Qazi Akash Logo
কাজী আকাশ

হলিউডের অভিনেত্রী কীভাবে ওয়াই-ফাই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছিলেন

কাজী আকাশ২৫ আগস্ট, ২০২৬৬ মিনিট

হেডি লামার

১৯৪০-এর দশক। হলিউডের জমকালো পার্টিগুলো তখন তারায় তারায় আলোকিত। কিন্তু রূপালি পর্দার সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকা হেডি লামার সেখানে নেই।

তিনি কোথায়?

খুঁজলে দেখা যাবে, ১২-১৫ ঘণ্টার টানা শুটিং শেষে ক্লান্ত হেডি নিজের ঘরে বসে আছেন। সামনে একটা ড্রাফটিং টেবিল, দেয়ালজুড়ে থরে থরে সাজানো ইঞ্জিনিয়ারিং বই। রূপালি পর্দার এই মোহময়ী তারকা তখন ডুবে আছেন নিত্যনতুন সব যন্ত্রপাতির নকশা তৈরিতে!

আজ আমরা যে জিপিএস, ব্লুটুথ বা ওয়াই-ফাই ছাড়া এক মুহূর্ত চলতে পারি না, তার পেছনের মূল প্রযুক্তিটি এই হলিউড তারকারই আবিষ্কার। পুলিৎজারয়ী ঐতিহাসিক রিচার্ড রোডসের ভাষায়, ‘হেডির সব সময় মনে হতো, মানুষ তাঁর বুদ্ধিমত্তার কদর করে না। তাঁর অপরূপ সৌন্দর্যই যেন তাঁর মেধার পথে সবচেয়ে বড় বাধা।’

দুই

১৯১৪ সাল। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় জন্ম হলো হেজউইগ ইভা কিসলারের। বাবা ব্যাংক ডিরেক্টর, মা কনসার্ট পিয়ানোবাদক। ধনী ইহুদি পরিবারের একমাত্র সন্তান হিসেবে ব্যালেরিনা, পিয়ানো ও ঘোড়সওয়ারির পাঠ নিয়ে বড় হচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু ছোট্ট হেডির আগ্রহ ছিল অন্য জায়গায়।

বাবার সঙ্গে ভিয়েনার রাস্তায় হাঁটতে বেরোলে বাবা তাঁকে বোঝাতেন ট্রাম কীভাবে চলে, পাওয়ার প্ল্যান্টে কীভাবে বিদ্যুৎ তৈরি হয়। পাঁচ বছর বয়সেই একটা আস্ত মিউজিক বক্স খুলে প্রতিটি যন্ত্রাংশ আলাদা করে ফেলেছিলেন হেডি। তারপর সেটা আবার নিখুঁতভাবে জোড়াও লাগিয়েছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কারিগরি শিক্ষা তাঁর ছিল না, কিন্তু নিজের চারপাশের পৃথিবীকে যন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার এই চোখ তিনি পেয়েছিলেন বাবার কাছ থেকেই।

১৯৩০-এর দশকে ভিয়েনার মেয়েদের জন্য ইঞ্জিনিয়ার বা বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখাটা বেশ কঠিন ছিল। তাই কিশোরী হেডি নজর দিলেন সিনেমার দিকে। ১৬ বছর বয়সে স্কুল ফাঁকি দিয়ে সোজা হাজির হলেন ইউরোপের সবচেয়ে বড় মুভি স্টুডিওতে। সরাসরি গিয়ে বললেন, ‘আমি মুভি স্টার হতে চাই।’

প্রথমে স্ক্রিপ্ট গার্ল, এরপর টুকটাক অভিনয়। ১৮ বছর বয়সে চেক পরিচালক গুস্তাভ মাচাটির এক্সট্যাসি সিনেমায় অভিনয় করে রীতিমতো তোলপাড় ফেলে দিলেন হেডি। মুভির কিছু সাহসী দৃশ্যের জন্য একাদশ পোপ পায়াস মুভির নিন্দা করেন। জার্মানিতে এটি নিষিদ্ধ হয়, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও আটকে দেওয়া হয়।

