বিজ্ঞানীরা সারাদিন ল্যাবরেটরিতে বসে কী করেন? চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা আর গায়ে সাদা অ্যাপ্রন জড়িয়ে গম্ভীর মুখে শুধু ফর্মুলা মেলান? একদমই না! পৃথিবীতে এমন কিছু বিজ্ঞানী আছেন, যাঁরা রীতিমতো মগজ খাটিয়ে এমন সব আজগুবি বিষয়ের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খোঁজেন, যা শুনলে আপনি হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে পড়ে যাবেন। কেউ হয়তো তেলাপোকার দুধ দোয়ানোর ধান্ধায় আছেন, তো কেউ আবার নিজের পুরোনো আন্ডারপ্যান্ট মাটিতে পুঁতে রাখছেন!
এই দারুণ হাস্যকর, অথচ মগজ-ধোলাই করা গবেষণার জন্যই প্রতিবছর দেওয়া হয় বিজ্ঞানের সবচেয়ে মজার স্বীকৃতি—ইগ নোবেল! কারা পেলেন ২০২৬ সালের এই অদ্ভুতুড়ে পুরস্কার? কেনই-বা পেলেন?
ইগ নোবেল কী, কেন দেওয়া হয়
ইগ নোবেল হলো আসল নোবেল পুরস্কারের এক দারুণ প্যারোডি। ১৯৯১ সাল থেকে এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। এর মূলমন্ত্র হলো—‘এমন সব অর্জন, যা মানুষকে প্রথমে হাসায়, তারপর ভাবায়।’
আপনার মনে হতে পারে, এত কষ্ট করে বিজ্ঞানীরা এসব উদ্ভট বিষয় নিয়ে কেন গবেষণা করেন? আসলে বিজ্ঞানের কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। আপাতদৃষ্টিতে কোনো বিষয়কে চরম হাস্যকর বা অর্থহীন মনে হলেও, তার গভীরে হয়তো লুকিয়ে থাকে দারুণ কোনো বৈজ্ঞানিক সত্য বা ভবিষ্যতের নতুন কোনো প্রযুক্তির ভিত্তি।

আরেকটি প্রশ্ন আসতে পারে মাথায়। এই পুরস্কার পেলে গবেষকদের লাভ কী? এতে কি আসল নোবেল পুরস্কারের মতো নগদ অর্থ পাওয়া যায়? আসলে নগদ অর্থের চেয়েও বড় হলো বিশ্বজোড়া খ্যাতি, নিখাদ বিনোদন এবং বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে মজার ছলে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ।
এই পুরস্কারের অনুষ্ঠানটিও হয় একদম পাগলাটে স্টাইলে। বিজয়ীরা পুরস্কার হাতে নিয়ে ভাষণ দেওয়ার জন্য সময় পান মাত্র ৬০ সেকেন্ড! আর নিজেদের গবেষণার বিষয়টি বোঝাতে হয় ২৪/৭ লেকচার নিয়মে। অর্থাৎ, প্রথমে ২৪ সেকেন্ডে বিস্তারিত, এরপর মাত্র ৭টি শব্দে পুরো গবেষণার সারমর্ম!
মজার ব্যাপার হলো, দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে এই অনুষ্ঠান হয়ে এলেও, ২০২৬ সালের এই আসর বসেছে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে। আগামী বছর এটি হবে বেলজিয়ামের এন্টওয়ার্পে, ২০২৮ সালে আবারও জুরিখে। কারণটা বেশ অদ্ভুত। মার্কিন মুলুকে নাকি এখন আন্তর্জাতিক অতিথিদের যাওয়ার মতো নিরাপদ পরিবেশ নেই! তাই এমন এদিক সেদিক দৌড়াদৌড়ি করে পুরস্কার দেওয়ার এই ব্যবস্থা!
যাহোক, এবার পুরস্কারগুলোর ব্যাপারে জানা যাক।
পদার্থবিদ্যা

পাবলিক টয়লেটে প্রস্রাব করার সময় প্রস্রাবের ছিটেফোঁটা গায়ে লাগার যন্ত্রণায় কে না ভুগেছেন? এই বিশ্বসমস্যার সমাধানে রীতিমতো কোমর বেঁধে নেমেছিলেন একদল পদার্থবিদ। তাঁরা দিনের পর দিন গবেষণা করে দেখেছেন, ঠিক কোন অ্যাঙ্গেল প্রস্রাব পড়লে তা আর উল্টে ছিটকে আসে না। মজার ব্যাপার হলো, কুকুররা নাকি আগে থেকেই এই বিজ্ঞান জানে, তাই তো তারা ঠিক ৩০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে পা তুলে কাজ সারে! বিজ্ঞানীদের এই ৩০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলের নটিলাস ডিজাইনের ইউরিনালে প্রস্রাব করলে এক ফোঁটাও ছিটে আসে না! আপনি কিন্তু নিজের বাসায় বানিয়ে ফেলতে পারেন ৩০ ডিগ্রি কোণের একটি প্রস্রাবাগার।
জীববিজ্ঞান

অনেকেই সাপ ভয় পান। নাম শুনলেও অনেকে আঁতকে ওঠেন। যেমন আমি নিজে। তাই এমন কার্টুন মার্কা ছবি দিয়েছি। যাহোক, একদল গবেষক ল্যাবরেটরিতে গিয়ে কখনো সাপের মাথায়, কখনো পেটে, আবার কখনো লেজে পাড়া দিয়ে দেখেছেন; ঠিক কোন পরিস্থিতিতে প্রাণীটি বেশি খেপে গিয়ে মানুষকে কামড় দেয়! তাঁরা দেখেছেন, দিনের বেলায়, একটু গরম আবহাওয়া থাকলে এবং ভুল করে তাদের মাথায় পা পড়লে কামড় খাওয়ার চান্স সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে কমবয়সী নারী সাপগুলো একটু বেশিই রাগী হয়!
প্রযুক্তি

