Qazi Akash Logo
কাজী আকাশ

বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলা হয় কেন

কাজী আকাশ১৮ জুলাই, ২০২৬৬ মিনিট

বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটিকে ফুটবল দুনিয়ায় দুই চোখে দেখা হয়। কারও কাছে এটি এমন এক ম্যাচ, যা কোনো দলই খেলতে চায় না। আবার কারও কাছে এটি দারুণ এক সান্ত্বনা পুরস্কার কিংবা খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত রেকর্ড ভারী করার এক মোক্ষম সুযোগ।

১৯ জুলাই মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে ২০২৬ বিশ্বকাপের এমনই এক তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়া দুই পরাশক্তি ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত ৩টায়। ঠিক এর পরদিনই নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ফাইনালে লড়বে স্পেন ও আর্জেন্টিনা।

গত কাতার বিশ্বকাপেও আমরা এমন একটি ম্যাচ দেখেছিলাম, যেখানে মরক্কোকে ২-১ গোলে হারিয়ে তৃতীয় হয়েছিল ক্রোয়েশিয়া এবং বেশ ঘটা করেই তারা উদযাপন করেছিল। কিন্তু ফিফা কেন এই ম্যাচ আয়োজন করে? আর কেনই বা অনেক কোচ এই ম্যাচটি একদমই পছন্দ করেন না? চলুন, পুরো বিষয়টি একটু সহজ করে বিশ্লেষণ করা যাক।

**** 

কেন খেলা হয় এই ম্যাচ

ফিফার দিক থেকে চিন্তা করলে, বিশ্বকাপের প্রতিটি অতিরিক্ত ম্যাচ মানেই বাড়তি আয়। টিকিট বিক্রি, স্পনসরশিপ আর টিভি সম্প্রচার স্বত্ব থেকে আয়োজক শহর এবং ফিফার পকেটে ঢোকে বিপুল পরিমাণ অর্থ। তা ছাড়া সেমিফাইনাল এবং ফাইনালের মাঝখানে যে কয়েক দিনের গ্যাপ থাকে, সেই সময়টাতে সম্প্রচারকদের দেখানোর মতো বড় একটি ম্যাচ দরকার হয়।

শুধু টাকাপয়সাই নয়, এখানে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়েরও বড় একটা হিসাব আছে। যেকোনো আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচের চেয়ে বিশ্বকাপের এই ম্যাচটির গুরুত্ব অনেক বেশি। সেমিফাইনালে হারের হতাশা ভুলে কোনো দল যদি এই ম্যাচটি জেতে, তবে বিশ্ব র‍্যাঙ্কিংয়ে তারা বেশ কিছুটা এগিয়ে যায়। এই র‍্যাঙ্কিং তাদের নেশনস লিগের অবস্থান এমনকি পরের বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের ড্রতেও দারুণ সুবিধা দিতে পারে। অলিম্পিক গেমসের ব্রোঞ্জ পদক জয়ের যে রোমাঞ্চ, ফিফাও মূলত সেই ধারণাতেই এই ম্যাচটির আয়োজন করে।

**** 

কবে থেকে শুরু হয়েছে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ

১৯৩৪ সালে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় আসরে প্রথমবারের মতো এই ম্যাচটি চালু হয়, যেখানে অস্ট্রিয়াকে ৩-২ গোলে হারিয়েছিল জার্মানি।

তবে ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে কিন্তু এমন কোনো ম্যাচ ছিল না। সেবার সেমিফাইনালে হেরে বিদায় নেওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও যুগোস্লাভিয়াকে আর মাঠে নামতে হয়নি। গোল ব্যবধানে এগিয়ে থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে তৃতীয় ঘোষণা করা হয়েছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, সেবার দুই দলের অধিনায়ককেই মেডেল দেওয়া হয়েছিল! ১৯৩৮ সালেও এই ম্যাচ খেলা হয়, তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫০ সালের আসরে রাউন্ড-রবিন পদ্ধতি থাকায় এটি আর অনুষ্ঠিত হয়নি। এরপর ১৯৫৪ সাল থেকে এটি বিশ্বকাপের নিয়মিত অংশ হয়ে যায় (যদিও উয়েফা ১৯৮০ সালের পর থেকে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে এই ধারণাটি বাতিল করে দিয়েছে)।

এই ম্যাচটিতে অনেক ঐতিহাসিক রেকর্ডও গড়া হয়েছে। যেমন ২০০২ সালের বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে মাত্র ১১ সেকেন্ডে গোল করেছিলেন তুরস্কের হাকান সুকুর, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখনো সবচেয়ে দ্রুততম গোল। আবার ১৯৫৮ সালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ৬-৩ গোলের জয়ে একাই চার গোল করেছিলেন ফরাসি কিংবদন্তি জাস্ট ফন্টেইন। ওই এক আসরেই তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১৩-তে, যা এক বিশ্বকাপে কোনো একক খেলোয়াড়ের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড হিসেবে আজও টিকে আছে!

