Qazi Akash Logo
কাজী আকাশ

ফ্রান্স-মরক্কো ম্যাচের আগে যা যা জেনে নিতে পারেন

কাজী আকাশ৯ জুলাই, ২০২৬৮ মিনিট

এমবাপ্পেকে কি মরক্কো থামাতে পারবে?

টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে মুখোমুখি হচ্ছে এই দুই দল। এবার মঞ্চ কোয়ার্টার ফাইনাল। চার বছর আগে কাতারের সেমিফাইনালে এই মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়েই লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনাল নিশ্চিত করেছিল ফ্রান্স।

কোয়ার্টার ফাইনালে লড়বে ফ্রান্স ও মরক্কো

দিদিয়ের দেশমের দলকে এই টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত দেখাচ্ছে। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ৫ ম্যাচে ৭ গোল করে রীতিমতো উড়ছেন ফরাসি অধিনায়ক। গোল্ডেন বুটের দৌড়ে নরওয়ের আর্লিং হালান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে আছেন, মেসির চেয়ে মাত্র এক গোল পিছিয়ে। শেষ ষোলোতে প্যারাগুয়েকে বিদায় করার পর এমবাপ্পেকে এক প্যারাগুইয়ান সিনেটরের বর্ণবাদী মন্তব্যের শিকার হতে হয়েছিল। এমবাপ্পেকে তিনি ‘উপনিবেশিত ক্যামেরুনিয়ান’ বলায়, এমবাপ্পেও তাকে ‘ন্যক্কারজনক’ ও ‘বর্ণবাদী’ বলে কড়া জবাব দিয়েছেন। তবে জিলেট স্টেডিয়ামে আজ এমবাপ্পের পুরো মনোযোগ থাকবে মাঠের ফুটবলে। কারণ, বাজি ধরা আছে বিশ্বকাপের শেষ চারের টিকিট।

চলুন, আজকের রোমাঞ্চকর লড়াইটির প্রতিটি দিক একটু গভীরে গিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখা যাক।

বিশ্ব র‍্যাঙ্কিং

ফ্রান্সের ফিফা র‍্যাঙ্কিং: ১

মরক্কোর ফিফা র‍্যাঙ্কিং: ৬

ভেন্যু: জিলেট স্টেডিয়াম, ফক্সবোরো

তারিখ: ১০ জুলাই, শুক্রবার (বাংলাদেশ সময়)

ফ্রান্স যেভাবে কোয়ার্টার ফাইনালে এল

এই টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত নিজেদের সব ম্যাচ জেতা মাত্র দুটি দলের একটি ফ্রান্স, অন্যটি আর্জেন্টিনা। এ পর্যন্ত আসতে তারা ১৪টি গোল করেছে। মজার ব্যাপার হলো, কোনো ম্যাচেই তারা একবারের জন্যও পিছিয়ে পড়েনি। সেনেগালের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে শুরুতে খাবি খেলেও শেষ ৩০ মিনিটে ঝড় তুলে ৩-১ গোলে জয় পায় ফরাসিরা। এরপর ইরাককে ৩-০ এবং নরওয়েকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে হয় গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন। রাউন্ড অব ৩২-এ সুইডেনকে ৩-০ গোলে হারানোর পথে এমবাপ্পে জোড়া গোল করেন। আর শেষ ষোলোর এক উত্তপ্ত ম্যাচে তার একমাত্র পেনাল্টি গোলেই প্যারাগুয়েকে বিদায় করে ফ্রান্স।

প্যারাগুয়ের বিপক্ষে গোল দেওয়ার পর সতীর্থদের সঙ্গে এমবাপ্পে

মরক্কো যেভাবে কোয়ার্টার ফাইনালে এল

বর্তমান আফ্রিকান চ্যাম্পিয়নদের শুরুটা হয়েছিল ব্রাজিলের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র দিয়ে। ইসমাইল সাইবারির দারুণ এক লব গোলে সেবার সবার নজর কেড়েছিল তারা। এরপর স্কটল্যান্ডকে ১-০ এবং হাইতিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে গ্রুপ রানার্সআপ হিসেবে নকআউটে আসে মরক্কো। রাউন্ড অব ৩২-এ নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৯১ মিনিটে ডিফেন্ডার ইসা দিওপের গোলে ১-১ সমতায় ফেরে এবং পরে টাইব্রেকারে ৩-২ ব্যবধানে স্নায়ুক্ষয়ী জয় তুলে নেয়। শেষ ষোলোতে হিউস্টনে স্বাগতিক কানাডাকে ৩-০ গোলে স্রেফ উড়িয়ে দিয়েছে এই আফ্রিকান দলটি। সে ম্যাচে সব কটি গোল আসে দ্বিতীয়ার্ধে।

