
স্কুলের জ্যামিতি ক্লাসের কথা মনে আছে? চাঁদা, কম্পাস ও স্কেল দিয়ে খাতায় নিখুঁত ত্রিভুজ বা চতুর্ভুজ আঁকার সেই দিনগুলো। আচ্ছা, সেই ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে যদি হঠাৎ একটা বানর এসে বসে পড়ত, কেমন হতো? নিশ্চয়ই হাসিতে ফেটে পড়তেন! বানর আবার জ্যামিতি বুঝবে কী! কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, হাসার দিন শেষ। আপনি জ্যামিতির আকার-আকৃতি যেভাবে বোঝেন, একটা বানরও ঠিক সেভাবেই বোঝে!
সম্প্রতি প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস বা পিএনএএস জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় উঠে এসেছে এই চমকপ্রদ তথ্য। আমরা মানুষেরা জ্যামিতিক বিভিন্ন আকৃতির বিমূর্ত বিষয়গুলো বেশ ভালোই বুঝি। যেমন, একটা জিনিস প্রতিসম কি না, এর দুটি বাহু সমান্তরাল কি না, কিংবা সেখানে সমকোণ আছে কি না, তা আমরা বুঝি। সবচেয়ে বড় কথা, একটা ত্রিভুজকে উল্টে দিলেও বা ছোট-বড় করলেও আমরা ঠিকই বুঝতে পারি যে ওটা ত্রিভুজই। মজার ব্যাপার হলো, আমাদের মতো বানরেরাও নাকি এসব অনায়াসেই ধরতে পারে!
কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির কগনিটিভ নিউরোসায়েন্টিস্ট জিয়ালিন লি এবং তাঁর দল এই গবেষণাটি করেছেন। দীর্ঘদিনের একটা ধারণা ছিল, এসব জ্যামিতিক হিসাব-নিকাশ বোঝার ক্ষমতা কেবল মানুষেরই আছে। আমাদের মস্তিষ্কই নাকি এ ক্ষেত্রে সেরা। কিন্তু জিয়ালিন লি সন্দেহ করলেন, গাণিতিক এই আকৃতি বোঝার জন্য মানুষ হয়তো ততটাও অনন্য নয়।
সত্যিটা যাচাই করতে বিজ্ঞানীরা দারুণ একটি পরীক্ষা করেছেন। গবেষণায় নেওয়া হয় আটটি বানর। সেই সঙ্গে যুক্ত করা হলো প্রি-স্কুলে পড়া কিছু শিশু এবং বিভিন্ন বয়সের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। সবার জন্য টাস্ক একটাই। স্ক্রিনে একটা নির্দিষ্ট আকৃতির জ্যামিতিক ছবি দেখানো হবে। তারপর অনেকগুলো ছবির ভেতর থেকে ঠিক ওই রকম দেখতে ছবিটা খুঁজে বের করতে হবে।
সঠিক ছবি মেলাতে পারলে সবার জন্যই ছিল পুরস্কার! বানরেরা পেয়েছে মজাদার খাবার, ছোট বাচ্চারা পেয়েছে সুন্দর স্টিকার আর বড়রা পেয়েছেন বাহবা। তবে ভুল করলেও বিজ্ঞানীরা খেয়াল রেখেছেন। কারণ মস্তিষ্ক আসলে কোন আকৃতিগুলো সহজে ধরতে পারে আর কোনগুলোতে বোকা বনে যায়, সেটা বোঝার জন্য ভুলগুলোও খুব জরুরি ছিল।
শিকাগো ইউনিভার্সিটির নিউরোবায়োলজিস্ট ডেভিড ফ্রিডম্যান এই গবেষণায় যুক্ত ছিলেন না, কিন্তু তিনি জানান, এই মেলানোর কাজটা মূলত মস্তিষ্কের দেখা এবং বোঝার ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। শুধু বাহু দেখলেই হয় না, আকৃতিটার একটা সম্পূর্ণ কাঠামোও মস্তিষ্কে তৈরি হতে হয়। আর এখানেই দেখা গেল দারুণ এক মিল। বানর থেকে শুরু করে শিশু বা বয়স্ক মানুষ; সবাই জ্যামিতিক আকার, কোণ, অনুপাত এবং প্যাটার্নের মধ্যে চমৎকারভাবে সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।
শুধু বানরই নয়, আইওয়া ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী এড ওয়াসেরম্যানের মতে পৃথিবীতে আরও অনেক প্রাণীই জ্যামিতির এই মারপ্যাঁচ বুঝতে পারে। যেমন, কবুতর! আকাশে ওড়ার সময় দিক ঠিক রাখতে তারা কিছু ক্ষেত্রে জ্যামিতিক আকৃতি মেলানোর কাজে মানুষের চেয়েও বেশি পারদর্শী। এমআইটির নিউরোসায়েন্টিস্ট আর্ল মিলার তো হেসেই উড়িয়ে দিলেন মানুষের এই অহংকার, ‘আমরা মানুষেরা নিজেদের একটু বেশিই স্পেশাল মনে করি। একটা বস্তুকে সামান্য বাঁকা করে ধরলেই যদি সেটাকে সম্পূর্ণ নতুন কিছু মনে হতো, তবে তো জীবন একেবারে বিশৃঙ্খল হয়ে যেত!’
তাহলে এই গবেষণার লাভ কী? বিজ্ঞানীরা এখন পরের ধাপে পা বাড়াচ্ছেন। তাঁরা খুঁজছেন, ঠিক কোন ধরনের জ্যামিতিক আকৃতিগুলো মানুষ ও বানর উভয়ের জন্যই চিনতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয়। এই রহস্যের সমাধান হয়ে গেলে হয়তো আমাদের জ্যামিতি বইয়ের সবচেয়ে কঠিন ও একঘেয়ে অধ্যায়গুলো আরও সহজে শেখানোর নতুন কোনো উপায় বের করে ফেলবেন শিক্ষকেরা!
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।


