ফুটবলের আসল আনন্দ কিন্তু গোলেই! দর্শকেরা গ্যালারিতে আসেন জালে বল জড়ানোর রোমাঞ্চ দেখতে। আর সেই রোমাঞ্চের পথে যিনি বারবার বাধা হয়ে দাঁড়ান, তিনি তো এক অর্থে খলনায়কই! স্পেনের গোলরক্ষক উনাই সিমন নিজেকে ঠিক এই জায়গাতেই রাখেন। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা হলাম ফুটবলের ভিলেন, ওই গোল আটকানোই আমাদের কাজ, যে গোলের ওপর ফুটবল বেঁচে থাকে।’

যদি তা-ই হয়, তবে এবারের বিশ্বকাপে সিমনের চেয়ে বড় ভিলেন হয়তো আর কেউ নেই। ফরোয়ার্ডদের আধিপত্যের এই বিশ্বকাপে একজন মানুষ যেন একাই দুর্ভেদ্য এক দেয়াল তুলে দাঁড়িয়ে আছেন। শেষ ষোলোতে পর্তুগালের বিপক্ষে ম্যাচের প্রথমার্ধ শেষ হতে তখন ৫ মিনিট বাকি। মাঠে তখনো বলার মতো তেমন কিছুই ঘটেনি। কিন্তু কিছুই না ঘটাটাই যেন সিমনের সবচেয়ে পছন্দ! ঘড়ির কাঁটা যখন ৪০ মিনিট ছুঁল, স্প্যানিশ গোলরক্ষক নীরবে গড়ে ফেললেন বিশ্বকাপের এক ঐতিহাসিক রেকর্ড। কাতার বিশ্বকাপে জাপানের আও তানাকার সেই গোলের পর থেকে বিশ্বকাপে টানা ৫৬০ মিনিট কোনো গোল হজম করেনি স্পেন!
শেষ ৩২-এ অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেই তিনি ইতালির ওয়াল্টার জেঙ্গার ৫১৭ মিনিটের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিলেন। আর পর্তুগাল ম্যাচে পার হয়ে যান সুইজারল্যান্ডের গড়া ৫৫৯ মিনিটের রেকর্ডটি। সুইসরা এই রেকর্ডটি গড়েছিলেন ১৯৯৪, ২০০৬ ও ২০১০ বিশ্বকাপ মিলিয়ে। যাহোক, পর্তুগাল ম্যাচে নুনো মেন্ডেসের শট ক্রসবারে লাগলেও সিমনের জাল অক্ষত থেকে যায়, আর শেষ মুহূর্তে মিকেল মেরিনোর একমাত্র গোলে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে স্প্যানিশরা।
গোলরক্ষকের কাজটা যে কতটা ‘অকৃতজ্ঞের’, তা সিমন নিজেই স্বীকার করেন। খবরের কাগজের প্রথম পাতা তো বরাদ্দ থাকে স্ট্রাইকারদের জন্যই! পুরো বছর জুড়েই সিমনকে নিয়ে বিস্তর সমালোচনা হয়েছে। দলে যখন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সেরা কিপার ডেভিড রায়া বা লা লিগার সেরা হোয়ান গার্সিয়া আছেন, তখন অ্যাথলেটিক ক্লাবের হয়ে বাজে সময় পার করা সিমনকে নিয়ে কথা ওঠাটাই স্বাভাবিক। তবে কদিন আগে সিমন নিজেই বিরক্তি নিয়ে বলেছিলেন, ‘যাই হোক, আমি বলব বিশ্বকাপের সেরা গোলরক্ষকরা আমাদের দলেই আছে।’
সিমনের এই আত্মবিশ্বাসের পেছনের কারণটা ব্যাখ্যা করেছেন তাঁরই সতীর্থ গার্সিয়া। তিনি বলেন, ‘একজন গোলরক্ষকের সবচেয়ে বড় গুণ হলো সেভ করার চেয়ে আক্রমণ ঠেকিয়ে দেওয়া। বাতাসে ভাসা বল ক্লিয়ার করা বা নিচু ক্রসগুলো আটকে দেওয়া। এগুলো হয়তো পরিসংখ্যানে থাকে না, কিন্তু এগুলোই আসল। একটা সুযোগ তৈরি হওয়ার আগেই তা নষ্ট করে দেওয়াটাই এবারের বিশ্বকাপে আমাদের বড় চাবিকাঠি।’
