Qazi Akash Logo
কাজী আকাশ

যে দেশ কখনো ফুটবল খেলেনি!

কাজী আকাশ২২ জুলাই, ২০২৬৫ মিনিট

গত দেড় মাস ধরে যখন পুরো বিশ্ব ফুটবল জ্বরে কাঁপছিল, তখন একটি দেশের মানুষ ফুটবলের কোনো খোঁজ খবরই রাখেনি। কারণ সে দেশটিতে কেউ ফুটবল বোঝেই না! শুধু তা-ই নয়, কেউ যদি সেখানে ফুটবল খেলতে যায়, তবে আশপাশের মানুষ তাকে নিয়ে রীতিমতো হাসাহাসি করে। অবাক হচ্ছেন? সত্যিই এমন একটি দেশ এখনো আছে পৃথিবীর বুকে।

নাউরুতে ফুটবল খেলতে দেখা বিরল। দেশটি কোনোদিন আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচ খেলেনি

দেশটির নাম নাউরু। বিশ্বের মানচিত্রে ছোট্ট একটি বিন্দুর মতো এই দেশটিই সম্ভবত পৃথিবীর শেষ দেশ, যাদের নিজস্ব কোনো জাতীয় ফুটবল দল নেই। কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা তো দূরের কথা, পুরো দেশে ফুটবল খেলার মতো মাঠ আছে মাত্র একটি, তা-ও আবার শক্ত বালু ও পাথরে ভরা!

তবে এই পরিস্থিতি বদলে দেওয়ার জন্য একদল স্বপ্নবাজ মানুষ কাজ শুরু করেছেন। আর এই পরিবর্তনের গল্পটা যতটা না ফুটবলের, তার চেয়েও বেশি এক হারিয়ে যাওয়া দেশের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ের।

নাউরুর অদ্ভুত অতীত

অস্ট্রেলিয়া থেকে আড়াই হাজার মাইল উত্তর-পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জেগে থাকা এই দ্বীপটির আয়তন মাত্র ২১ বর্গকিলোমিটার। ১৯৬৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর নাউরু হঠাৎ বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছিল। কারণটা শুনলে আপনি হয়তো চমকে যাবেন—পাখির বিষ্ঠা!

হাজার হাজার বছর ধরে পাখিদের মল জমে এই দ্বীপে তৈরি হয়েছিল ফসফেটের বিশাল খনি। এটি ছিল মহামূল্যবান খনিজ। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে অতিরিক্ত খননের ফলে দ্বীপটির এমন অবস্থা দাঁড়াল যে, দূর থেকে দেখলে মনে হতো এটি যেন চাঁদের কোনো এবড়োখেবড়ো পিঠ। ফসফেট ফুরিয়ে যাওয়ার পর একসময়ের প্লিজেন্ট আইল্যান্ড পরিণত হলো এক পরিত্যক্ত ভূমিতে।

বর্তমানে এই দ্বীপের প্রায় ১২ হাজার মানুষ বাধ্য হয়ে দ্বীপের উপকূল ঘেঁষে বসবাস করছে। আর সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার হলো, জলবায়ু পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে এই ছোট্ট দ্বীপটি এখন অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে।

খনিজ সম্পদ ফুরিয়ে যাওয়ার পর নাউরু এখন বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। আবাদি জমি না থাকায় দেশের ৯০ শতাংশ খাবারই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়, যার বেশির ভাগই প্যাকেটজাত খাবার। এর ফল হয়েছে ভয়াবহ! বর্তমানে এই দ্বীপের ৬৯ শতাংশ মানুষই অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছেন এবং প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের টাইপ-২ ডায়াবেটিস রয়েছে।

এ অবস্থায় দ্বীপবাসীকে বাঁচাতে খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। তবে মজার ব্যাপার হলো, এখানকার মানুষের সবচেয়ে পছন্দের খেলা ফুটবল নয়, বরং অসি রুলস নামে একধরনের রাগবি খেলা, যা দ্বীপের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ খেলে। এছাড়া অ্যাথলেটিকস ও ভারোত্তোলনেও তারা বেশ পারদর্শী।