**** 

পুরস্কার হিসেবে কী মেলে

না, এই ম্যাচ জিতলে কোনো ট্রফি পাওয়া যায় না। তবে বিজয়ী দলের খেলোয়াড়দের গলায় ব্রোঞ্জ মেডেল পরিয়ে দেওয়া হয়। সবচেয়ে বড় পার্থক্যটা গড়ে দেয় আর্থিক পুরস্কার। যে দল তৃতীয় হয়, তারা পায় ২৯ মিলিয়ন ডলার। আর হেরে যাওয়া দল অর্থাৎ চতুর্থ স্থান অধিকারী দল পায় ২৭ মিলিয়ন ডলার। মানে মাত্র এক ম্যাচের জয়েই ২ মিলিয়ন ডলারের পার্থক্য, প্রায় ২৫ কোটি টাকা!

ব্রোঞ্জ মেডেল জয়ের দিক থেকে সবচেয়ে সফল দল চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানি। তারা রেকর্ড সর্বোচ্চ চারবার এই ব্রোঞ্জ মেডেল জিতেছে।

খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত অর্জনের জন্যও ম্যাচটি দারুণ। ইউসেবিও (১৯৬৬), টোটো শিলাচি (১৯৯০), দাভোর সুকার (১৯৯৮) এবং টমাস মুলারের (২০১০) মতো তারকারা এই ম্যাচটিতে গোল করেই নিজেদের গোল্ডেন বুট নিশ্চিত করেছিলেন। এবারের আসরেও কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং হ্যারি কেনের সামনে সুযোগ থাকছে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে নিজেদের আরেকটু এগিয়ে নেওয়ার।

**** 

এই ম্যাচ নিয়ে কোচ ও খেলোয়াড়দের এত বিরক্তি কেন

ইতিহাস বা প্রাইজমানি যা-ই থাকুক না কেন, অনেক বিখ্যাত কোচই এই ম্যাচের চরম বিরোধী। ২০১৪ সালে ব্রাজিলকে ৩-০ গোলে হারিয়ে তৃতীয় হওয়া নেদারল্যান্ডস দলের তৎকালীন কোচ লুই ফন গাল বলেছিলেন, ‘আমার মনে হয় এই ম্যাচটা একেবারেই খেলা উচিত নয়। এটা চরম অবিচার। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এখানে আপনার টানা দুই ম্যাচ হেরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এত দারুণ একটা টুর্নামেন্ট খেলার পর আপনাকে হয়তো একজন পরাজিত মানুষ হিসেবে বাড়ি ফিরতে হবে!’

সাবেক ইংলিশ কোচ গ্যারেথ সাউথগেটও ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে সেমিফাইনালে হারের পর বলেছিলেন, ‘এটি এমন একটি ম্যাচ, যা কোনো দলই খেলতে চায় না।’ মজার ব্যাপার হলো, সাবেক ইংলিশ স্ট্রাইকার অ্যালান শিয়ারার সেই ম্যাচের আগে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করেছিলেন, ‘তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান নির্ধারণী ম্যাচটা একটা নিরেট বোকামি। কোনো খেলোয়াড়ই এটা চায় না।’

এ কারণেই অনেক দল এই ম্যাচটাকে খুব একটা সিরিয়াসলি নেয় না। ১৯৮২ ও ১৯৮৬ সালে ফ্রান্স তাদের কিংবদন্তি অধিনায়ক মিশেল প্লাতিনিকে এই ম্যাচে মাঠে নামায়নি। কোচেরা সাধারণত এই ম্যাচে দলের মূল তারকাদের বসিয়ে রেখে বেঞ্চের খেলোয়াড়দের সুযোগ দেন।

অবশ্য সবার কাছে বিষয়টা এমন নয়। ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে সুইডেন যখন রূপকথার জন্ম দিয়ে সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল এবং পরে বুলগেরিয়াকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে তৃতীয় হয়েছিল, তখন তারা দারুণ উদ্‌যাপন করেছিল। ১৯৯৮ সালে ক্রোয়েশিয়া প্রথমবারের মতো স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ খেলতে এসেই তৃতীয় হয়ে দেশে ফেরার পর তাদেরও বীরের মতো বরণ করা হয়েছিল।

তবে আপনি যদি কোনো দলের সমর্থক না হয়ে শুধু একজন সাধারণ দর্শক হন, তবে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের ম্যাচটি আপনার জন্য দারুণ উপভোগ্য হতে পারে। কারণ পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৭৪ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে পোল্যান্ডের ১-০ গোলের জয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রতিটি তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেই অন্তত দুটি বা তার বেশি গোল হয়েছে!

 

সূত্র: দ্য অ্যাথলেটিক

আপনার মতামত জানান

মন্তব্যসমূহ

লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।

লোড হচ্ছে
এখনও কোনো মন্তব্য নেই।