তবে ইউরোপজুড়ে হেডির রূপের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এরকমই এক নাটকের শো চলাকালীন ফ্রিৎজ মান্ডল নামে এক অস্ট্রিয়ান অস্ত্র ব্যবসায়ীর নজরে পড়েন তিনি। ১৯৩৩ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। কিন্তু এই বিয়ে হেডির জীবনের সবচেয়ে দমবন্ধ করা অধ্যায় হিসেবে হাজির হলো।

তিন

মান্ডল ছিলেন চরম সন্দেহবাতিক। তিনি হেডিকে নিজের সঙ্গে সবখানে নিয়ে যেতেন। এমনকি নাৎসি জার্মানি ইতালির বড় বড় সামরিক কর্তাদের সঙ্গে অস্ত্র বিক্রির বৈঠকেও হেডিকে বসে থাকতে হতো। এদের মধ্যে স্বয়ং মুসোলিনিও ছিলেন। হেডিকে বলা হয়েছিল সুন্দর পুতুলের মতো চুপচাপ বসে থাকতে। কিন্তু হেডি তো আর সাধারণ মেয়ে ছিলেন না! বোরিং সেসব আলোচনায় বসে বসে তিনি মনে গেঁথে নিচ্ছিলেন টর্পেডো আর বোমার খুঁটিনাটি দিকগুলো।

অভিনেত্রী হেডি লেমার

১৯৩৭ সাল। মান্ডলের অত্যাচার আর হিটলারের ইহুদিবিদ্বেষী নীতি থেকে বাঁচতে হেডি অস্ট্রিয়া ছেড়ে পালালেন। পৌঁছালেন লন্ডনে। সেখানে তাঁর দেখা হলো এমজিএম স্টুডিওর প্রধান লুইস বি. মেয়ারের সঙ্গে। মেয়ার তাঁকে সপ্তাহে ১২৫ ডলারের বিনিময়ে হলিউডে কাজ করার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু হেডি সেই কম দামের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন।

হেডি জানতেন কীভাবে নিজের দর বাড়াতে হয়। মেয়ার যে বিলাসবহুল জাহাজ এসএস নরমান্ডিতে করে আমেরিকায় ফিরছিলেন, হেডিও সেই জাহাজের টিকিট কাটলেন। জাহাজের ডেকে চমৎকার পোশাকে টেনিস খেলে তিনি মেয়ারের নজর কাড়লেন। নিউইয়র্কে পৌঁছানোর আগেই সপ্তাহে ৫০০ ডলারের চুক্তি পাকা করে ফেললেন হেডি। তবে শর্ত ছিল, ৬ মাসের মধ্যে তাঁকে ইংরেজি শিখতে হবে।

মেয়ারের আরেকটা শর্ত ছিল, নাম পাল্টাতে হবে। হেজউইগ কিসলার নামটা বড্ড বেশি জার্মানি শোনায়। ১৯২০-এর দশকের বিখ্যাত অভিনেত্রী বারবারা লামারের নামের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর নতুন নাম রাখা হলো হেডি লামার।

হলিউডে পা রেখেই ১৯৩৮ সালে অ্যালজিয়ার্স সিনেমায় চার্লস বয়ারের বিপরীতে অভিনয় করে রাতারাতি তারকা বনে গেলেন হেডি। এরপর ১৯৪০-এর দশকজুড়ে এমজিএম তাঁকে দিয়ে একের পর এক সিনেমা বানাতে লাগল। নিজের অভিনয় আর সৌন্দর্য নিয়ে হেডি একবার মজার ছলে বলেছিলেন, ‘যেকোনো মেয়েই গ্ল্যামারাস হতে পারে। এর জন্য শুধু বোকার মতো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।’

কিন্তু হেডির আসল ভালোবাসা ছিল সমস্যা সমাধান করা। বিখ্যাত চলচ্চিত্র প্রযোজক ও অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হাওয়ার্ড হিউজেসের সঙ্গে তাঁর দারুণ বন্ধুত্ব হয়েছিল। হেডি একবার হিউজেসকে এমন একটা ট্যাবলেটের আইডিয়া দেন, যা পানিতে ফেললেই সৈন্যদের পানীয় কোল্ড ড্রিংকসে পরিণত হবে।