তবে সিমন যে এই রেকর্ডের একমাত্র রূপকার, তা কিন্তু নন। সিমন নিজেই বলেন, ‘এই রেকর্ড আমার চেয়ে দলের কথাই বেশি বলে।’ সিমন ছাড়াও স্পেনের হয়ে প্রতিটি মিনিট মাঠে ছিলেন মার্ক কুকুরেয়া ও পউ কুবারসি। আইমেরিক লাপোর্তে মাঠের বাইরে ছিলেন মাত্র এক মিনিটের জন্য। আর তাঁদের সামনে থাকা রদ্রি প্রথম দিকে একটু ধীর থাকলেও শেষ দুই ম্যাচে ছিলেন অনবদ্য।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছেন ১৯ বছর বয়সী পউ কুবারসি। লামিনে ইয়ামালকে নিয়ে যখন চারদিকে বন্দনা, তখন মাঠের অন্য প্রান্তে এই তরুণ ডিফেন্ডার নীরবে নিজের কাজ করে যাচ্ছেন। মাত্র ২০০ মানুষের ছোট গ্রাম এস্তানিওলে জন্ম নেওয়া কুবারসির বাবা ছিলেন পেশায় কাঠমিস্ত্রি। লামিনের পর স্পেনের ইতিহাসে দ্বিতীয় কনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে অভিষেক হয়েছিল তাঁর। বার্সেলোনায় তাঁর অভিষেকের পর তৎকালীন কোচ জাভি হার্নান্দেজ বলেছিলেন, ‘আমি যখন ওর খেলা দেখি, তখন আমার হার্ট রেট একটুও বাড়ে না।’ অর্থাৎ, সে খুব শান্ত!
পর্তুগালের বিপক্ষে ৭১টি পাসের ৩৪টিই তিনি দিয়েছেন প্রতিপক্ষের অর্ধে, পাসিং অ্যাকুরেসি ছিল ৯৬ শতাংশ! সেই সঙ্গে ছিল ১৯টি রিকভারি আর ২৩টি ডিফেন্সিভ অ্যাকশন। এত দ্রুত এতগুলো ক্লিন শিটের মুখ একমাত্র কিংবদন্তি পাওলো মালদিনিই দেখতে পেরেছিলেন।
স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে কুবারসি ও লাপোর্তের জুটিকে ‘বিলাসবহুল’ আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, শুধু কৌশলগত দিক দিয়ে ভালো হলেই হয় না, ১৯ বছর বয়সেও এমন আবেগীয় নিয়ন্ত্রণ রাখাটাই কুবারসিকে আলাদা করেছে।
তবে স্পেনের এই রক্ষণাত্মক সাফল্যের পেছনে পুরো দলেরই অবদান আছে। দানি ওলমোর ভাষায়, ‘আমরা সবাই একসঙ্গে আক্রমণ করি, সবাই একসঙ্গে রক্ষণ সামলাই।’ স্পেন কতটা উঁচুতে উঠে আগ্রাসী প্রেসিং করে, তা নিয়ে বেলজিয়ামের গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া আগেই সতর্ক করেছিলেন। স্ট্রাইকার মিকেল ওইয়ারজাবাল জানান, তাঁদের লক্ষ্যই থাকে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের চিন্তা করার সময় না দেওয়া। আর মিডফিল্ডার মেরিনো যোগ করেন, ‘আপনি যদি ক্লিন শিট রাখতে পারেন, তবে ভালো একটা ফলাফল আসার নিশ্চয়তা এমনিতেই তৈরি হয়ে যায়।’
২০১০ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে নকআউট পর্বে স্পেন কোনো গোল হজম করেনি। সেবার ইকার ক্যাসিয়াস টানা চার ম্যাচে জাল অক্ষত রেখেছিলেন। সেই ক্যাসিয়াসকেও এবার পেছনে ফেলেছেন স্পেনের বর্তমান খলনায়ক সিমন। আজ কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে স্পেনের এই জমাট রক্ষণ ভাঙাটাই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। সিমন ও তাঁর দলের এই দুর্ভেদ্য দেয়াল কি আজও অটুট থাকবে? নাকি বেলজিয়াম পারবে স্প্যানিশ দুর্গে ফাটল ধরাতে? উত্তরের জন্য অপেক্ষা আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।



