ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ কেন মহাকাশে পাঠানো হলো, কে এই ন্যান্সি

ঘড়ির কাঁটায় তখন বাংলাদেশ সময় বিকেল ৫টা ২৬ মিনিট। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অবস্থিত কেপ ক্যানাভেরালের কাছে নাসার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে আকাশ কাঁপিয়ে গর্জে উঠল স্পেসএক্সের দানবীয় রকেট ফ্যালকন হেভি। রকেটটির ২৭টি মার্লিন ইঞ্জিন একসঙ্গে জ্বলে উঠে ৫০ লাখ পাউন্ডেরও বেশি থ্রাস্ট তৈরি করল। সেই প্রচণ্ড ধাক্কায় পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে মহাকাশের দিকে ছুটে গেল নাসার সর্বাধুনিক টেলিস্কোপ ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ। মাটি ছাড়ার ঠিক চার মিনিট পরেই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল পেরিয়ে ফার্স্ট টেস্ট অব স্পেস পেয়ে যায় যন্ত্রটি।
কোথায় যাচ্ছে এই রোমান টেলিস্কোপ? এর গন্তব্য হলো সেকেন্ড ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট। সংক্ষেপে একে বলতে পারেন L2। সূর্য থেকে দেখলে মনে হবে, জায়গাটি পৃথিবীর ঠিক পেছনে, প্রায় ৯ লাখ ৩২ হাজার মাইল দূরে অবস্থিত। মহাশূন্যের এই পার্কিং স্পটে একবার পৌঁছে গেলে, নতুন এই টেলিস্কোপটি আমাদের পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বের চেয়েও প্রায় চার গুণ বেশি দূরে অবস্থান করবে।
মজার ব্যাপার হলো, মহাকাশে যাওয়ার আগেই নাসা দারুণ একটি ক্যাম্পেইন চালু করেছিল, যার নাম অ্যাডাপ্ট আ পিক্সেল। এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে যে কেউ চাইলে রোমান টেলিস্কোপের তোলা প্রথম ছবিগুলোর যেকোনো একটি পিক্সেল নিজের নামে দাবি করতে পারেন। আবেদনকারীদের একটি নির্দিষ্ট পিক্সেল নম্বর দেওয়া হবে, যা দিয়ে তাঁরা অনলাইনে সার্চ করতে পারবেন এবং চাইলে প্রিন্ট করার মতো একটি ডিজিটাল সার্টিফিকেটও পেয়ে যাবেন। আপনিও কিন্তু চাইলে এমন একটি পিক্সেলের মালিকানা দাবি করে দেখতে পারেন!
দুই
২০২০ সালে প্রথম এই প্রজেক্টের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এরপর নানা চড়াই-উতরাই পেরোতে হয়েছে। এমনকি ২০২৫ সালের দিকে তো একবার বাজেট সংকটে পড়ে প্রজেক্টটি প্রায় বাতিলই হতে বসেছিল! সব বাধা পেরিয়ে অবশেষে এটি আলোর মুখ দেখল।
এর মূল মিশন কী? জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ধারণা, রোমান টেলিস্কোপ প্রায় ১০০ কোটি গ্যালাক্সির আলো পরিমাপ করবে। সেই সঙ্গে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে থাকা গ্রহ ব্যবস্থাগুলোর ওপর প্রথমবারের মতো একটি সম্পূর্ণ পরিসংখ্যানগত শুমারি চালাবে। অবলোহিত রশ্মির সাহায্যে মহাকাশবিদ্যা, এক্সোপ্ল্যানেট এবং ডার্ক ম্যাটার নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলা অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজবে এই টেলিস্কোপ। প্রাথমিক মিশনটি পাঁচ বছরের জন্য সাজানো হলেও, সবকিছু ঠিকঠাক চললে নাসা এর মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়িয়ে দিতে পারে।