বাড়ির ভেতরেই তাঁর একটা আস্ত ল্যাবরেটরি ছিল। সেখানে বসে তিনি বয়স্কদের জন্য বাথটাবের নিরাপদ শাওয়ার সিট, অন্ধকারে জ্বলে থাকা কুকুরের কলার থেকে শুরু করে ব্যবহৃত টিস্যু ফেলার বক্সসহ নানা রকম নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের নকশা বানিয়েছিলেন।

চার

১৯৪০ সাল। ইউরোপে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। আটলান্টিক মহাসাগরে জার্মান ইউ-বোট (সাবমেরিন) মিত্রবাহিনীর জাহাজে নির্বিচারে হামলা চালাচ্ছে। খবর শুনে হেডি আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি ঠিক করলেন, যুদ্ধ থামাতে তাঁকে কিছু একটা করতে হবে।

একদিন এক ডিনার পার্টিতে হেডির পরিচয় হলো জর্জ অ্যান্থিল নামে এক অ্যাভান্ট-গার্ড সুরকারের সঙ্গে। অ্যান্থিল যুদ্ধে তাঁর ভাইকে হারিয়েছিলেন। ফলে দুজনের লক্ষ্য এক, হিটলারকে ঠেকাতে হবে। কিন্তু কীভাবে?

হেডির মনে পড়ল প্রথম স্বামীর সঙ্গে বসে থাকা সেই অস্ত্র বিক্রির মিটিংগুলোর কথা। তিনি জানতেন, রেডিও-নিয়ন্ত্রিত টর্পেডো দিয়ে জার্মান সাবমেরিন ধ্বংস করা সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো, রেডিও সিগন্যালকে শত্রুপক্ষ খুব সহজেই জ্যাম করে দিতে পারে। তখন টর্পেডো আর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে না। এই সমস্যার সমাধানেই হেডি এবং অ্যান্থিল তাঁদের দুজনের পিয়ানো বাজানোর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগালেন।

জর্জ অ্যানথাইল ছিলেন মার্কিন সুরকার ও পিয়ানোবাদক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অভিনেত্রী হেডি লামারের সঙ্গে মিলে তিনি ফ্রিকোয়েন্সি-হপিং প্রযুক্তি উদ্ভাবনে কাজ করেন

হেডি আর অ্যান্থিল পিয়ানো নিয়ে একটা দারুণ খেলা খেলতেন। একজন বাজানো শুরু করলে, অন্যজন সুর ধরে সঙ্গে সঙ্গে বাজাতেন। এখান থেকেই তাঁদের মাথায় এল ফ্রিকোয়েন্সি হপিংয়ের ধারণা। কিন্তু এটা কী জিনিস?

সহজ করে বলি। ধরুন, আপনি রেডিওতে একটা গোপন খবর পাঠাচ্ছেন। শত্রুপক্ষ যদি জানে আপনি কোন ফ্রিকোয়েন্সিতে আছেন, তবে তারা সেই তরঙ্গে জ্যামার বসিয়ে সিগন্যাল আটকে দিতে পারে। কিন্তু আপনি যদি প্রতি সেকেন্ডে রেডিওর চ্যানেল বদলাতে থাকেন এবং আপনার পাঠানো টর্পেডোও ঠিক একই সময়ে চ্যানেল বদলাতে থাকে, তবে শত্রুপক্ষ বুঝতেই পারবে না আপনি কোন ফ্রিকোয়েন্সিতে আছেন। ফলে তারা সিগন্যাল জ্যাম করতে পারবে না।

অ্যান্থিল আগে একাধিক পিয়ানোকে একসঙ্গে বাজানোর জন্য কাগজের রোল ব্যবহার করতেন। তাঁরা ভাবলেন, জাহাজের কন্ট্রোলার এবং পানির নিচের টর্পেডোতে যদি একই রকম দুটো ঘড়ি থাকে, যা ঠিক একই সময়ে ফ্রিকোয়েন্সি বদলাতে নির্দেশ দেবে, তবেই কেল্লাফতে! সিগন্যাল বারবার লাফিয়ে লাফিয়ে অন্য তরঙ্গে চলে যাবে। একে বলা হয় ফ্রিকোয়েন্সি হপিং। এই চমৎকার নামটা হেডি নিজেই দিয়েছিলেন।

১৯৪২ সালে তাঁরা এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের পেটেন্ট পান। এরপর অ্যান্থিল সেটা নিয়ে সোজা চলে যান মার্কিন নৌবাহিনীর কাছে। কিন্তু নৌবাহিনীর কর্তারা তাঁদের কথা হেসেই উড়িয়ে দিলেন। রিচার্ড রোডসের মতে, নৌবাহিনীর মনোভাব ছিল এমন, ‘আপনারা কি টর্পেডোর ভেতরে আস্ত পিয়ানো ঢোকাতে চান? মশাই, বিদায় হোন তো এবার!’