ফ্রান্সের কাছে আশা

তারা রীতিমতো আগুনে ফর্মে আছে। প্যারাগুয়ের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচটি বেশ শারীরিক ও উত্তপ্ত হলেও, তার আগের চার ম্যাচে ফরাসিরা অন্তত তিনটি করে গোল করেছে। আগের টুর্নামেন্টগুলোতে দেশমের দল তাদের হিসেবি ও রক্ষণাত্মক ফুটবলের জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু এবারের ফ্রান্স অনেক বেশি স্বাধীন এবং ভয়ংকর। প্যারাগুয়ে ম্যাচে হয়তো সেই চেনা ছন্দ কিছুটা অনুপস্থিত ছিল, কিন্তু উসকানিমূলক পরিস্থিতিতে তাদের মানসিক নিয়ন্ত্রণ এবং আক্রমণভাগের ধার ছিল দেখার মতো।

এই আক্রমণের মূল হোতা এমবাপ্পে। তবে উসমান দেম্বেলে, ব্র্যাডলি বারকোলা এবং মাইকেল ওলিসেকে নিয়ে গড়া আক্রমণভাগ যেকোনো রক্ষণের জন্য ত্রাস। ওলিসে এরই মধ্যে ৫টি অ্যাসিস্ট করেছেন, যার তিনটি থেকেই গোল করেছেন এমবাপ্পে। তবে ওলিসেকে এই ম্যাচে সতর্ক থাকতে হবে, আরেকটি হলুদ কার্ড দেখলেই সেমিফাইনাল মিস করবেন তিনি। একই শঙ্কা আছে বারকোলা ও মানু কোনের ক্ষেত্রেও। ইনজুরির কারণে অরেলিয়ান চুয়ামেনি হয়তো এই ম্যাচেও অনিশ্চিত। তার জায়গায় মিডফিল্ডে আদ্রিয়েন রাবিওর সঙ্গী থাকতে পারেন কোনে।

মরক্কোর কাছ আশা

এবারের বিশ্বকাপে মরক্কোর আক্রমণের অন্যতম ভরসা ইসমাইল সাইবারি কানাডার বিপক্ষে হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পড়ে এই ম্যাচ থেকে ছিটকে গেছেন। কোচ মোহামেদ ওয়াহবি তাকে ফলস নাইন হিসেবে খেলাচ্ছিলেন। তার জায়গায় আজ হয়তো কানাডার বিপক্ষে বদলি নেমে গোল করা সুফিয়ান রাহিমিকে দেখা যাবে।

হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে আজ হয়তো দেখা যাবে না ইসমাইল সাইবারিকে

গত রাউন্ডে ফ্রান্সকে প্যারাগুয়ে যেভাবে আটকে রেখেছিল, সেটি মরক্কোকে নিশ্চিতভাবেই আত্মবিশ্বাস জোগাবে। আফ্রিকান নেশনস কাপের ফাইনালের বাতিল হওয়া ফলটি হিসেবে ধরলে, মরক্কো টানা ৩৪ ম্যাচে অপরাজিত! বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা রাইট-ব্যাক আশরাফ হাকিমির পাশাপাশি এই দলে আছেন রহিম দিয়াজের মতো প্লেমেকার। এই বিশ্বকাপে তিনি ইতিমধ্যেই ৪টি অ্যাসিস্ট করেছেন।

কানাডা এবং নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তাদের জয়গুলো এসেছে মূলত ভয়ংকর সব কাউন্টার-অ্যাটাক থেকে। ফরাসিরা এই দিকটায় একটুও ছাড় দিলে মারাত্মক বিপদে পড়বে।

দুই দলের তারকা খেলোয়াড়

ফ্রান্সের ক্ষেত্রে এমবাপ্পের অতিমানবীয় গোল করার ক্ষমতার কথা এক পাশে রাখলে, বল জোগানের মূল কাজটা করছেন মাইকেল ওলিসে। এই বায়ার্ন মিডফিল্ডার এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ১১টি নিখুঁত থ্রু বল বাড়িয়েছেন, যা এমবাপ্পের গতির সঙ্গে দারুণ মানিয়ে যায়।

অন্যদিকে মরক্কোর তুরুপের তাস রহিম দিয়াজ। মনে আছে, এ বছর ঘরের মাঠে আফকনের ফাইনালে পানেনকা শট নিতে গিয়ে পেনাল্টি মিস করেছিলেন তিনি? সেই হতাশা তিনি এবার সুদে-আসলে পুষিয়ে দিচ্ছেন। দারুণ সৃজনশীল এই প্লেমেকার রাইট উইং থেকে কিছুটা ভেতরে ঢুকে খেলেন, যাতে ফুল-ব্যাক হাকিমি ওভারল্যাপ করার জায়গা পান।

দুই দলের লড়াইয়ের ইতিহাস

২০২২ বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে সেমিফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়েছিল মরক্কো। সেখানে তাদের স্বপ্ন ভাঙে এই ফ্রান্সের কাছেই (২-০)। ওই হারের পর মরক্কোর তৎকালীন কোচ ওয়ালিদ রেগ্রাগুই আক্ষেপ করে বলেছিলেন, তার কিছু ছোট কৌশলগত ভুলের কারণেই হয়তো তার জন্মভূমি ফ্রান্স ফায়দা পেয়েছিল।

