো ও ভ্যাঙ্কুভারে। হাজার হাজার দেশি সমর্থকের সামনে কানাডাকে খেলতে দেখে ডেভিস দারুণ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন। তার মনে পড়ে যাচ্ছিল সেই পুরোনো দিনগুলোর কথা। ‘আমার তখন ১৭ বা ১৮ বছর বয়স। কানাডায় বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তাব নিয়ে ফিফা কংগ্রেসে কথা বলতে আমি রাশিয়ায় গিয়েছিলাম। সেই স্বপ্নটা যখন সত্যি হলো, তখন সত্যিই অন্য রকম লেগেছিল। টরন্টোতে প্রথমবার যখন আমি মাঠে পা রাখি, দৃশ্যটা আমার কাছে পরাবাস্তব মনে হচ্ছিল। এর আগে কখনো কোনো ফুটবল ম্যাচে এত কানাডিয়ান আমি একসঙ্গে দেখিনি। আনন্দে আমার চোখে জল চলে এসেছিল।’
কানাডা ও দক্ষিণ আফ্রিকা, উভয় দলই বিশ্বকাপের প্রথম নকআউট পর্বের ম্যাচ খেলবে আজ রাতে। এর আগে কোনো দিন বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে যাওয়া হয়নি কোনো দলের। কিন্তু কোচ জেসি মার্শ ও তার দল এই চ্যালেঞ্জ নিতে তৈরি। মার্শ যেমনটা বলছিলেন, ‘দল হিসেবে হয়তো আমরা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আগে কখনো খেলিনি। কিন্তু আমাদের খেলোয়াড়রা এমন বড় মঞ্চের চাপ সামলাতে জানে। আলফনসোর কথাই ধরুন, সে তো উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালেও খেলেছে! ম্যাচে আমাদের কঠিন মুহূর্ত আসবে, চ্যালেঞ্জ আসবে, কিন্তু আসল কথা হলো আমরা সেগুলো জয় করতে প্রস্তুত।’
লস অ্যাঞ্জেলেসের ওই সবুজ ঘাসে আজ যখন আলফনসো ডেভিস পা রাখবেন, তখন হয়তো তার মনে গত বছরের সেই যন্ত্রণার স্মৃতি এক মুহূর্তের জন্য হলেও উঁকি দেবে। কিন্তু পরমুহূর্তেই তিনি হয়তো দৌড়ে যাবেন বলের পেছনে; নিজের অসমাপ্ত কাজটা শেষ করতে। আমরা যারা ফুটবলের এই নাটকীয়তা ভালোবাসি, তাদের জন্য এর চেয়ে দারুণ গল্প আর কী হতে পারে!
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।



