সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের এক তরুণ দাবি করেছেন, তিনি মহাকর্ষ বল কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করার একটি যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন। সেই যন্ত্র থেকে নাকি কোনো রকম জ্বালানি ছাড়াই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে বা যাবে!

খবরটি ভাইরাল হওয়ার পর থেকে মানুষের আলোচনা-সমালোচনার কোনো সীমা নেই। অনেকেই বলছেন, ‘এমন আবিষ্কার আমাদের দেশকে বদলে দেবে’, ‘এখন থেকে বিনা মূল্যে বিদ্যুৎ মিলবে’ টাইপের কথা। তবে বেশিরভাগ মানুষ এই কথার উল্টোটা বলছেন। অর্থাৎ আলোচনার চেয়ে সমালোচনা বেশি হচ্ছে। সাধারণ মানুষের এই আবেগ ও উচ্ছ্বাসকে আমি সম্মান করি। নতুন কিছু করার প্রতি তরুণদের এই আগ্রহ অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু বিজ্ঞানের জগতে আবেগের চেয়ে যুক্তির ধার বেশি। বিজ্ঞান কাজ করে কিছু অলঙ্ঘনীয় নিয়মের ওপর ভিত্তি করে, যা মহাবিশ্বের প্রতিটি ধূলিকণা থেকে শুরু করে গ্যালাক্সি পর্যন্ত মেনে চলতে বাধ্য।
প্রশ্ন হলো, মহাকর্ষ বল ব্যবহার করে কি আসলেই বিনা মূল্যের বিদ্যুৎ তৈরি করা সম্ভব? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের একটু পেছনের দিকে তাকাতে হবে, ইতিহাসের পাতা উল্টাতে হবে। কারণ, এই চেষ্টা পৃথিবীতে এবারই প্রথম নয়।
পারপেচুয়াল মোশন মেশিন
বিনা জ্বালানিতে বা একবার চালু করে দিলে অনন্তকাল ধরে চলতে থাকবে; এমন যন্ত্রের স্বপ্ন মানুষ আজ থেকে দেখছে না। এই কাহিনি শত শত বছরের পুরোনো। বিজ্ঞানের ভাষায় এই কাল্পনিক যন্ত্রগুলোকে বলা হয় পারপেচুয়াল মোশন মেশিন।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১১৫৯ সালে ভারতীয় গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ দ্বিতীয় ভাস্করাচার্য এমন একটি যন্ত্রের নকশা করেছিলেন। তাঁর নকশা করা চাকার পরিধিতে বাঁকা কিছু নল ছিল, যার ভেতরে অর্ধেক পারদ ভরা থাকত। তাঁর ধারণা ছিল, চাকাটা একবার ঘুরিয়ে দিলে পারদ এক পাশ থেকে অন্য পাশে গড়িয়ে পড়বে, ফলে চাকার এক পাশ সব সময় ভারী থাকবে এবং মহাকর্ষের টানে চাকাটি অনন্তকাল ধরে ঘুরতে থাকবে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।
এরপর ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ফরাসি স্থপতি ভিলার্ড ডি হনেকোর্ট একটি চাকার নকশা করেন, যার চারপাশে হাতুড়ির মতো ওজন ঝোলানো ছিল। চাকা ঘুরলে হাতুড়িগুলো একপাশে ছিটকে গিয়ে চাকাটিকে ঘোরানোর শক্তি জোগাবে বলে তিনি দাবি করেছিলেন। ১৬১৮ সালে রবার্ট ফ্লাড নামে এক ইংরেজ চিকিৎসক একটি পানির কলের নকশা করেন। তাঁর আইডিয়া ছিল, ওপর থেকে পানি পড়ে টারবাইন ঘুরবে, সেই টারবাইনের শক্তিতে একটি পাম্প চলবে, যা আবার পানিকে ওপরে তুলে দেবে! অর্থাৎ, একই পানি চক্রাকারে ঘুরে অনন্তকাল বিদ্যুৎ বা শক্তি জোগাবে।
এমনকি ১৭১২ সালে জোহান বেসলার নামে একজন দাবি করেছিলেন, তিনি এমন একটি চাকা বানিয়েছেন, যা শুধু মহাকর্ষের টানেই ঘোরে এবং ভারী পাথর তুলতে পারে। তিনি তাঁর যন্ত্রটিকে একটি তালাবদ্ধ ঘরে রেখে পরীক্ষা করার সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে জানা যায়, সেটি ছিল শুধু একটি ধোঁকাবাজি। দেয়ালের আড়াল থেকে তাঁর চাকর দড়ি টেনে চাকাটি ঘোরাতো!