মশা রক্ত খেলে আমরা সবাই বিরক্ত হই। কিন্তু একদল গবেষক মশার সেই রক্ত খাওয়ার শুঁড়কেই বানিয়ে ফেলেছেন সুপার-প্রিসাইজ থ্রিডি প্রিন্টারের নোজল! তাঁরা মৃত মশার শুঁড় ব্যবহার করে এতই সূক্ষ্ম থ্রিডি প্রিন্টিং করেছেন, যা বাজারের নামিদামি প্রিন্টারের চেয়েও দ্বিগুণ নিখুঁত। এই পদ্ধতির নাম দেওয়া হয়েছে নেক্রোপ্রিন্টিং।
রসায়ন

এক প্রজাতির তেলাপোকা আছে, যারা রীতিমতো বাচ্চাদের দুধ খাওয়ায়! বিজ্ঞানীরা সেই তেলাপোকার পেটের ভেতর থেকে দুধের স্ফটিক বা ক্রিস্টাল বের করে এনেছেন। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, গরুর দুধের চেয়ে তেলাপোকার দুধে নাকি তিন গুণ বেশি শক্তি থাকে! কে জানে, ভবিষ্যতে হয়তো জিমে যাওয়ার আগে বডি-বিল্ডাররা তেলাপোকার দুধই খুঁজবেন!
অর্থনীতি

সামাজিক মর্যাদার সঙ্গে কি মানুষের সততার কোনো সম্পর্ক আছে? একদল গবেষক প্রমাণ করে ছেড়েছেন, সমাজের অভিজাত বা ধনী ব্যক্তিরা তুলনামূলকভাবে বেশি স্বার্থপর হন। রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় নিয়ম ভাঙা থেকে শুরু করে, ল্যাবরেটরিতে রাখা বাচ্চাদের জন্য আনা লজেন্স চুরি করে খান। মানে হয়তো কিছু চকলেট শুধু বাচ্চাদের জন্যই রাখা আছে, কিন্তু ধনীরা তা হাতের সামনে পেলে দুই-একটি খেয়ে ফেলবে। বেশিরভাগ ধনীরা নাকি এমনটাই করেন। অবশ্য চকলেট খাওয়া তেমন দোষের কিছু নয়। তবে গাড়ি চালানোর সময় নিয়ম ভাঙা ঠিক নয়।
চিকিৎসা

মৃত্তিকা বিজ্ঞান

মাটির স্বাস্থ্য কেমন, তা মাপার জন্য ২৫টি দেশের প্রায় এক হাজার মানুষ নিজেদের ব্যবহৃত সুতির আন্ডারপ্যান্ট মাটির নিচে পুঁতে রেখেছিলেন টানা দুই মাস! এরপর মাটি খুঁড়ে সেগুলো বের করে আনা হয়। দেখা গেছে, যে মাটির স্বাস্থ্য যত ভালো, সেখানকার আন্ডারপ্যান্ট তত বেশি পচে গেছে! মাটির স্বাস্থ্য মাপার এই ‘আন্ডারপ্যান্ট ইনডেক্স’ এখন রীতিমতো ভাইরাল!
বায়োমেকানিক্স

মানুষ, ভালুক কিংবা পিঁপড়ারা কিন্তু কোনো না কোনোভাবে একে অপরকে চুমু খায়! কিন্তু বিজ্ঞানীরা এর একটা ভীষণ খটমটে সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন। তাঁদের মতে, চুমু মানে হলো ‘ঠোঁট বা মুখের কিছু নড়াচড়াসহ এমন এক ধরনের মৌখিক যোগাযোগ, যেখানে কোনো খাবার আদান-প্রদান হয় না!’
শান্তি

আমরা সবাই চাই আমাদের বন্ধুরা ভালো এবং বিশ্বাসযোগ্য হোক। কিন্তু একদল গবেষক দেখেছেন, আমাদের এই চাওয়াটা একটু শর্তসাপেক্ষ! আমরা চাই আমাদের বন্ধুরা আমাদের সঙ্গে খুব ভালো ব্যবহার করুক, কিন্তু আমরা যাদের দুচোখে দেখতে পারি না, তাদের সঙ্গে যেন খারাপ ব্যবহার করে!
ঘ্রাণবিদ্যা

বাবা-মায়েদের কাছে নবজাতক শিশুদের শরীরের গন্ধ নাকি দারুণ লাগে। এটা তাদের মস্তিষ্কে একধরনের আনন্দ তৈরি করে। কিন্তু ওই একই বাচ্চা যখন কিশোর বয়সে পা দেয়, তখন বাবা-মায়েরা আর তাদের শরীরের গন্ধে সেই আগের আনন্দটা পান না। বয়ঃসন্ধিকালের হরমোনের পরিবর্তনের কারণেই এমনটা ঘটে বলে গবেষকেরা প্রমাণ করেছেন।
সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান ও এআরএস টেকনিকা
আপনার মতামত জানান
সম্পর্কিত অন্যান্য লেখা
মন্তব্যসমূহ
লগইন করা ব্যবহারকারীরা এই ব্লগে মন্তব্য করতে পারবেন।



