Qazi Akash Logo
কাজী আকাশ

ফোনের আসক্তি কমাতে সাহায্য করবে যেসব বই

কাজী আকাশ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬৭ মিনিট

একটা সময় ছিল, যখন রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে বই পড়া ছিল মানুষের অভ্যাস। আর এখন? এখন মানুষ নিজেকেই প্রবোধ দেয়, ‘এই তো, শুধু নোটিফিকেশনটা একটু চেক করেই ঘুমিয়ে পড়ব।’

ঠিক পাঁচ মিনিট পর দেখা যায়, সে হয়তো এমন কোনো ভিডিওতে বুঁদ হয়ে আছে, যেখানে টমেটোর মতো দেখতে একটা কাল্পনিক চরিত্র তার আলু-স্বামীর সঙ্গে প্রতারণা করছে! অথবা সে এমন কোনো সেলেব্রিটির কেলেঙ্কারির কথা জানছে, যা পরদিন সকাল হলেই ভুলে যাবে। হয়তো অপরিচিত দুজনের তর্কাতর্কি পড়ে নিজেকে বোঝাচ্ছে, কমেন্ট বক্সে এরপর কী হলো, সেটা না জানলে ঘুমই আসবে না!

যখন তার হুঁশ ফেরে, ঘড়িতে তখন হয়তো রাত একটা। এখানে সবচেয়ে খারাপ বিষয় কিন্তু সময় নষ্ট হওয়াটা নয়। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, গত এক ঘণ্টায় সে যা দেখেছে বা পড়েছে, তার অর্ধেকও তার মনে নেই। এই পরিস্থিতির সঙ্গে যদি আপনার একটুও মিল থাকে, তবে স্বাগত! আপনি একা নন।

ডুমস্ক্রোলিং বা অর্থহীনভাবে স্ক্রল করাটা এমন একটা অভ্যাস, যা কেউ নিজে থেকে তৈরি করতে চায়নি। মানুষ মূলত একঘেয়েমি, ক্লান্তি, কাজ ফেলে রাখা বা শুধু একটু বিরতির খোঁজেই ফোনটা হাতে নেয়। কিন্তু ওই যে ‘মাত্র পাঁচ মিনিট স্ক্রল করব’ বলে শুরু করা, সেটাই কখন যেন এক ঘণ্টার নিরর্থক কন্টেন্টে গিয়ে ঠেকে, যা খুব কম সময়ই কাউকে ভালো অনুভূতি দেয়।

তবে এখানে একটা মজার ব্যাপার আছে। মানুষ হয়তো আসলে স্ক্রল করতে আসক্ত নয়, তারা আসক্ত ‘গল্পে’। তা না হলে কেন লাখ লাখ মানুষ এমন অপরিচিতদের গল্প বা কাল্পনিক চরিত্র নিয়ে মাথা ঘামাবে, যাদের কথা এক দিন পরই ভুলে যাবে? শুনতে হাস্যকর লাগলেও, মানুষ আসলেই কয়েক মিনিটের জন্য হলেও জানতে চায়, এরপর কী হলো!

পার্থক্য হলো, স্ক্রল করে যেসব গল্প আমরা দেখি, সেগুলো দেখার মতোই দ্রুত হারিয়ে যায়। কিন্তু বইয়ের গল্পগুলো হারায় না। সেগুলো আমাদের মনোযোগ আদায় করে নেয়, মাথার ভেতর থেকে যায় এবং মাঝে মাঝে ফোন নামে যন্ত্রটির অস্তিত্বই ভুলিয়ে দেয়।

ডুমস্ক্রোলিং থেকে মুক্তি পেতে এবং নতুন করে বইয়ের জগতে ফেরার জন্য এমন কিছু বইয়ের খোঁজ আজ দেওয়া হলো, যেগুলো আপনাকে স্ক্রল করার বদলে পাতা উল্টাতে বাধ্য করবে। তবে শুরুতেই একটা ভয় ভেঙে দেওয়া ভালো। বই পড়া মানেই যে ৬০০ পৃষ্ঠার বিশাল কোনো উপন্যাস নিয়ে এক মাস ধরে বসে থাকতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। কোনো বই হয়তো ২০০ পৃষ্ঠারও কম, কোনোটি আবার ছোট গল্পের সংকলন। আসল লক্ষ্য হলো, গল্পের ভেতর হারিয়ে যাওয়ার সেই পুরোনো আনন্দটা ফিরে পাওয়া।