রোমান টেলিস্কোপে কী কী যন্ত্রপাতি আছে, শুনবেন? এর প্রধান অস্ত্র হলো ৩০০.৮ মেগাপিক্সেলের এক বিশাল ক্যামেরা, যাকে বলা হচ্ছে ওয়াইড ফিল্ড ইনস্ট্রুমেন্ট। এর সঙ্গে আছে প্রিজম, সেলফ-ফ্লেক্সিং আয়না (যা নিজে থেকে বাঁকতে পারে), মাস্ক এবং সেন্সরের সমন্বয়ে তৈরি একটি বিশেষ সিস্টেম। এই সিস্টেমের নাম করোনাগ্রাফ। দূরবর্তী কোনো নক্ষত্রের তীব্র আলো আটকে দিয়ে তার চারপাশে ঘুরতে থাকা অনুজ্জ্বল গ্রহগুলোর দিকে ফোকাস করতে এই করোনাগ্রাফ দারুণ কাজে আসবে।
টেলিস্কোপটির মূল আয়নাটি প্রায় ৮ ফুট চওড়া। এর সঙ্গে থাকা অন্যান্য যন্ত্রপাতির কল্যাণে এটি হাবল টেলিস্কোপের চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ বেশি বিস্তৃত দেখার জায়গা পাবে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর আয়নাটি হাবল টেলিস্কোপের আয়নার সমান বড় হলেও আধুনিক প্রযুক্তির কারণে এর ওজন হাবলের চেয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ কম!
আরেকটা দারুণ মানবিক ছোঁয়া আছে এই মিশনে। রোমান টেলিস্কোপের ভেতরে একটি স্মারক মেমোরি কার্ড পাঠানো হয়েছে, যাতে সারা বিশ্বের ১৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষের নাম খোদাই করা আছে। নাসা প্রকাশিত আর্টেমিস-২ চন্দ্রাভিযানে তোলা চাঁদের চমৎকার সব ছবি আমাদের মহাকাশ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। সেই আর্টেমিস-২ এবং আর্টেমিস-৩ মিশনের নভোচারীদের নামও কিন্তু রাখা আছে এই মেমোরি কার্ডে! এমনকি গত এপ্রিলে আর্টেমিস-২ মিশনের জন্য আলাদা করে আরেকটি স্পেশাল মেমোরি কার্ডেও অনেকের নাম যুক্ত করা হয়েছিল।
তিন
এবার আসি সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক অংশে—কে এই ন্যান্সি?
টেলিস্কোপটির নামকরণ করা হয়েছে ন্যান্সি গ্রেস রোমানের সম্মানে। তিনি ছিলেন নাসার প্রথম প্রধান জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং মহাকাশে অরবিটাল মানমন্দির তৈরির সবচেয়ে বড় প্রবক্তা। সারা বিশ্বে তিনি মাদার অব হাবল হিসেবে পরিচিত। একসময় হাবল টেলিস্কোপ প্রজেক্টটি চরম বিতর্কের মুখে পড়েছিল। তখন এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে ন্যান্সি যে লড়াকু ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে।

হাবল সম্পর্কে তিনি একবার গর্ব করে বলেছিলেন, ‘হাবল জ্যোতির্বিজ্ঞানকে আগের চেয়ে অনেক বেশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। এর যে অস্তিত্ব আছে, এটা ভেবেই আমি গর্ববোধ করি।’
ন্যান্সির জ্যোতির্বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা কিন্তু বড় হয়ে তৈরি হয়নি, শুরু হয়েছিল সেই ছোটবেলাতেই। যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদার রেনোতে থাকার সময়, মাত্র ১১ বছর বয়সেই তিনি ক্লাসমেটদের নিয়ে একটা আস্ত অ্যাস্ট্রনমি ক্লাব খুলে বসেছিলেন! এরপর মেরিল্যান্ডের বাল্টিমোরে একটি বিশেষ অ্যাক্সিলারেটেড প্রোগ্রামের মাধ্যমে এক বছর আগেই হাইস্কুলের গণ্ডি পার হন তিনি।
তবে জ্যোতির্বিজ্ঞানের মতো একটি পুরুষশাসিত জগতে নারীদের প্রবেশ সে যুগে মোটেও সহজ ছিল না। পদে পদে তাঁকে বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। একপর্যায়ে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো থেকে তাঁকে চাকরিও ছেড়ে দিতে হয়েছিল! কারণটা শুনলে হয়তো আপনার মেজাজ খারাপ হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাঁকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল, নারী হওয়ার কারণে তাঁকে কখনোই স্থায়ী করা হবে না। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্রী ছিলেন না ন্যান্সি। তাঁর অদম্য জেদ আর চেষ্টার ফলেই হাবল স্পেস টেলিস্কোপ বাস্তবে রূপ নিয়েছিল, যা পরে ডার্ক ম্যাটার শনাক্ত করতে সাহায্য করে। ন্যান্সির মতে, এটাই ছিল হাবল প্রোগ্রামের সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কার।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, রোমানের তোলা প্রথম ছবিগুলো কবে দেখতে পাব আমরা?
এর জন্য আমাদের ২০২৭ সালের প্রথম দিক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আগামী তিন মাস ধরে নাসার বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ধাপে ধাপে টেলিস্কোপটির বিভিন্ন অংশ মহাকাশে খুলবেন, ক্যালিব্রেশন করবেন এবং নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবেন। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে এটি তার নির্দিষ্ট কক্ষপথে গিয়ে পুরোদমে কাজ শুরু করবে। আগামী অন্তত পাঁচটি বছর এটি আমাদের মহাবিশ্বের এমন সব অজানা গল্প শোনাবে, যা হয়তো আমাদের কল্পনার জগতেও কখনো আসেনি!
সূত্র: পপুলার সায়েন্স ও নাসা
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।