ইতিহাসের এত এত মহারথীরা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা কেন সফল হলো না? উত্তরটা লুকিয়ে আছে পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সুন্দর নিয়মগুলোর মধ্যে—তাপগতিবিদ্যার সূত্র।
মহাকর্ষ কেন বিদ্যুতের জ্বালানি হতে পারে না
বিজ্ঞান কীভাবে কাজ করে, তা বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে মহাকর্ষ বলের চরিত্র বুঝতে হবে। মহাকর্ষ বা অভিকর্ষ একটি সংরক্ষণশীল বল। এ কথার মানে কী?
সহজ কথায়, একটি ১০ কেজি ওজনের পাথরকে মাটি থেকে ১০ মিটার ওপরে তুলতে আপনার ঠিক যতটুকু শক্তি খরচ হবে, পাথরটিকে নিচে ছেড়ে দিলে সেটি ঠিক ততটুকুই শক্তি ফেরত দেবে। এক বিন্দু বেশিও নয়, কমও নয়।
ধরা যাক, তরুণ উদ্ভাবক এমন একটি চাকা বানিয়েছেন, যেখানে ভারী ওজন নিচে পড়ার সময় চাকা ঘোরে এবং জেনারেটর চালিয়ে বিদ্যুৎ বানায়। ভালো কথা। ওজন নিচে পড়লে শক্তি তৈরি হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ওজনটা নিচে পড়ে গেলে তো চাকা থেমে যাবে! চাকাটিকে অনবরত ঘোরাতে হলে ওই ওজনকে আবার ১০ মিটার ওপরে তুলতে হবে।
এখানেই প্রকৃতির আসল খেলা। ওজনটাকে নিচে ফেলে আপনি যতটুকু বিদ্যুৎ পেলেন, ঠিক সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ বা শক্তি খরচ করেই আপনার ওজনটাকে আবার ওপরে তুলতে হবে। অর্থাৎ, দিন শেষে আপনার লাভের খাতা শূন্য! আপনি প্রকৃতি থেকে এক বিন্দুও ফ্রি শক্তি বের করে আনতে পারবেন না।
তাপগতিবিদ্যার প্রথম সূত্র আমাদের বলছে, শক্তি সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না, এটি কেবল এক রূপ থেকে অন্য রূপে বদলায়। অর্থাৎ, মহাবিশ্বে শক্তির মোট পরিমাণ নির্দিষ্ট। আপনি শূন্য থেকে শক্তি তৈরি করতে পারবেন না।
কেউ হয়তো বলতে পারেন, ‘আমি তো শূন্য থেকে শক্তি বানাচ্ছি না, আমি মহাকর্ষ শক্তিকে ব্যবহার করছি!’
ঠিক এখানেই আসে ঘর্ষণ নামে সেই অদৃশ্য খলনায়কের গল্প। বাস্তব পৃথিবীতে কোনো যন্ত্রই ১০০ ভাগ নিখুঁত নয়। চাকা যখন ঘোরে, তখন এর বিয়ারিংয়ে ঘর্ষণ তৈরি হয়। বাতাসের বাধা থাকে। ফলে ওজন নিচে পড়ার সময় যে শক্তি তৈরি হয়, তার একটা বড় অংশ তাপ হিসেবে নষ্ট হয়ে যায়।
তার মানে, পাথরটি নিচে পড়লে আপনি যদি ১০০ জুল শক্তি পান, ঘর্ষণ আর বাতাসের বাধার কারণে আপনি হয়তো জেনারেটরে বিদ্যুৎ পাবেন ৮০ জুল। বাকি ২০ জুল তাপ হয়ে বাতাসে হারিয়ে যাবে। এখন এই পাথরটিকে আবার আগের জায়গায় তুলতে আপনার দরকার ১০০ জুল শক্তি। কিন্তু আপনার হাতে আছে মাত্র ৮০ জুল! ফলে প্রতি চক্রে আপনার শক্তি কমতে থাকবে এবং কিছুক্ষণ পর যন্ত্রটি চিরতরে থেমে যাবে।
যে যন্ত্র বাইরে থেকে কোনো শক্তির জোগান ছাড়া নিজে নিজেই চলতে পারে এবং উল্টো আপনাকে বাড়তি শক্তি দিতে পারে, বিজ্ঞানের চোখে তা সম্পূর্ণ অসম্ভব।
তাহলে কাপ্তাই বাঁধে কীভাবে বিদ্যুৎ তৈরি হয়
অনেকের মনেই এই প্রশ্নটা জাগতে পারে। কাপ্তাইয়ে তো ওপর থেকে পানি নিচে ফেলেই টারবাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি হচ্ছে! সেখানেও তো মহাকর্ষ বল কাজ করছে, তাই না?