কিপ ইট ইন দ্য ফ্যামিলি - জন মার্স

যাঁদের মস্তিষ্কের ব্রেক ফেল করেছে, তাঁদের জন্য এই বই। আপনার মনোযোগের মেয়াদ যদি টিকটক ভিডিওর সমান হয়, তবে নির্দ্বিধায় এই বইটি হাতে তুলে নিতে পারেন। জন মার্স এই বইয়ে শুধু ক্লিফহ্যাঙ্গার, মানে উত্তেজনাকর মুহূর্ত লেখেননি, তিনি একে রীতিমতো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে এমন একটুখানি তথ্য দেওয়া থাকে যে বইটা বন্ধ করে রাখাই রীতিমতো বোকামি মনে হবে। আপনি যখনই ভাববেন, ‘আর এক চ্যাপ্টার পড়েই ঘুমাব’, তখনই তিনি এমন এক টুইস্ট হাজির করবেন, যা আপনার আগের সব ধারণা পাল্টে দেবে। বইটির গল্প আবর্তিত হয়েছে একটি পরিবার আর তাদের পুরোনো বাড়ি নিয়ে, যে বাড়ির গোপন রহস্যগুলো মাটির নিচেই থাকা উচিত ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ার অবিরাম নোটিফিকেশনের বদলে যদি এমন কিছু চান যা আপনাকে সত্যিই সন্তুষ্ট করবে, তবে এই বই আপনার জন্য।

দ্য সং অব অ্যাকিলিস - ম্যাডেলিন মিলার

যাঁরা কোনো অনুভূতিকে গভীরভাবে ছুঁতে চান, এটি তাঁদের জন্য। ম্যাডেলিন মিলার শত শত বছর ধরে শুনে আসা চরিত্রগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যা পড়লে মনে হবে এরা আমাদের চারপাশেরই মানুষ। অ্যাকিলিস এখানে শুধু একজন কিংবদন্তি যোদ্ধা নন, পেট্রোক্লাসও শুধু মিথলজিতে চাপা পড়া কোনো নাম নয়। তাঁদের বন্ধুত্ব এবং ভালোবাসার গল্প এত সুন্দর করে লেখা হয়েছে যে আপনি ভুলেই যাবেন, হাজার বছর আগের কোনো গল্প পড়ছেন। ডুমস্ক্রোলিংয়ের জগতে সবকিছু খুব দ্রুত চলে যায়—এক রিলের জায়গায় আরেক রিল আসে, এক মিমের জায়গায় আরেক মিম। কিন্তু বইয়ের আবেদন আলাদা। একটি ভালো বইয়ের কাহিনি ভুলে গেলেও তার অনুভূতিটা থেকে যায়। ডুমস্ক্রোলিং যা কখনো দিতে পারে না, এই বই আপনাকে সেই নীরব প্রশান্তিটুকু দেবে।

দ্য বেল জার - সিলভিয়া প্লাথ

ইন্টারনেটের কোলাহল যাঁদের ক্লান্ত করে তুলেছে, এই বই তাঁদের জন্য। প্রথমেই বলে রাখা ভালো, এটি কোনো দ্রুতগতির থ্রিলার নয়। প্রতি ২০ পৃষ্ঠায় বিস্ফোরক কোনো টুইস্টও এতে নেই। ঠিক সে কারণেই বইটি এই তালিকায় জায়গা পেয়েছে। ডুমস্ক্রোলিং আমাদের প্রতি মুহূর্তে নতুন কিছুর আশা করতে শেখায়। প্রতিটি সোয়াইপে নতুন মত, নতুন জোকস বা নতুন শিরোনামের লোভ থাকে। কিন্তু দ্য বেল জার সেরকম বই নয়। সিলভিয়া প্লাথ এই বইয়ে কোনো তাড়াহুড়ো করেননি। তিনি খুব সন্তর্পণে পাঠককে এস্থার গ্রিনউডের মানসিক জগতে নিয়ে যান, যে জগৎটা একই সঙ্গে বিষণ্ণ, চিন্তাশীল, তীক্ষ্ণ এবং বিশৃঙ্খল। এটি এমন এক বই, যার বাক্যগুলোর নিচে দাগ টেনে রাখতে ইচ্ছে করবে। আধুনিক জীবনের অবিরাম কোলাহলে ক্লান্ত পাঠকদের জন্য এটি এক অসাধারণ সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা হতে পারে।

দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ অব থর্নস - লেই বারদুগো

যাঁরা এই মুহূর্তে বিশাল কোনো উপন্যাসে ডুব দিতে নারাজ, তাঁদের জন্য এই বই। অনেক সময় বইয়ের তাকের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, ‘বই তো পড়তে চাই, কিন্তু এত মোটা বই পড়ার শক্তি নেই।’ এই বইটি ঠিক তাঁদের জন্যই। এটি কোনো গতানুগতিক উপন্যাস নয়, বরং ছয়টি ডার্ক ফেয়ারি টেল বা রূপকথার সংকলন। প্রতিটি গল্প আলাদা, তাই একসঙ্গে অনেক চরিত্র বা কয়েক শ পৃষ্ঠার চাপ মনে রাখার কোনো দরকার নেই। ঘুমানোর আগে একটা গল্প পড়া যেতে পারে, কিংবা সকালের চায়ের সঙ্গে আরেকটা। যখনই মন চাইবে ফোনে কোনো অ্যাপ খুলতে, তখনই এর একটা গল্প পড়া যায়। লেই বারদুগোর লেখার এমন এক জাদুকরী ক্ষমতা আছে, যা প্রতিটি গল্পকে প্রাচীন, মায়াবী আর একটু গা ছমছমে করে তোলে।

ফানি স্টোরি - এমিলি হেনরি

অন্যের জীবনের ড্রামা থেকে যাঁরা একটু বিরতি চান, এটি তাঁদের জন্য। ইন্টারনেট মাঝেমধ্যেই খুব ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। এই হয়তো কুকুরের ভিডিও দেখছেন, আবার পরক্ষণেই হয়তো কোনো অপরিচিত মানুষের ব্রেকআপের গল্পে আবেগে ভেসে যাচ্ছেন! কখনো কখনো বাস্তব দুনিয়ার এই বিশৃঙ্খলার বদলে কাল্পনিক দুনিয়ার বিশৃঙ্খলাকে বেছে নেওয়াটাই সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর। ফানি স্টোরি ঠিক সেই ধরনের এক আশ্রয়। বইটি খুব উষ্ণ, জোর করে হাসানোর চেষ্টা নেই। আবার চরিত্রগুলো এমন, যাঁদের সঙ্গে অনায়াসেই একটা সুন্দর বিকেল কাটানো যায়। সব বই পড়েই যে কাঁদতে হবে বা আবেগতাড়িত হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। কখনো কখনো এমন একটা বইয়েরও দরকার হয়, যা শেষে মুখে একটা হাসি ফুটিয়ে তোলে।**** 

উই হ্যাভ অলওয়েজ লিভড ইন দ্য ক্যাসল - শার্লি জ্যাকসন

যাঁরা একটু গা ছমছমে অস্বস্তিকর গল্প খুঁজছেন, এটি তাঁদের জন্য। ২০০ পৃষ্ঠারও কম এই বইটি পড়া শুরু করলে মনে হবে, এত কম পৃষ্ঠায় শার্লি জ্যাকসন এত চমৎকার এক আবহ কীভাবে তৈরি করলেন! এটি এমন কোনো ভৌতিক উপন্যাস নয়, যেখানে দরজার আড়ালে দানব লুকিয়ে থাকে। এখানকার ভয়টা অনেক নীরব, অনেক অদ্ভুত। বইটি পড়তে পড়তে একধরনের অস্বস্তি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকবে, এবং একপর্যায়ে মনে হবে, বইয়ের প্রতিটি বাক্যই যেন একটু অন্য রকম! ডুমস্ক্রোলিংয়ের একঘেয়েমি কাটাতে চাইলে এই বই সহজেই আপনার মনোযোগ কেড়ে নেবে। এটি পড়ার জন্য খুব বেশি সময়ের প্রয়োজন নেই, কিন্তু এর রেশ থেকে যাবে অনেক দিন।