১৯৪২ সালে অ্যানথাইল ও হেডি লামার ফ্রিকোয়েন্সি-হপিং পদ্ধতির পেটেন্ট নেন। এর মাধ্যমে সংকেতের তরঙ্গবার্তা বারবার বদলে রেডিও-নিয়ন্ত্রিত টর্পেডোকে শত্রুর সংকেত জ্যাম করা থেকে রক্ষা করার পরিকল্পনা ছিল। মার্কিন নৌবাহিনী পেটেন্টটি গোপন নথি হিসেবে সংরক্ষণ করে।

হেডি আর অ্যান্থিলের প্যাটেন্টটি টপ সিক্রেট সিল মেরে একটা সিন্দুকে বন্দী করে রাখা হলো। হতাশ হয়ে দুজনই ফিরে গেলেন নিজেদের জগতে। তাঁরা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি, তাঁদের এই আবিষ্কার একদিন গোটা বিশ্বকে পাল্টে দেবে।

পাঁচ

১৯৫০-এর দশকে সিলভানিয়া নামে এক কোম্পানি সাবমেরিনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এই ফ্রিকোয়েন্সি হপিং ব্যবহার করে। এরপর ১৯৬০-এর দশকে কিউবার মিসাইল সংকটের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের সিগন্যাল জ্যামিং ঠেকাতে মার্কিন রণতরীগুলোতে এই প্রযুক্তি বসানো হয়। ১৯৫৯ সালে অ্যান্থিল মারা যান। হেডিও নিজের আবিষ্কারের এই উত্থান সম্পর্কে কিছুই জানতেন না।

১৯৭০-এর দশকে গাড়ির ফোন এবং পরে প্রথম দিককার সেল ফোন নেটওয়ার্কেও এই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। নব্বইয়ের দশকে এসে রেডিও যোগাযোগের সুরক্ষায় ফ্রিকোয়েন্সি হপিং পুরো পৃথিবীতে একটি অপরিহার্য প্রযুক্তি হয়ে ওঠে। আজকের দিনের ওয়াই-ফাই, ব্লুটুথ এবং জিপিএস প্রযুক্তি দাঁড়িয়ে আছে হেডি লামার আর জর্জ অ্যান্থিলের সেই মূল আইডিয়াটির ওপর ভিত্তি করেই।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হলিউডে হেডির জৌলুস কমতে থাকে। তিনি ফ্লোরিডায় অবসর জীবন কাটাতে শুরু করেন। সেখানেও তিনি ট্রাফিক লাইট আরও উন্নত করার মতো নানা আবিষ্কার নিয়ে মেতে থাকতেন। অবশেষে আশির দশকে এসে একদল ইঞ্জিনিয়ার আবিষ্কার করেন, ফ্রিকোয়েন্সি হপিংয়ের প্যাটেন্টে লেখা ‘হেজউইগ কিসলার ম্যাকে’। এই নামটার আড়ালে যে রূপালি পর্দার কিংবদন্তি হেডি লামার আছেন, তা তখন জানাজানি হয়!

হেডি টাকা চাননি, চেয়েছিলেন একটু স্বীকৃতি। অবশেষে ১৯৯০-এর দশকে এসে তিনি তাঁর এই অনবদ্য অবদানের জন্য পুরস্কার পান। পুরস্কার হাতে পেয়ে চিরচেনা সেই স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হেডি বলেছিলেন, ‘যাক, শেষমেশ তাহলে সময় হলো!’ 

সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফি

আপনার মতামত জানান

মন্তব্যসমূহ

লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।

লোড হচ্ছে
এখনও কোনো মন্তব্য নেই।