তবে এই দুই দেশের সম্পর্ক শুধু খেলাতেই সীমাবদ্ধ নয়। ১৯০৭ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ফ্রান্স মরক্কোকে অর্থনৈতিক শোষণ ও নিপীড়নমূলক নীতির মাধ্যমে শাসন করেছে। বর্তমানে ফ্রান্সে ১০ লাখেরও বেশি মরক্কান বংশোদ্ভূত মানুষ বাস করেন। অভিবাসী সংখ্যার দিক থেকে আলজেরিয়ার পরই তাদের অবস্থান।

ম্যাচের ভাগ্য কোথায় নির্ধারিত হবে

কাউন্টার-অ্যাটাকে। এই টুর্নামেন্টে দ্রুত প্রতি-আক্রমণ থেকে সুযোগ তৈরিতে মরক্কো (১০টি) এবং ফ্রান্স (৯টি) সবার ওপরে আছে। দুই দলই এভাবে ৩টি করে গোল পেয়েছে। ফ্রান্স অনেক সময় ইচ্ছে করেই ৪-৪-২ ফর্মেশনে নিচে নেমে প্রতিপক্ষকে ওপরে উঠে আসার টোপ দেয়, যাতে বল কেড়ে নিয়ে এমবাপ্পে বা বারকোলা নিজেদের গতির ঝড় তোলার জায়গা পান।

ফ্রান্সের খেলার ধরন

ঠিক একই কাজ করে মরক্কোও। হাকিমি নিচ থেকে দারুণ স্প্রিন্ট টানেন, মিডফিল্ডে আজজেদিন উনাহির স্ট্যামিনা অসাধারণ। উইংয়ে বিলাল এল খানৌস গতির ঝড় তোলেন। তাই আজ যে দল বলের দখল রেখে প্রতিপক্ষের প্রতি-আক্রমণ সামলানোর নিখুঁত জাল বুনতে পারবে, ম্যাচ তাদের পকেটেই যাবে।

মরক্কোর খেলার ট্যাকটিস

বিশেষজ্ঞদের মতে কে জিতবে

আজকের ম্যাচে ফ্রান্সই ফেভারিট। ফ্রান্স ২-০ বা ৩-১ গোলে জয় পেতে পারে। মরক্কো দল হিসেবে দারুণ সুশৃঙ্খল এবং কাউন্টার-অ্যাটাকে ভয়ংকর। কিন্তু ফ্রান্সের আক্রমণভাগের যে গভীরতা এবং বেঞ্চে যে মানের খেলোয়াড়রা বসে আছেন, শেষ পর্যন্ত ফরাসিদের আটকে রাখা মরক্কোর জন্য প্রায় অসম্ভবই হবে।

ফ্রান্স সম্পর্কে বিশেষ তথ্য

দেশম নকআউট পর্বে লেফট সাইডে বেশ বড় পরিবর্তন এনেছেন। গ্রুপ পর্বে লেফট-ব্যাকে রক্ষণাত্মক থিও হার্নান্দেজ খেললেও, তাকে বদলে ক্রস করার জন্য লুকাস দিনিয়েকে এনেছেন। আর উইংয়ে তরুণ ডুয়ের বদলে বারকোলাকে নামিয়ে গতির সঞ্চার করেছেন।

মরক্কো সম্পর্কে বিশেষ তথ্য

মরক্কোই প্রথম আফ্রিকান দেশ, যারা দুবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠল। তবে ২০২২ সালে স্পেন ও পর্তুগালকে বিদায় করা সেই দলটির চেয়ে বর্তমান দলটি কৌশলগতভাবে অনেক আলাদা। আগের কোচ রেগ্রাগুইয়ের অধীনে বল পজেশন ২০-২৫ শতাংশ থাকলেও, বর্তমান কোচ ওয়াহবির অধীনে তারা অনেক বেশি বল পায়ে রেখে খেলতে পছন্দ করে। মজার তথ্য হলো, গত মৌসুমে ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে মরক্কোর ৫১ জন খেলোয়াড় খেলেছেন, যা যেকোনো দেশের মধ্যে ১২তম সর্বোচ্চ।

ম্যাচের রেফারি

বর্তমানে রেফারি ম্যাচে বড় ভূমিকা পালন করছেন। আজকের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি পরিচালনা করবেন ৪৪ বছর বয়সী আর্জেন্টাইন রেফারি ফাকুন্দো তেল্লো এবং তার পুরো টিম। ২০২৬ বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে এই প্রথম পুরো অফিশিয়েটিং টিম একই দেশের। ব্যাপারটি ফরাসিরা খুব একটা ভালোভাবে নেয়নি, কারণ ২০২২ সালের ফাইনালে এই আর্জেন্টিনার কাছে হেরেই তাদের শিরোপা হাতছাড়া হয়েছিল। তা ছাড়া ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে দেখা হতে পারে ফ্রান্স ও আর্জেন্টিনার। তেল্লো এর আগে গ্রুপ পর্বে দক্ষিণ আফ্রিকা ও কানাডার দুটি ম্যাচ পরিচালনা করে ৭টি হলুদ কার্ড দেখিয়েছেন, তবে কোনো পেনাল্টি দেননি।

আপনার মতামত জানান

মন্তব্যসমূহ

লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।

লোড হচ্ছে
এখনও কোনো মন্তব্য নেই।