কনভেনিয়েন্স স্টোর ওম্যান - সায়াকা মুরাতা

যাঁদের মস্তিষ্ক তথ্যে ঠাসা, তাঁদের জন্য এই বই। ২০০ পৃষ্ঠারও কম এই বইটির মধ্যে অদ্ভুত এক শান্তি আছে। বইটির গল্প আবর্তিত হয়েছে কেইকো নামে এক নারীকে ঘিরে, যিনি বছরের পর বছর একই কনভেনিয়েন্স স্টোরে কাজ করছেন এবং সমাজের চোখে ‘স্বাভাবিক’ জীবনের যে মাপকাঠি, তাতে তিনি কখনোই ফিট হতে পারেননি। গল্পটা শুনতে খুব সাধারণ মনে হলেও আসলে তা নয়। আমাদের চারপাশের জগত যখন প্রতিনিয়ত বলছে ‘আরও কেনো, আরও জানো, আরও কিছুক্ষণ স্ক্রল করো’; তখন এই বইটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, চোখের সামনের সাধারণ জীবনের দিকে নজর দেওয়ার মধ্যেও একধরনের সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে।

লেসনস ইন কেমিস্ট্রি - বনি গারমাস

যাঁরা নিউজফিডের মতোই আসক্তিকর কিন্তু আরেকটু বুদ্ধিদীপ্ত কিছু খুঁজছেন, এটি তাঁদের জন্য। মাঝেমধ্যে এমন কিছু বই আসে, যেগুলো আসলেই সব প্রশংসার যোগ্য। লেসনস ইন কেমিস্ট্রি তেমনই এক বই। এলিজাবেথ জট নামের এক নারী বিজ্ঞানীর গল্প এটি। যে সমাজ প্রতিনিয়ত তাকে ছোট করে দেখতে চায়, সেই সমাজে তার টিকে থাকার লড়াইটা একই সঙ্গে হতাশাজনক, অনুপ্রেরণাদায়ক এবং দারুণ মজাদার। ডুমস্ক্রোলিং আমাদের শুধু কন্টেন্ট গিলতে শেখায়, আর এই ধরনের বই আমাদের ভাবতে শেখায়। অ্যালগরিদম কেন আপনাকে মেঘের আকৃতির প্যানকেক বানানোর ভিডিও দেখাচ্ছে, সেটা নিয়ে এক ঘণ্টা ভাবার চেয়ে এলিজাবেথ জটের সঙ্গে একটা সন্ধ্যা কাটানো অনেক বেশি আনন্দের!

ডুমস্ক্রোলিং কি আসলেই ভালো

সত্যি বলতে, পুরোপুরি হয়তো হয় না। এখনো হয়তো অনেকেই অবচেতনভাবে ফোনের লক খোলেন কিংবা হঠাৎ কোনো অজানা দুনিয়ায় হারিয়ে যান। শুরুতে যে বলেছিলাম, টমেটো নারীর সঙ্গে আলু স্বামীর প্রতারণার গল্প! । কিন্তু এই বইগুলো পড়লে আপনি অনুভব করবেন, মানুষ আসলে স্ক্রল করাকে ভালোবাসে না, মানুষ গল্প ভালোবাসে।

পার্থক্য হলো, একটি ভালো বইয়ের গল্প শেষ পৃষ্ঠা উল্টানোর পরও অনেক দিন সঙ্গে থেকে যায়। চরিত্রগুলো মনে থাকে, তাদের বলা কথাগুলো মাথার ভেতর ঘোরে। কখনো কখনো সেই বইয়ের কথা অচেনা কাউকে বলতেও ইচ্ছে করে। গত মঙ্গলবার দেখা কোনো রিল বা ভিডিওর ক্ষেত্রে কি এমনটা বলা যায়?

তাই আজ রাতে ইনস্টাগ্রাম, টিকটক বা ইউটিউব খোলার আগে একটু অন্য কিছু চেষ্টা করে দেখতে পারেন। ফোনটা সাইলেন্ট করুন। এই তালিকা থেকে যেকোনো একটি বই বেছে নিন। শুধু একটা চ্যাপ্টার বা একটা ছোট গল্প পড়ুন। এরপর যদি মনে হয় স্ক্রল করবেন, তবে তা-ই করুন। তবে খুব সম্ভবত, পরের পৃষ্ঠায় কী আছে, সেটা জানার কৌতূহলই আপনাকে আটকে রাখবে।

ট্যাগসমূহ:#বইপত্র

আপনার মতামত জানান

মন্তব্যসমূহ

লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।

লোড হচ্ছে
এখনও কোনো মন্তব্য নেই।