ভালোবাসা কী? এই এক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে দেবদাস থেকে শুরু করে পাড়ার মজনু পর্যন্ত সবাই রাতের ঘুম হারাম করেছে! কবিরা হাজার বছর ধরে কবিতা লিখেও কূলকিনারা পাননি, গায়কেরা গান গেয়ে গলা ফাটিয়েছেন, কিন্তু নিখুঁত উত্তর কেউ দিতে পারেননি। তাহলে উপায়? এবার প্রেমের এই চিরন্তন রহস্য ভেদ করতে খাতা-কলম ও ব্রেইন-স্ক্যানার নিয়ে মাঠে নেমেছেন স্বয়ং বিজ্ঞানীরা!
শুনতে অবাক লাগলেও ঘটনা সত্যি। যুক্তরাজ্যের স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গে রয়্যাল সোসাইটির উদ্যোগে সম্প্রতি বসেছিল এক অদ্ভুত সম্মেলন। নাম ‘লাভ, অ্যাকচুয়ালি অ্যান্ড ইন থিওরি’। ভাবুন তো, বাঘা বাঘা সব জীববিজ্ঞানী, স্নায়ুবিজ্ঞানী আর মনোবিজ্ঞানীরা এক রুমে বসে সিরিয়াস মুখে আলোচনা করছেন—প্রেমে পড়লে মানুষের কী হয়!
সম্মেলনের মাঝপথে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির গবেষক অ্যাডাম বোড তো রীতিমতো কেঁদেই ফেললেন! কেন? কারণ, এতদিন ভালোবাসা নিয়ে গবেষণা করাকে বিজ্ঞানমহলে কেউ পাত্তাই দিত না। সবাই ভাবত, এটা আবার কোনো বিজ্ঞান হলো নাকি! বোড বলেন, ‘ভালোবাসার বিজ্ঞান যে কোনো সিরিয়াস কিছু হতে পারে, সেটা কেউ মানতেই চাইত না। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো আর সম্মানজনক বিজ্ঞান সংস্থা যখন ফান্ডিং দিয়ে সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীদের এক ছাদের নিচে এনে ভালোবাসা নিয়ে কথা বলার সুযোগ করে দিচ্ছে, তখন আবেগে চোখে পানি তো আসবেই!’
প্রেমের সংজ্ঞার খোঁজে
পোল্যান্ডের রোক্লো ইউনিভার্সিটির গবেষক মার্টা কোয়াল প্রথমেই একটা বোমা ফাটালেন। তিনি সোজাসাপটা স্বীকার করে নিলেন, ‘আমরা বিজ্ঞানীরা এখনো একমত হতে পারিনি যে ভালোবাসা আসলে কী!’
'প্রেম হলো ক্ষুধা-তেষ্টার মতোই মানুষের বেঁচে থাকার একটা আদিম তাগিদ!'—লুসি ব্রাউন
কেউ কেউ বলেন এটা শুধু একটা আবেগ। এই যেমন অ্যাডাম বোডের কথাই ধরুন। তিনি নিজে এমন একজনের প্রেমে পড়েছিলেন, যাকে তিনি মোটেও ভালোবাসতে চাননি! আর এই ‘কেন আমি তার প্রেমে পড়লাম’—সেই ক্ষোভ আর কৌতূহল থেকেই তিনি ভালোবাসার বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা শুরু করেছেন!
তবে নিউইয়র্কের আলবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অব মেডিসিনের লুসি ব্রাউন শোনালেন অন্য কথা। তাঁর মতে, প্রেম মোটেও শখের কোনো আবেগ নয়। ব্রেইন-স্ক্যান করে দেখা গেছে, প্রেমে পড়লে আমাদের মস্তিষ্কের একেবারে গভীরের সেই অংশগুলো আলোকিত হয়ে ওঠে, যেগুলো ক্ষুধা বা তৃষ্ণা নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ, প্রেম হলো ক্ষুধা-তেষ্টার মতোই মানুষের বেঁচে থাকার একটা আদিম তাগিদ!
পুরো কনফারেন্সে সবচেয়ে মজার থিওরিটা দিয়েছেন কর্নেল ইউনিভার্সিটির রবার্ট স্টার্নবার্গ। তাঁর মতে, ভালোবাসার খুঁটি তিনটি—অন্তরঙ্গতা, তীব্র আকর্ষণ এবং প্রতিশ্রুতি।
মজার ব্যাপার হলো, এই থিওরি তিনি বানিয়েছেন নিজের সাবেক প্রেমিকাদের অভিজ্ঞতা থেকে! কনফারেন্সে তিনি মাইক হাতে অকপটে স্বীকার করলেন, ‘মেরির সাথে আমার সম্পর্কটা ছিল খুব অন্তরঙ্গ; জুলিয়ার দিক থেকে আমি চোখই ফেরাতে পারতাম না, সেখানে ছিল তীব্র আকর্ষণ; আর এলেনের প্রতি আমার ছিল নিখাদ প্রতিশ্রুতি!’
দেখুন অবস্থা! বিজ্ঞান কনফারেন্সে দাঁড়িয়ে কেউ নিজের প্রাক্তনদের ময়নাতদন্ত করছেন!
প্রেমে পড়লে ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল!
গবেষকরা একটা বিষয়ে অন্তত একমত। প্রেমের প্রথম এক-দুই বছর হলো হানিমুন ফেজ। এই সময়ে মানুষের মাথায় একধরনের পাগলামি কাজ করে। এরপর আসে একটা শান্ত পর্যায়।
'নতুন প্রেমে পড়া মানুষদের কোনোভাবেই গাড়ি চালাতে দেওয়া উচিত নয়!’ —অ্যাডাম বোড
অ্যাডাম বোডের মতে, নতুন প্রেমে পড়া মানুষেরা দিনের অর্ধেক সময়ই তাদের প্রিয় মানুষটার কথা ভেবে কাটায়! তাই তিনি এক অদ্ভুত দাবি তুলেছেন—'নতুন প্রেমে পড়া মানুষদের কোনোভাবেই গাড়ি চালাতে দেওয়া উচিত নয়!’ তিনি রীতিমতো এর ওপর গবেষণা করার জন্য অনুদানও খুঁজছেন। কারণটা তো বোঝাই যাচ্ছে, এরা রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময়ও স্টিয়ারিং ধরে প্রিয়জনের মুখ ভাসিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করে বসবে!
দুই দিনের এই বিশাল সম্মেলন শেষে বিজ্ঞানীরা ঠিক করেছেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে তাঁরা ভালোবাসার বেশ কয়েকটি সংজ্ঞার প্রস্তাব দিয়ে একটি গবেষণাপত্র বের করবেন। আপনি বা আমি খুব ভালো করেই জানি, কয়েক পাতার একটা পেপার কখনোই ভালোবাসার এই অনন্ত রহস্য পুরোপুরি ভেদ করতে পারবে না। কিন্তু তারপরও বিজ্ঞানীদের এই রোমান্টিক চেষ্টাকে একটা স্যালুট জানাতেই হয়। কারণ দিন শেষে, এই একটা জাদুকরী অনুভূতির জন্যই তো আমরা সবাই বেঁচে আছি!
সূত্র: নিউ সায়েন্টিস্ট
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।