২১ বর্গকিলোমিটারের নাউরুতে মাঠ আছে মাত্র একটি

ফুটবল বিপ্লবের নতুন স্বপ্ন

নাউরু সকার ফেডারেশনের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর এবং ব্রিটিশ সাবেক একাডেমি খেলোয়াড় চার্লি পমরয়ের নেতৃত্বে আটজনের একটি স্বেচ্ছাসেবী দল এখন নাউরুতে ফুটবলকে জনপ্রিয় করার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। পমরয় এর আগে কম্বোডিয়া এবং ভারতে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের মধ্যে ফুটবল ছড়িয়ে দেওয়ার সফল প্রকল্প পরিচালনা করেছেন।

তবে নাউরুর চ্যালেঞ্জটা একদম ভিন্ন। এখানে প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো দ্বীপে কিছু ফুটবল নিয়ে আসা! তাঁরা একটি দারুণ উদ্যোগ নিয়েছেন। দ্বীপের ৪ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতিটি শিশুর হাতে একটি করে ফুটবল তুলে দিতে চান। এই দ্বীপে প্রায় ২ হাজার শিশু আছে। অপচয় এড়াতে প্লেনে করে শুরুতে ২০০টি বল আনা হবে এবং চার্চ ও ১১টি স্কুলের মাধ্যমে সেগুলো বিতরণ করা হবে।

এর আগে নাউরুতে ফুটবল চালু করার কিছু বিক্ষিপ্ত চেষ্টা হয়েছিল। দুই বছর আগে সাবেক প্রিমিয়ার লিগ স্ট্রাইকার ডেভ কিটসনের নেতৃত্বে ১৮ জনের একটি দলকে ইংল্যান্ডের একটি অপেশাদার দলের সঙ্গে ম্যাচ খেলানোর কথা থাকলেও অর্থের অভাবে তা ভেস্তে যায়।

অবশ্য পমরয় এবার কোনো একটি ম্যাচের দিকে তাকিয়ে নেই। তিনি চান একটি টেকসই ফুটবল সংস্কৃতি গড়ে তুলতে। তিনি বলেন, ‘আমার স্বপ্ন হলো নাউরুর প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচটি খেলবে আমাদের সিস্টেম থেকে উঠে আসা ১৮ বছরের তরুণরা। আমরা এখন ১৪ বছর বয়সীদের নিয়ে কাজ শুরু করব, তিন-চার বছর পর তারাই হবে আমাদের প্রথম জাতীয় দল।’

আগামী ডিসেম্বরে যখন পমরয় নাউরুতে যাবেন, তখন তিনি স্থানীয় খেলোয়াড় এবং কোচদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করবেন।

ভবিষ্যতের পথচলা

দ্বীপের বেশির ভাগ জমি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন বা বসবাসের অযোগ্য হওয়ায় খেলার মাঠ তৈরি করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে স্বেচ্ছাসেবী টাইরন ডেইয়ে তাঁর পারিবারিক জমিতে নতুন কিছু পিচ তৈরির স্বপ্ন দেখছেন।

ডেইয়ে পেশায় একজন নগর-পরিকল্পনাবিদ। তিনি জানান, অন্য দ্বীপরাষ্ট্রের মানুষ যখন নাউরুতে এসে ফুটবল খেলে, তখন স্থানীয়রা বুঝতে না পেরে তাদের নিয়ে হাসাহাসি করে। তিনি বলেন, ‘অন্যান্য প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলোর দারুণ সব ফুটবল দল আছে। আমি চাই নাউরুও একদিন সে রকম হোক।’

নাউরু সকার ফেডারেশন বর্তমানে তাদের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জাতীয় দলের জার্সি বিক্রি করে তহবিল সংগ্রহ করছে। সব বাধা পেরিয়ে নাউরুর মানুষ এখন ফুটবলের মাধ্যমে নতুন এক আত্মপরিচয়ের স্বপ্ন দেখছে। হয়তো ভবিষ্যতে ২০২৮ সালে নাউরুতে অনুষ্ঠিতব্য মাইক্রোনেশিয়ান গেমসে (অলিম্পিকের মতো অনেকগুলো খেলা থাকে) আমরা এই দ্বীপের নতুন এক ফুটবল প্রজন্মের জন্ম হতে দেখব!

সূত্র: বিবিসি

ট্যাগসমূহ:#নাউরু#ফুটবল

আপনার মতামত জানান

মন্তব্যসমূহ

লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।

লোড হচ্ছে
এখনও কোনো মন্তব্য নেই।