বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আজ (১৫ জুলাই) মাঠে নামবে স্পেন ও ফ্রান্স। সব ঠিক থাকলে এই ম্যাচেও স্পেনের হয়ে মাঠে নামবে ১৯ নম্বর জার্সি পরা ১৯ বছর বয়সী লামিন ইয়ামাল। এই বয়সেই ইউরো জয় করেছেন, বার্সেলোনার মতো ক্লাবে কোটি টাকার চুক্তি করেছেন আর এখন বিশ্বকাপের মঞ্চে দাপট দেখাচ্ছেন ।
পুরো ফুটবল বিশ্ব এখন তার বন্দনায় মেতেছে। কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না, লামিন ইয়ামাল নামের পেছনে লুকিয়ে আছে এক অন্য রকম আবেগ এবং তাঁর চরম দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানো দুজন রহস্যময় মানুষের গল্প।

স্পেনের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী মানুষের নামের দুটি অংশ থাকে। একটি আসে বাবার কাছ থেকে, আরেকটি মায়ের কাছ থেকে। ইয়ামালের ক্ষেত্রেও তা-ই। তার পাসপোর্টে পুরো নাম লেখা ‘লামিন ইয়ামাল নাসরাওই এবানা’। বাবা মুনির নাসরাওই এসেছেন মরক্কো থেকে, আর মা শেইলা এবানা নিরক্ষীয় গিনি থেকে। তবে ইয়ামাল তার ক্লাবের সাবেক কোচ জাভি বা সতীর্থ পেদ্রির মতোই শুধু নিজের প্রথম নামটুকু ব্যবহার করে।
আরবিতে লামিন শব্দের অর্থ বিশ্বস্ত বা সৎ। এই শব্দটি এসেছে ‘আল আমিন’ থেকে। আর ইয়ামাল হলো জামাল নামেরই একটি ভিন্ন রূপ, যার অর্থ সৌন্দর্য বা লাবণ্য। মাঠে ছেলেটার জাদুকরী খেলা দেখলে আপনি নিশ্চয়ই একবাক্যে স্বীকার করবেন যে, নামের অর্থের সঙ্গে তার খেলার দারুণ মিল!
২০০৭ সালের জুলাইয়ে যখন এই শিশুটির জন্ম হয়, তখন তার মা এবানার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। এই অল্প বয়সে বাবা-মা হওয়ার কারণে ইয়ামালের পরিবারকে চরম আর্থিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। সংসার চালানো, নতুন অতিথির দায়িত্ব নেওয়া; সব মিলিয়ে এক দিশেহারা অবস্থা।
এমন কঠিন সময়ে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন দুই পারিবারিক বন্ধু। তারা নিঃস্বার্থভাবে ইয়ামালের বাবা-মাকে আর্থিক ও মানসিকভাবে সাহায্য করেছিলেন। সেই দুই বন্ধুর একজনের নাম ছিল লামিন, অন্যজনের নাম ইয়ামাল। বিপদের দিনে এই দুই বন্ধুর এমন উপকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই বাবা-মা তাদের সদ্যোজাত সন্তানের নাম রাখেন লামিন ইয়ামাল।

ইয়ামাল এখন আর সেই অভাবের সংসারে নেই। মাত্র পাঁচ মাস বয়সেই লিওনেল মেসির সঙ্গে তার ছবি তোলা হয়েছিল, যা এখন রীতিমতো ভাইরাল! ১২ বছর বয়সে সে বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়া একাডেমিতে যোগ দেয়। ২০২৪ সালে স্পেনের হয়ে জিতেছে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ। ২০২৫ সালে বার্সার সঙ্গে তার যে নতুন চুক্তি হয়েছে, তা থেকে সে বছরে প্রায় ৪০ মিলিয়ন ইউরো আয় করে। সঙ্গে অ্যাডিডাস, কোকা-কোলা, আমেরিকান ইগল বা ভিসার মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের স্পনসরশিপ তো আছেই।
কিন্তু এত সফলতার পরও ইয়ামাল নিজের অতীত ভুলে যায়নি। স্পেনের কাতালান শহরের মাতরো এলাকার রোকোফনদা নামে এক দরিদ্র পাড়ায় তার বেড়ে ওঠা। স্পেনের সবচেয়ে দরিদ্র এলাকাগুলোর একটি এটি। গোল করার পর ইয়ামাল প্রায়ই হাতের আঙুল দিয়ে ৩০৪ চিহ্ন দেখায়। এটি মূলত রোকোফনদার পোস্টকোডের শেষ তিন অঙ্ক!

ইয়ামাল আজ বিশ্বের অন্যতম বড় তারকা। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে দুজনের নামে তার এই নাম, সেই লামিন ও ইয়ামাল নামের দুই বন্ধুর পরিচয় আজ পর্যন্ত কেউ জানতে পারেনি!
ফুটবলার ইয়ামাল নিজে কখনো তাদের নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি, আর তার বাবা-মাও সংবাদমাধ্যমে সেই বন্ধুদের আসল পরিচয় গোপন রেখেছেন। হয়তো ওই দুই বন্ধু নিজেদের আড়ালেই রাখতে পছন্দ করেন। হয়তো তাঁরা চান না ইয়ামালের ওপর থেকে আলো সরে গিয়ে তাঁদের ওপর পড়ুক। অথবা প্রায় দুই দশক আগের সেই কঠিন দিনগুলোর স্মৃতি তাঁরা আর নতুন করে সামনে আনতে চান না।
পরিচয় গোপন থাকুক বা না থাকুক, আজ রাতে যখন বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে বল পায়ে ইয়ামাল ম্যাজিক দেখাবেন, তখন পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে বসে সেই দুই বন্ধু নিশ্চয়ই গর্বে বুক ফুলিয়ে হাসবেন। ১৯ বছর আগে এক অসহায় দম্পতির পাশে দাঁড়িয়ে তাঁরা যে বদান্যতা দেখিয়েছিলেন, আজ তা পুরো বিশ্বের কাছে এক বিস্ময় হয়ে ফিরে এসেছে!
সূত্র: দ্য অ্যাথলেটিক
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।