একদম ঠিক। কিন্তু কাপ্তাই বাঁধের ওই পানির আসল শক্তির উৎস মহাকর্ষ নয়, বরং সূর্য! কীভাবে? সূর্যের প্রচণ্ড তাপে সমুদ্র, নদী বা খালের পানি বাষ্প হয়ে আকাশে উড়ে যায়। এরপর মেঘ হয়ে তা পাহাড়ে বা উঁচু জায়গায় বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে। এই যে লাখ লাখ টন পানিকে পাহাড়ের চূড়ায় তুলে দেওয়া হলো, এই বিশাল কাজটা করল কে? সূর্য। সূর্য তার নিজের পারমাণবিক শক্তি খরচ করে পানিকে ওপরে তুলেছে।
কাপ্তাই বাঁধে যখন সেই পানি মহাকর্ষের টানে নিচে পড়ে, তখন আমরা আসলে সূর্যের দেওয়া ওই শক্তিটাকেই বিদ্যুতে রূপান্তর করি। মহাকর্ষ এখানে কেবল একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে, শক্তির মূল উৎস হিসেবে নয়।
শক্তি সঞ্চয়, শক্তি উৎপাদন নয়
আধুনিক বিশ্বে বিজ্ঞানীরা মহাকর্ষীয় ব্যাটারি নিয়ে কাজ করছেন। যেমন, এনার্জি ভল্ট। এটি কীভাবে কাজ করে? দিনের বেলা যখন সোলার প্যানেল বা উইন্ডমিলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ তৈরি হয়, তখন সেই অব্যবহৃত বিদ্যুৎ দিয়ে ক্রেনের সাহায্যে বিশাল বিশাল কংক্রিটের ব্লক ওপরে তুলে রাখা হয়। রাতের বেলা যখন সোলার প্যানেল কাজ করে না, তখন ওই ব্লকগুলোকে ধীরে ধীরে নিচে নামতে দেওয়া হয়। ব্লক নিচে নামার সময় ক্রেনের মোটরটি জেনারেটর হিসেবে কাজ করে এবং বিদ্যুৎ ফেরত দেয়।
লক্ষ করুন, এটি কিন্তু কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নয়। এটি একটি ব্যাটারি। দিনের বেলা অন্য উৎস থেকে পাওয়া বিদ্যুৎ দিয়ে ব্লক তোলা হয়েছিল। মহাকর্ষ এখানে শুধু শক্তি জমিয়ে রাখার একটা উপায় মাত্র।
আসলে বিনা মূল্যে বিদ্যুৎ পাওয়ার শর্টকাট কোনো রাস্তা প্রকৃতির নিয়মে লেখা নেই। বিজ্ঞান কোনো জাদু নয় যে চাইলেই শূন্য থেকে শক্তি বের করে আনা যাবে। মহাবিশ্বের নিয়মগুলো অত্যন্ত নির্মম এবং নিখুঁত। তাই আবেগ দিয়ে নয়, যেকোনো দাবিকে বিজ্ঞানের কষ্টিপাথরে যাচাই করার মানসিকতা আমাদের তৈরি করতে হবে।
মনে রাখা প্রয়োজন, প্রকৃতি কখনো তার নিজের নিয়মের সঙ্গে বেইমানি করে না।
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।



